horse driven cart in 19th century kolkata
সিদ্ধার্থ বসু

এই বর্ণনার অন্য ছবি ধরা পড়ে আরেক লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের লেখায়, “খেয়ালি ছিল আমাদের গাড়োয়ান, বাবাকে নিত্য আদালতে নিয়ে যেতো। তাদের পরিবারকে চিনতাম — গাড়ির দরকার হলে এদের বাড়িতে এসে বলে গেলেই ঠিক সময়ে খেয়ালি হাজির হতো। ঘোড়াগুলো পক্ষীরাজের বংশধর নয়। অনেকগুলি তাদের ঘরের বাচ্চা। ছোট বাচ্চা মায়ের দুধ খায়, মায়ের পাশে ঘুর ঘুর করে, মাকে কেন্দ্র করে গোল হয়ে ঘোরে। পিকউইক শুধিয়েছিল গাড়োয়ানকে, ‘গাড়ির ঘোড়া কখন খোল ?’ সে বলেছিল, বাঁধন খুলিনে, ‘খুললেই বসে পড়বে— ঘড়া একবার বসলে আর ওঠে না।’ আমাদের পক্ষীরাজেদের সাজসজ্জায় আভিজাত্য ছিল না — লাগাম দড়ির জিন্ চটের — কারও কারও চামড়ার জিন্ লাগাম সাজসজ্জা পরবার সৌভাগ্য ছিল। এমনকী পাশ ঢাকা চশমাও পরতো কেউ কেউ। এমনই বলবান এরা যে দুজনে ছাড়া চার চাকার পালকি গাড়ি টানতে পারত না। অবশ্য শহরের জঞ্জাল ফেলার দু-চাকার গাড়ি একজনই টানতে পারতো।”

আরও পড়ুন: রবিবারের পড়া: বাংলা সাহিত্যে ছক্কর গাড়ি/ প্রথম পর্ব

এই ছাপোষা গাড়ির বর্ণনার পাশাপাশি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের কলমে উঠে এসেছে অন্য এক ছবি। সেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন, “তবে দেখলাম বটে ‘ওয়েলার’ ঘোড়াকে পালকিগাড়ি টানতে। সোনা-রূপার কাজ করে পয়সা হয়েছে পরামানিকদের। পাকাবাড়ি উঠল দোতলা। বড়লোকের ‘ঘোড়ারোগ’ দেখা দিল। এক দামী পালকি গাড়ি ‘ওয়েলার’ ঘোড়া এলো। স্কুলে যাবার পথে দেখতাম, তাকে দুজন সহিস হিস্ হিস্ শব্দ করছে — খটরা বুরুশ দিয়ে গা সাফ করছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রোজই দেখতাম। ছেলেদের কাছে শুনতাম, ‘ওয়েলার’ ঘোড়া অস্ট্রেলিয়া থেকে আসে। ভূগোল পড়েও জানতাম অস্ট্রেলিয়া ঘোড়ার জন্য বিখ্যাত ছিল। তবে ‘ওয়েলার’ অস্ট্রেলিয়ার জাত কি না তা জানি না আজও।”

এই ভাবে সাহিত্যে ঘোড়ার গাড়ির ছবির সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘোড়ার মৃত্যুর ছবি এঁকেছেন আরেক সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে হাস্যরসাত্মক লেখায় যিনি অদ্বিতীয়। তিনি শিবরাম চক্রবর্তী। তাঁর কলমে এই চতুষ্পদ প্রাণীটির একটি করুণ বর্ণনা পাওয়া যায়, “খাবার সময় জীবনে সে যা কখনও খায়নি, কেবল লোভ করেই এসেছে, সেই ভেজানো ছোলা দিতে দেখে হাসতে হাসতেই মারা পড়েছিল।”

