sonagacchi of past days
সে দিনের সোনাগাছি।
avijit kumar chatterjee
অভিজিৎ কুমার চ্যাটার্জি

মহানগরীর প্রায় সব ক’টি পতিতাপল্লি তৈরি হয়েছিল প্রাচীন কলকাতার দু’টি রাস্তার গা ঘেঁষে – চিৎপুর থেকে কালীঘাটগামী রাস্তা এবং লালদিঘি থেকে বৌবাজার হয়ে বর্তমান শিয়ালদহ পর্যন্ত বিস্তৃত রাস্তায়। এ ছাড়াও বিদেশি নাবিকদের বিনোদনের জন্য খিদিরপুর-গার্ডেনরিচের ডক অঞ্চল ও ইংরেজ সৈন্যদের আপ্যায়নের জন্য জানবাজার, বৌবাজার অঞ্চলেও গড়ে ওঠে গণিকালয়।

সেই সময়ের কলকাতাকে ব্রিটিশরা তিন ভাগে ভাগ করেছিল – দক্ষিণ ও মধ্য কলকাতার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে ‘হোয়াইট টাউন’, যেখানে বাস ছিল মূলত ব্রিটিশদের;  শহরের মধ্যাঞ্চলে ‘ইন্টারমিডিয়েট টাউন’, যেখানে ছিল ধনী বাঙালিদের বসতবাড়ি বা ‘বাবুদের’ বাড়ি; গরিব ও শ্রমিক শ্রেণির বাসের জন্য ‘ব্ল্যাক টাউন’।

ব্রিটিশকৃত বাসস্থানের এই বিভাজনের সঙ্গে তাল মিলিয়েই গণিকালয়গুলি গড়ে উঠতে থাকে। জানবাজারের কলিঙ্গ-ফেনউইক বাজারে (বর্তমান নিউ মার্কেট অঞ্চল) ব্রিটিশ সাহেব ও সাহেব-ঘেঁষা রইস বাবুদের জন্য ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত বারবনিতাদের বাসস্থান গড়ে ওঠে। ও দিকে আবার গঙ্গার পাড় ধরে কলকাতা শহরতলি অঞ্চলে গড়ে উঠতে শুরু করে চটকল ও কাপড়ের মিল। জীবিকার জন্য আসা শ্রমিক-কর্মচারীদের বিনোদনের জন্য সেখানেও গড়ে উঠতে থাকে গণিকালয়।

ইংরেজরা ক্ষমতায় এসে নতুন এক শ্রেণির জমিদার-তালুকদার সৃষ্টি করল এবং নিজেদের লুণ্ঠনের বকযন্ত্র চালু রাখার জন্য দালাল, গোমস্তা, মুৎসুদ্দি, দেওয়ান নিয়ে এ দেশি ‘জেন্টেলম্যান’ গড়ে তুলল। জমিদার ও জেন্টেলম্যান, উভয় শ্রেণির হাতে যথেষ্ট পয়সা জমল বটে কিন্তু পয়সার কোনো সদগতি হল না। হক্কের ধন ফক্কে উড়তে লাগল – এক দিকে বিড়ালের বিয়ে, বাপের শ্রাদ্ধ, বাঈনাচ, টপ্পাখেউড়, বুলবুলির আর মুরগির লড়াই আর অন্য দিকে ইংরেজ প্রভুদের উপঢৌকন দেওয়া ও উৎসব-পার্বণে বিদেশি প্রভুদের ও দেশি দরিদ্রনারায়ণের সেবা করা। এ ভাবেই এঁরা টাকা ওড়াতে থাকলেন। এঁদেরকে কেন্দ্র করেই লেনদেনের সূত্রে উকিল-মোক্তার, ডাক্তার-মাস্টার, দোকানদার, পাইকারি ব্যাপারী, কারিগর, শ্রমিক ইত্যাদি নিয়ে কলকাতা একটি কসমোপলিটান শহরে পরিণত হতে শুরু করল। কালক্রমে ধনী ও রইস বাবুদের সঙ্গে সঙ্গেই এঁরাও হয়ে উঠলেন গণিকালয়ের খরিদ্দার।

