horse driven cart in 19th century kolkata

সিদ্ধার্থ বসু

বাংলা সাহিত্যে হারিয়ে যাওয়া অনেক বিষয়ের মধ্যে একটি হল ঘোড়ার গাড়ি। সে কালের এই বিশেষ যানটি আজকের প্রজন্মের কাছে একটি বিস্ময়কর বস্তু বটে। তবে এই ঘোড়ার গাড়ি বা তার বাহনেরা যে বাংলা কবি-সাহিত্যিকদের এক সময় রীতিমতো নজরে ছিল, তা পরিষ্কার। এই গাড়ি ও বাহনের বিষয়কে অনেক নামীদামি লেখকই তাঁদের রচনায় স্থান দিয়েছেন। এই অশ্বশক্তির কথা প্রসঙ্গে কবি ভারতচন্দ্রের প্রশস্তিটি স্মরণীয়,

কাঞ্চীপুর বর্ধমান দু’মাসের পথ।

ছয়দিনে উত্তরিল অশ্বমনোরথ।।

এই অশ্ব বা ঘোড়ার আগমন ঘটেছিল যে বাংলা সাহিত্যে খুবই দ্রুত গতিতে, তার উল্লেখ পাই আমরা কবি ঈশ্বর গুপ্তের রচনাতেও।

বিধাতা যদাপি করে গাড়ির সহিস।

আগে ভাগে ছুটে যাই পহিস্‌ পহিস্।।

সাজিয়া কাউচম্যান উপরে উঠিয়া।

ঘোড়া জুড়ে উড়ে যাই, জুড়ি হাঁকাইয়া।।২

ভরতচন্দ্র থেকে ঈশ্বর গুপ্ত হয়ে ঘোড়ার ছবি পাই অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখায়। সেখানে বিদেশি ঘোড়ারও চিত্র পাওয়া যায়।

আগরোম্, বাগরোম্ সবরণু ঘোড়া

নর্মন ঘোড়া, জর্মন ঘোড়া,

আগডুম বাগডুম পাৎলুন ঘোড়া পান্টুন ঘোড়া

টাক্‌টুম্ টাকাটুম্ বর্মন টাট্টু

টপাটপ্ টপাটপ্ স্টডরেড ঘোড়া।

এই ঘোড়া নিয়ে ঘোড়ার গাড়ির যাত্রা শুরু হয় যেমন সেকালের দ্রুতগামী যান হিসেবে, তেমনই দ্রুততায় সেই গাড়ি ঢুকে পড়েছিল বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে। এই ঘোড়ার গাড়ির বর্ণনা আমরা পাই শিল্পী ও লেখক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আর এক লেখায় — “একটি ভারি সুন্দর ছোট্ট টাট্টু ঘোড়ার গাড়ি। সেটি ছিল ছোটলাট সাহেবের মেয়ের; নিলামে কিনেছিলেন বাবামশায়। সে কি আমাদের জন্যে? মোটেও তা নয়। কিনেছিলেন মেয়েদের জন্য; সুনয়নী বিনয়নী গাড়ি চড়ে বেড়াবে। কোন্নগরে সেই গাড়িও যেত আমাদের জন্যে। ছোট টাট্টু ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে আমরা রোজ সকালে বেড়াতে যাই।”

আবার লিখেছেন, “মাঝে মাঝে বড় জুড়িঘোড়া হাঁকিয়ে আসেন উত্তরপাড়ার রাজা। আমার টাট্টু ঘোড়া ভয়ে চোখ বুজে রাস্তার পাশে এসে দাঁড়ায়। জুড়িগাড়ির ভিতরে বসে বৃদ্ধ ডেকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কার গাড়ি যায়? কার ছেলে এরা?’ চোখে ভাল দেখতে পেতেন না। সঙ্গে যারা থাকে তারা বলে দেয় পরিচয়। শুনে তিনি বলেন, ‘ও, আচ্ছা আচ্ছা, বেশ, এসেছ তাহলে এখানে। বোলো একদিন যাব আমি।’ তাঁর জুড়িঘোড়া টগ্‌বগ্ করতে করতে তীরের মতো পাশ কাটিয়ে চলে যায় —আমার ছোট্ট টাট্টুঘোড়া তার দাপটের পাশে খাটো হয়ে পড়ে। দেখে রাস্তার লোক হাসে। যেমন ছোটবাবু, তেমনি ছোট্ট ঘোড়াটি — সহিসটি খালি বড়ো ছিল, আর সঙ্গের রামলাল চাকরটি।”

যেখানে রবিকার লালবাড়ি সে জায়গা জোড়া ছিল গোল চক্কর প্রাচীরঘেরা। একপাশে ছোট্ট একটি ফটক। সহিসরা ঘোড়া দুটো চক্করে ঢুকিয়ে ফটক বন্ধ করে দিল। সমশের লম্বা চাবুক হাতে প্রাচীরের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে বাতাসকে চাবুক লাগালে — শট্। সেই শব্দ শুনে ঘোড়া দুটো কান খাড়া করে গোল চক্করে চক্কর দিতে শুরু করলে।