বাংলা সাহিত্যে এই ঘোড়ার গাড়ি রবীন্দ্রনাথের গল্পে অন্য মাত্রা পেয়েছে। তিনি ঘোড়ার গাড়ির বর্ণনা করে এক রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করেছেন তাঁর ‘মাস্টারমশাই’ গল্পে। এক ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে এই ঘোড়ার গাড়ি ঘিরে। এক অদ্ভুত পরিস্থিতির বর্ণনা করেছেন যা রীতিমতো রহস্যের সৃষ্টি করে…এখানে লক্ষণীয় রবীন্দ্রনাথের গল্পে নায়ক হিন্দিতে কথা বলে। সুতরাং বুঝতে অসুবিধে হয় না সে সময়ের চালকগণ অর্থাৎ কোচওয়ানেরা অধিকাংশই অবাঙালি ছিল। তাই নায়ক হিন্দিতে প্রশ্ন করে।

ওই রকমই করুণ বর্ণনা পাই প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের লেখায়, “চকচকে নতুন পালকি গাড়ি নিয়ে চলেছে ওয়েলার ঘোড়া — ঠগান কোচকেসে বসে লাগাম টেনে ধরে। একদিন দেখি ওয়েলার ঘোড়া গাড়ি টানবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে দাঁড়িয়ে গেছে রাস্তার মাঝে। ঠগান চাবুক মারে। ফল উলটো হয়। চিঁহি শব্দ করছে আর পিছনের পা দিয়ে লাফাচ্ছে — গাড়িটা জখম হয়ে গেল। লোক জড় হয়ে গেল। সবাই শুধোয় — পাগল হয়ে গেল নাকি? অনেক কষ্টে ঠগান ঘোড়ার মুখ ধরে আস্তাবলে নিয়ে যায়। পরদিন ভোরে নুটি বলে, ‘পরামাণিকদের সেই ঘোড়াটা মরে গেছে কাল রাতে।”

বাংলা সাহিত্যে এই ঘোড়ার গাড়ি রবীন্দ্রনাথের গল্পে অন্য মাত্রা পেয়েছে। তিনি ঘোড়ার গাড়ির বর্ণনা করে এক রহস্যময় পরিবেশ তৈরি করেছেন তাঁর ‘মাস্টারমশাই’ গল্পে। এক ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে এই ঘোড়ার গাড়ি ঘিরে। এক অদ্ভুত পরিস্থিতির বর্ণনা করেছেন যা রীতিমতো রহস্যের সৃষ্টি করে, “কোনও মতে গলায় আওয়াজ আনিয়া মজুমদার কহিল, ‘গাড়োয়ান গাড়ি রোখো। বোধ হইল গাড়োয়ান যেন দাঁড়াইয়া উঠিয়া দুই হাতে রাশ টানিয়া ঘোড়া থামাইতে চেষ্টা করিল — ঘোড়া কোনোমতেই থামিল না। না থামিয়া ঘোড়া দুটা রেড রোডের রাস্তা ধরিয়া পুনর্বার দক্ষিণের দিকে মোড় লইল। মজুমদার ব্যস্ত হইয়া কহিল, ‘আরে, কাঁহা যাতা।’ কোন উত্তর পাইল না।”

এখানে লক্ষণীয় রবীন্দ্রনাথের গল্পে নায়ক হিন্দিতে কথা বলে। সুতরাং বুঝতে অসুবিধে হয় না সে সময়ের চালকগণ অর্থাৎ কোচওয়ানেরা অধিকাংশই অবাঙালি ছিল। তাই নায়ক হিন্দিতে প্রশ্ন করে। এই ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে এই গল্পেই তিনি আরেক স্থলে এক ভৌতিক দৃশ্য উপস্থিত করেন – “এদিকে গাড়িটা কেবলই ময়দানের রাস্তার উত্তর হইতে দক্ষিণে ও দক্ষিণ হইতে উত্তর চক্রপথে ঘুরিতে লাগিল। ঘোড়া দুটো ক্রমেই যেন উন্মত্ত হইয়া উঠিল — তাহাদের বেগ কেবলই বাড়িয়া চলিল — গাড়ির খড়্‌খড়েগুলো থর্‌থর্‌ করিয়া কাঁপিয়া ঝর্‌ঝর্ শব্দ করিতে লাগিল।”

horse cart beside horse driven tram in old calcutta
ঘোড়ায় টানা ট্রামের পাশে ঘোড়ার গাড়ি।