মূলত চিৎপুর-কর্নওয়ালিস স্ট্রিট ও বৌবাজার থেকে মানিকতলার মধ্যবর্তী অঞ্চলে বাবুরা আলাদা বাড়ি ভাড়া করে বা কিনে তাঁদের রক্ষিতাদের রাখতেন। অন্য দিকে নিম্ন বর্ণের হিন্দু বা গরিব মুসলমানদের জন্য গণিকালয় ছিল মেছুয়াবাজার ও কটন স্ট্রিট এলাকায়।

babu and the kept
বাবু ও রক্ষিতা, কালীঘাটের পটে।

তৎকালীন সমাজের বারবণিতাদের দু’টি সামাজিক অবস্থান লক্ষণীয়। এক দিকে উচ্চশ্রেণির বারবনিতা। এঁরা অনেক সময়ই কুলীন পরিবারের হতেন, কিছু পড়াশোনার সুযোগও হয়তো পেয়েছিলেন। এঁরা ছিলেন বাবুদের বা স্বদেশি ধনীদের ‘বাঁধা’ রক্ষিতা। আর একটি শ্রেণি ছিল, যাঁরা একাধিক বাবুর বিনোদনে নিযুক্ত থাকতেন। এঁদের বলা হত ‘ছুটকো’।

উনিশ শতকের শুরুর দিকে, বারবণিতাদের মধ্যে স্পষ্ঠ শ্রেণিবিভাজন ছিল। একটি শ্রেণিতে উচ্চ বর্ণের হিন্দু মহিলারা, যাঁরা বাবুদের রক্ষিতা হতেন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে ছিলেন মধ্যবর্ণের হিন্দু মহিলারা। এঁরা অনেক সময়ই স্বল্প শিক্ষিত হতেন। এঁদের কাছে বাবুরাও যেমন আসতেন তেমনি সমাজের অন্য শ্রেণির পুরুষেরাও আসতেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে কলকাতার সমাজে দরিদ্র ও নিম্ন বর্ণের হিন্দু, মুসুলমান ও খ্রিস্টান (এঁরা ছিলেন ইউরোপীয় বাবুদের ঔরসের ফসল) বারবণিতার সংখ্যা মহামারির আকার নিয়েছিল। বিনয় ঘোষ তাঁর ‘কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত’-এ লিখেছেন, “প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আরো বেশী হবে। কলকাতায় খুবই রমরমা ছিল বেশ্যাদের জগৎ। গৃহস্থের বাড়ির পাশে বেশ্যা, ছেলেদের পাঠশালার পাশে বেশ্যা, চিকিৎসালয়ের পাশে বেশ্যা, মন্দিরের পাশে বেশ্যা, শহরের সর্বত্র গজিয়ে ওঠে বেশ্যালয়”।

সাধারণ মানুষ পুলিশের কাছে আবেদন করা সত্ত্বেও শহর থেকে গণিকালয় উচ্ছেদ করা যায়নি। কারণ ধনীদের পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত গণিকালয়গুলিতে হস্তক্ষেপ করার সাহস দেখাতে পারেনি তখনকার পুলিশ। ‘বেশ্যাবাজি’ বাবুসমাজের সাধারণ ঘটনা।

উনিশ শতকে লেখালেখি শুরু হল, সভাসমিতিতে দাবিও উঠতে লাগল। একই সঙ্গে সতীদাহ প্রথা রোধ, বিধবাবিবাহের প্রবর্তন ইত্যাদি ‘সামাজিক বিপ্লব’ও ঘটল। ফলে সমাজে মেয়েদের অবস্থান একটু হলেও পালটাতে শুরু করল। কিন্তু ভদ্র ঘরের মেয়েরা বাড়ির বাইরে গিয়ে আয় করছে, এ রকম দৃশ্য খুব একটা দেখা যায়নি। ব্যতিক্রম গণিকাবৃত্তি। তৎকালীন সমাজে বহুবিবাহ প্রথা চালু থাকার ফলে কুলীন পরিবারের বাল্যবিধবা বা যুবতী কন্যাদের বারবনিতা হওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল। এঁরা ছিলেন স্বাধীনচেতা, পারিবারিক ও সামাজিক বাধানিষেধ মানতে অনিচ্ছুক। আবার কুলীন পরিবারের বিধবা গৃহবধূরা অনেক সময়ই নিজেদের পরিবারেই অন্য পুরুষদের দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতেন। তা ছাড়া বিধবা হওয়ার কারণে তাঁদের আর্থিক দুর্গতির মধ্যেও পড়তে হত। গবেষকেরা তাঁদের বারবনিতা হয়ে ওঠার কারণ হিসাবে এই বিষয়গুলিকে চিহ্নিত করেছেন। উনিশ শতকে বহরমপুর অঞ্চলে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট থাকাকালীন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন গণিকাদের চরিত্র ও এই পেশায় তাঁদের আসার কারণ সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট পেশ করেছিলেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, “রক্ষণশীল হিন্দু পরিবারের কঠোর বাধানিষেধ ও ভিক্টোরিয়ান মানসিকতা হিন্দু পরিবারের মহিলাদের মধ্যে নিঃসঙ্গতা, একঘেঁয়ে জীবনের জন্য মানসিক অবসাদের সৃষ্টি করেছিল। তাই পরিবারের স্বাধীনচেতা মহিলারা খানিকটা স্বাধীনতার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আস্বাদনের জন্য গণিকাবৃত্তির পেশা গ্রহণ করে নিয়েছিলেন”।