এই বর্ণনায় সে সময়ের ঘোড়ার গাড়ি নিয়েও যে দাপট দেখা যেত তা পরিষ্কার। তবে সেই সঙ্গে এমন ছবি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এঁকেছেন ঘোড়ার গাড়ির সেটি অবশ্যই মনে রাখার মতো। অন্য আরেক স্থানে তিনি বর্ণনা করেছেন, “বাবামশাইয়ের সমশের কোচয়ান, আস্তাবলবাড়ির দোতলায় নহবতখানায় থাকে। তিনটে বাজলেই সে বেরিয়ে এসে বসে আস্তাবলের ছাদে খাটিয়া পেতে, ফরসি হাতে; ঠিক একটি ফুলদানির মতো ফরসি ছিল তার। আক্কেল সহিস তামাক সেজে ফরসি এনে হাতে দেয়; তবে সে তামাক খায়। সহিসরা ছিল তার চাকর; সব কাজ করে দিত, নিজের হাতে সে কিছু করত না। দূর থেকে দেখছি, সমশের আয়েস করে ফরসি হাতে খাটিয়ায় বসে তামাক খাচ্ছে, আক্কেল সহিস তার বাবরি চুল বাগাচ্ছে। ঘন্টাখানেক ফাঁপিয়ে ফাঁপিয়ে চুল আঁচড়াবার পর একটি আয়না এনে সামনে ধরলে। সমশের বাদশাহী কায়দায় বাঁ হাতে আয়নাটি ধরে মুখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে গোঁফ মুচড়ে আয়না ফেরত দিয়ে উঠল। ঘরে গিয়ে চুড়িদার জরিদার বুককাটা কাবা পরে পা বের করে দিতে আর একজন সহিস শুঁড়তোলা দিল্লীর লপেটা তার পায়ে গুঁজে দিল। আর এক সহিস মাথার শামলাটা দু হাতে এনে সামনে ধরল, সমশের পাগড়িটা মাথার ওপর থাবড়ে বসিয়ে হাতি মার্কা তকমার দিকটা উঁচু করে দিলে। অন্য সহিস ততক্ষণে লম্বা চাবুকটা নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সমশের চাবুক হাতে নিয়ে এবার দোতলা থেকে নামল মাটির সিঁড়ি দিয়ে। নীচে ঘোড়া ঠিক করে রেখেছে সহিসরা — দুধের মতো সাদাজুড়ি। সেই জুড়িঘোড়া গাড়িতে জোতবার আগে খানিক ছুটিয়ে ঠিক করে নিতে হত। যেখানে রবিকার লালবাড়ি সে জায়গা জোড়া ছিল গোল চক্কর প্রাচীরঘেরা। একপাশে ছোট্ট একটি ফটক। সহিসরা ঘোড়া দুটো চক্করে ঢুকিয়ে ফটক বন্ধ করে দিল। সমশের লম্বা চাবুক হাতে প্রাচীরের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে বাতাসকে চাবুক লাগালে — শট্। সেই শব্দ শুনে ঘোড়া দুটো কান খাড়া করে গোল চক্করে চক্কর দিতে শুরু করলে। একবার করে ঘোড়া ঘুরে আসে আর চাবুকের শব্দ হয় শট্ শট্। যেন সার্কাস হচ্ছে। এইরকম আধঘন্টা ঘুরিয়ে সমশের কোচয়ান চাবুক আক্কেল সহিসের হাতে ছেড়ে দিয়ে নামল। আক্কেল গাড়ি বের করলে— ঝকঝক তকতক করছে গাড়ির ঘোড়ার রূপো-পিতলের শিকলি-সাজ। গাড়িতে জুড়ি জোতা হলে পর সমশের কোচবাক্সে উঠে হাতা গুঁটিয়ে দাঁড়াতেই সহিস রাশ তুলে দিলে তার হাতে। রাশ ধরবার কায়দা কী ছিল সমশের কোচয়ানের, দশ আঙুলের ভেতরে কেমন কায়দা করে ধরত। সেই রাশে একবার একটু টান দিতেই বড় বড় দুটো ঘোড়া তড়বড় করে এসে গাড়ি বারান্দায় ঢুকল। গাড়ি বারান্দায় ঢুকতেই যে পুরু কাঠের পাটা পাতা থাকত সেটা শব্দ দিলে একবার হুড়দুম্। যেন জানান দিলে গাড়ি হাজির। বাবামশায় হাওয়া খাবার জন্য তৈরি হয়ে গাড়িতে চাপলেন। গাড়ি চলল গাড়িবারান্দা ছেড়ে। সমশের তখনও দাঁড়িয়ে রাশ হাতে কোচবাক্সে। কাঠখানা চারখানা চাকার চাপে আর দুবার শব্দ দিলে হুড়ুদুম্ হুড়ুদুম্। ধপাস করে এতক্ষণে সমশের কোচয়ান কোচবাক্সে জাঁকিয়ে বসল— যেন সিংহাসনে বসলেন আর এক লক্ষ্ণৌয়ের নবাব।”

এই ঘোড়ার গাড়ির ছবি এমন নিখুঁত ভাবে তিনি এঁকেছেন যেন পড়ে মনে হয় তাঁরই আঁকা ছবি দেখছি। এ ছবির কল্পনা হয়তো এখনকার পাঠকের কাছে তেমন ভাবে দাগ কাটবে না। কিন্তু সমশের কোচওয়ানের ভাবভঙ্গির প্রকাশ যে রাজকীয় ছিল তা অবশ্যই চোখে পড়বে। তার হাবভাবের বর্ণনায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় ‘লক্ষ্ণৌয়ের নবাব’, সত্যিই এই বর্ণনা পড়লে তা-ই মনে হয়। এ যেন তাঁর তুলির টানের মতোই শিল্পময় নিখুঁত বর্ণনা লেখায়। (চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here