এই মাস্টারমশাইয়ের গল্পের শেষ পর্বে এসে রবীন্দ্রনাথ এই ঘোড়ার গাড়িতে কেন্দ্রীয় চরিত্রের যে মৃত্যুর বর্ণনা দিয়েছেন তা যেমন বেদনাদায়ক তেমনই হৃদয়বিদারক। পরিবেশ পরিস্থিতি সব মিলিয়ে মৃত্যুর যে আবহাওয়া তিনি তৈরি করেছেন তা সত্যিই বাংলা ছোটো গল্পে বিরল। ‘‘শরীরের ভার যখন আর বহিতে পারে না এমন সময় হরলাল একটা গাড়ি দেখিয়া তাহাকে ডাকিল। গাড়োয়ান জিজ্ঞাসা করিল, ‘কোথায় যাইবে।’’ হরলাল কহিল, ‘কোথাও না। এই ময়দানের রাস্তায় খানিক্ষণ হাওয়া খাইয়া বেড়াইব’।

গাড়োয়ান সন্দেহ করিয়া চলিয়া যাইবার উপক্রম করিতেই হরলাল তাহার হাতে আগাম ভাড়া একটা টাকা দিল। সে গাড়ি তখন হরলালকে লইয়া ময়দানের রাস্তায় ঘুরিয়া বেড়াইতে লাগিল।”

এরপর এই গল্পের একেবারে শেষ পর্বে এসে মৃত্যুর পরিবেশ রচনা করেন তিনি নাটকীয় ভাবে – “গির্জ্জার ঘড়িতে একটা বাজিল। গাড়োয়ান অন্ধকার ময়দানের মধ্যে গাড়ি লইয়া ঘুরিতে ঘুরিতে অবশেষে বিরক্ত হইয়া কহিল, ‘বাবু ঘোড়া তো আর চলিতে পারে না— কোথায় যাইতে হইবে বলুন।’

কোন উত্তর পাইল না। কোচবাক্স হইতে নামিয়া হরলালকে নাড়া দিয়া আবার জিজ্ঞাসা করিল। উত্তর নাই। তখন ভয় পাইয়া গাড়োয়ান পরীক্ষা করিয়া দেখিল হরলালের শরীর আড়ষ্ট, তাহার নিঃশ্বাস বহিতেছে না।”

এই গল্পেই তিনি কলকাতার রাস্তার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন ‘স্যাকরাগাড়ি ভরতি করিয়া হিন্দুস্থানী মেয়েরা কালীঘাটে চলিয়াছে।’ বাংলা সাহিত্যে এই স্যাকরা গাড়ি বা ঘোড়ার গাড়ি নানান নামে এসেছে। যেমন শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁহার আত্মচরিতে এই গাড়িকে লিখেছেন ‘দোলদার ছক্কাগাড়ি’। তবে তাকে যে নামেই লেখকরা ডাকুন না কেন আসলে সে ঘোড়ার গাড়ি। শিবনাথ শাস্ত্রী এই ছক্কাগাড়ির বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, “সেকালে এক প্রকার দোলদার ছক্কর-গাড়ি ছিল, তাহা চাঙ্গড়িপোতার সন্নিহিত রাজপুর গ্রাম হইতে কলিকাতায় আসিত। কুঠীওয়ালাবাবুরা ও অপেক্ষাকৃত পদস্থ ব্যক্তিরা প্রতি সোমবার সেই দোলদার ছক্কা-গাড়ি চড়িয়া কলিকাতায় আসিতেন ও শনিবার কলিকাতার ধর্মতলা হইতে ঐ গাড়ি চড়িয়া বাড়ি যাইতেন।” (চলবে)

 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here