তৎকালীন পুরুষশাসিত সমাজে কুলীন পরিবার বা দরিদ্র ও নিম্ন শ্রেণির পরিবারের মহিলাদের গণিকাবৃত্তিকে পেশা করার কারণগুলি প্রায় একই ছিল। মহিলারা শুধুই ভোগ্যপণ্য, পুরুষশাসিত সমাজের এই ধরনের একচক্ষুপনা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না-পাওয়া, শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত বা নিরক্ষর মহিলারা, মানসিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা স্বাদ পাওয়ার আশায় গণিকাবৃত্তিকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। তৎকালীন সমাজে মহিলাদের কাছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অন্য কোনো রাস্তা খোলা ছিল না, যদিও অবশ্য রঙ্গালয়ে বা যাত্রায় অভিনয়ের সুযোগ অল্প অল্প করে শুরু হয়েছিল। পরবর্তীকালে উচ্চশ্রেণির রক্ষিতা বা বারবণিতাদের ওই পেশায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে দেখা যায়।

‘চোদ্দো আইন’-এর মানে হল, প্রতিটি গণিকাকে প্রতি চোদ্দো দিন অন্তর অর্থাৎ মাসে দু’বার থানায় গিয়ে ডাক্তারের কাছে শারীরিক পরীক্ষা করাতে হবে।

তৎকালীন শিক্ষিত ভদ্রসমাজ গণিকাদের স্বাধীন বৃত্তি ও স্বাধীন থাকার মনোভাবে শংকিত ছিলেন এই ভেবে যে, তাঁদের অন্দরমহলের মহিলারা না ওই স্বাধীন থাকার মনোভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। হিন্দু পরিবারের কঠোর বিধিনিষেধ ওই সময়ে কিছু মহিলার মধ্যে পরাধীনতার নাগপাশ কেটে ফেলার আগুন জ্বালিয়েছিল বই-কি! আবার সম্ভ্রান্ত পরিবারের বেশির ভাগ মহিলা পুরুষ-প্রবর্তিত সামাজিক নীতিমালার কাছে পরাধীন থাকলেও, তাঁদের অনেকেই বারবনিতাদের সঙ্গে নানা সূত্রে জড়িত ছিলেন। কাজেই গণিকাবৃত্তি একেবারেই উচ্ছেদ সম্ভব নয়, এটা স্বীকার করে নিয়েই শহরের সম্ভ্ৰান্ত ভদ্রলোকেরা তাঁদের নিজেদের এলাকা থেকে গণিকালয়গুলি স্থানান্তরিত করার প্রয়াস শুরু করেছিলেন উনিশ শতকেই। ওই সময়ের ‘সংবাদ প্রভাকর’, ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকাগুলিতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ঔপনিবেশিক সরকারের প্রচেষ্টায় ইংরেজি বিদ্যালয়ের কাছে বেশ্যালয়ের উচ্ছেদ তৎকালীন ভদ্র সমাজে বাহবা কুড়িয়েছিল।

