রবিবারের পড়া : লিপি উদ্ভাবন প্রসঙ্গে/ শেষ পর্ব

0
brahmi script
nimai duttagupta
নিমাই দত্তগুপ্ত

আমরা ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক উদ্ভাবন থেকে জানতে পেরেছি যে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের নানা জাতির মধ্যে বিভিন্ন প্রকার লিপির স্বাধীন আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। কোনো কোনো লিপি প্রাথমিক অবস্থা অতিক্রম করার আগেই লুপ্ত হয়েছে। স্বাধীন ভাবে সব সময় কিংবা বিভিন্ন সময়ে একাধিক জাতি যে আক্ষরিক লিপি উদ্ভাবন ও ব্যবহার করেছে তা ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু বর্ণমালার আবিষ্কার হয়েছে মাত্র একবার, যা দু’বার সংঘঠিত হওয়ার উপায় নেই।

প্রত্নতত্ত্বীয় নিদর্শন থেকে জানা যায় যে, বর্ণমালার আদি জন্মভূমি হল সিরিয়া ও প্যালেস্টাইন। প্রাচীন উত্তর সেমিটিক লিপির বহু নমুনা ওই দুই দেশের প্রত্নতত্ত্বীয় খননকালে পাওয়া গিয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় মেলেনিয়ানে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সংস্কৃতিতে ওই দেশ দু’টি উন্নত ছিল। বহু শতাব্দী যাবৎ সিরিয়া ও প্যালেস্টাইন পুরাকালের শ্রেষ্ঠ দেশ মিশর ও মেসোপটেমিয়ায় সেতুস্বরূপ ছিল। ফলে আদানপ্রদানের সুযোগ পেয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ও জটিলতা বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য লিপির সীমাবদ্ধতা প্রকট হয়। তখন কিউনিফর্ম, হায়রোগ্লিফিক প্রভৃতি লিপি আর প্রয়োজন মেটাতে পারছিল না। সে কারণে উন্নত লিপিপদ্ধতি উদ্ভাবন করার অনুকূল পরিবেশ এই দেশে দেখা দেয়। তারই ভিত্তিতে তাঁরা বর্ণমালার উন্নতি করতে সমর্থ হয়।

ভারতের ভাষাগুলির সংখ্যা ও লিপির কথা গোড়াতেই উল্লেখ করেছি। আমাদের ভাষার খরোষ্ঠী ও ব্রাহ্মী লিপির আদি ঐতিহ্য সম্পর্কে বহু গবেষণা হয়েছে। পরস্পরবিরোধী আরও নানা মতামত প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু কোনো সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন রবিবারের পড়া : লিপি উদ্ভাবন প্রসঙ্গে/ প্রথম পর্ব

ভারতের লিপির প্রাচীনত্ব নিয়ে আলোচনা করতে হলে বেদের কথা উল্লেখ করতেই হয়। কারণ হল বেদ হিন্দুদের সব থেকে পুরোনো গ্রন্থ। লিপির উল্লেখ সমগ্র বৈদিক যুগে পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও তখন লিপি ছিল না এমন মতামত দেওয়া সম্ভব না। অধ্যাপক ডেভিড বলেছেন, বৈদিক সাহিত্যে লিপির উল্লেখ না থাকার মানেই হল লিপি থাকার বড়ো প্রমাণ। লিপির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় বৌদ্ধ সাহিত্যে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর বৌদ্ধগ্রন্থে আক্ষরিক অর্থে বর্ণমালার সাহায্যে বিভিন্ন শব্দ রচনা করা হয়েছে। জাতকে লেখা ও লেখক শব্দ পাওয়া গিয়েছে। বাল্যকালে বুদ্ধ নাকি লিপির অভ্যাস করেছিলেন।

গোরখপুর জেলায় প্রাপ্ত সৌগোরার তাম্রশাসন অথবা যে মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে তার কাল খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী। এই তথ্যের বিশ্লেষণে প্রমাণ হয়েছে ভারতীয় লিপি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে ব্যাপক ভাবে প্রচলিত ছিল। তা হলে বলা যায় লিপি অন্তত দু-তিনশো বছর আগে ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল। তা না হলে ওই সময় ব্যাপক ভাবে প্রচলিত হওয়া সম্ভব না। তা ছাড়া আরও কারণ হল, তখন রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক অবস্থা অনুকূলে ছিল। ফলে ভারতে বর্ণমালার লিপি প্রচলনের প্রয়োজন হয়েছিল বা বিকাশের সুযোগ পেয়েছে। ওই সময় দেশ-বিদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিম্বিসারের নেতৃত্বে মগধের রাজশক্তি উত্তর ভারতের বড়ো অংশের রাজনৈতিক ঐক্য, সংহতি ও সাংস্কৃতিক বিকাশ স্থাপন করতে পেরেছিল। বলা যায় সময়টা ছিল বিকাশমান। তাই ওই পরিবেশ লিপির প্রবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিল।