সিপাহী বিদ্রোহের পরে ভারতে বসবাসকারী ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে ভারতীয় বিবি বা রক্ষিতা রাখার বিধিনিষেধ চালু হলেও, ইংরেজ সৈন্যরা কিন্তু পতিতালয়ে যেতেন। দেশ শাসনের জন্য, ইংরেজ কর্তৃপক্ষের কাছে সব চেয়ে প্রয়োজনীয় ছিল তাদের সৈন্যবাহিনী। ব্রিটিশ সরকার তাঁদের জৈবিক চাহিদা মেটানোর তাগিদ স্বীকার করে নিয়েছিল নিজেদের স্বার্থেই। পঙ্গু সৈন্যবাহিনী দিয়ে ভারতবর্ষের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করা যাবে না, এ কথা তারা বুঝতে পেরেছিল।

সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘অশ্রুত কণ্ঠস্বর’ বইটিতে তৎকালীন সময়ের গণিকাবৃত্তির বিবর্তনের বিশ্লেষণী ও তথ্য সমৃদ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায় – “১৮২৭ সালে যেখানে ব্রিটিশ সৈন্যদের মধ্যে যৌনরোগের হার ছিল শতকরা ২৯, সেটিই ১৮৩১ সালে দাঁড়ায় শতকরা ৩১, সেই সংখ্যা ১৮৬০ সালে গিয়ে দাঁড়ায় শতকরা ৭০”।

ড. অশ্বিনী তাম্বে তাঁর ‘The Elusive Ingenue: A transnational Feminist Analysis of European Prostitution in Colonial Bombay’ নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, “রোগ বৃদ্ধির এই সংখ্যাই তৎকালীন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের চোখ খুলে দেয়। ১৮৬৪ সালে ‘ক্যান্টনমেন্ট আইন’ চালু করে… সৈন্যছাউনিগুলিতে ইংরেজ সৈন্যদের জন্য নথিভুক্ত স্বতন্ত্র বেশ্যালয় তৈরি করা হয় (প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়ামেও ইংরেজ সেনাদের জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরূপ একটি বেশ্যালয়ের পত্তন করতে দেখা যায়)। নথিভুক্ত করে আলাদা পরিচয়পত্র দেওয়া হত গণিকাদের, যৌনরোগের চিকিৎসা ও তা থেকে সুস্থ করার জন্য চালু হয় ‘লক হসপিটাল। হাসপাতালগুলি স্থাপন করা হয় প্রধান প্রধান সেনা ছাউনিতে। কঠোর নিয়মের বেড়াজালে গণিকাবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত করার জন্য ইংল্যান্ডে প্রচলিত অনুরূপ একটি আইনের ভিত্তিতেই ১৮৬৮ সালে চালু করা হয় ‘Contagious Diseases Act IV (CDA IV)’ – সংক্রামক রোগ বিষয়ক আইন, যা তখন ‘চোদ্দো আইন’ বলে কুখ্যাত হয়েছিল।

‘চোদ্দো আইন’-এর মানে হল, প্রতিটি গণিকাকে প্রতি চোদ্দো দিন অন্তর অর্থাৎ মাসে দু’বার থানায় গিয়ে ডাক্তারের কাছে শারীরিক পরীক্ষা করাতে হবে। (চলবে)

তথ্যঋণ:-

১) ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস’- সুকুমার সেন।

২) ‘কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত’ – বিনয় ঘোষ

৩)  ‘কলিকাতা দর্পণ’ – রাধারমণ মিত্র

৪) ‘উনিশ শতকের কলকাতা ও সরস্বতীর ইতর সন্তান’ – সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

৫) ‘The Elusive Ingenue : A transnational Feminist Analysis of European Prostitution in Colonial Bombay’ – Dr. Ashwini Tambe

৬) ‘কলকাতার যৌনপল্লী’ – দেবাশিস বসু

৭) ‘অশ্রুত কণ্ঠস্বর’ – সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

৮) ‘পুরোনো কলকাতার অন্য সংস্কৃতি’ – বিশ্বনাথ জোয়ারদার

2 মন্তব্য

  1. তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। অজানা একটি বিষয়ে অনেক কিছুই জানতে পারলাম।
    আচ্ছা পৃথিবীর সব দেশেই কি গণিকাবৃত্তি আছে? লুকিয়ে চুরিয়ে নয়, প্রকাশ্যে?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here