ভারতের বর্ণমালার সুপ্রাচীন নিদর্শন হল খরোষ্ঠী আর ব্রাহ্মীলিপি। এই লিপিদ্বয়ের মধ্যে খরোষ্ঠীর আদি ইতিহাস অনেকটা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। খ্রিস্টীয় ১৭৫ পূর্বাব্দ থেকে প্রথম শতাব্দীর মধ্যে অনেক ইন্দোগ্রিক ম্রদ্রায় খরোষ্ঠী লিপির নমুনা আবিষ্কার হয়েছে। অশোকের অনুশাসনের সময়ের একটি খরোষ্ঠী লিপির অনুবাদ আবিষ্কার করা গিয়েছে ১৮৩৬ সালে। এই লিপির কাল খ্রিস্টপূর্ব ২৫১ অব্দ। এ ছাড়াও নিয়ালো-লান, পূর্ব তুর্কি প্রভৃতি স্থানে খরোষ্ঠী লিপির নমুনা পেয়েছেন স্যার অরেল স্টাইন। এই বর্ণমালায় কয়েকটি বৌদ্ধ গ্রন্থ রচিত হয়েছিল।

খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর পর এই বর্ণমালার ব্যবহার খুবই সামান্য। সম্ভবত ওই সময় থেকেই এই লিপি এ দেশ থেকে উঠে যায়। খরোষ্ঠী লিপি লেখার রীতি হলো দক্ষিণ দিক থেকে বাম দিক। আবার কয়েকটি লিপির নমুনা থেকে দেখা যায় বাম দিক থেকে দক্ষিণ দিকে লেখা হয়েছে। এই লিপি আরামায়িক লিপি থেকে উদ্ভব বলে এখন স্বীকৃত। আরামায়িকের সঙ্গে খরোষ্ঠী বর্ণমালার বাহ্যিক ও ধ্বনিগত অনেক মিল রয়েছে। ভারতীয়দের সঙ্গে প্রাচীনকালে আরামায়িকের সেমিটিক জাতির বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সম্ভবত পারস্যের পথে উত্তর পশ্চিম ভারতে আরামায়িক ভাষার প্রভাব পড়ে।

ব্রাহ্মী বর্ণমালার আবিষ্কারক আর্যগণ যথেষ্ট স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই ভাষা সংস্কৃত ভাষা প্রকাশের উপযোগী করে সৃষ্টি হয়েছিল। ভাষাতত্ত্ব ও ধ্বনিতত্ত্বের দিক থেকে এই রূপ নিখুঁত ও সর্বাঙ্গসুন্দর বর্ণমালা সৃষ্টির দৃষ্টান্ত খুবই অল্প।

ভারতের বিভিন্ন বর্ণমালার পূর্বরূপ হল ব্রাহ্মী বর্ণমালা। তার আবিষ্কারের ইতিহাস সম্পূর্ণ জানা সম্ভব হয়নি। লিপি-বিশারদরা ব্রাহ্মী লিপি বিষয়ে প্রধানত দু’ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। প্রথম লিপি-বিশারদগণ মনে করেন, ব্রাহ্মী বর্ণমালা ভারতেই স্বাধীন ভাগে উদ্ভাবিত হয়েছে। এই বর্ণমালা বিদেশি বর্ণমালার প্রভাব থেকে মুক্ত। মহেঞ্জোদাড়ো হরপ্পার লিপি আবিষ্কারের পর সিন্ধু সভ্যতার লিপির সঙ্গে তাঁরা ব্রাহ্মী লিপির সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন। ব্রাহ্মী বর্ণমালার বিবর্তনে বিদেশি প্রভাব ছিল। তবে ঠিক কোন বিদেশি বর্ণমালা কত দূর পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করেছিল সে সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে মতভেদ আছে।

জেমস প্রিন্সেপ, রাউল দ্য রোশেও, ওটক্রিস্ট মুলের, এমিল সেনেটর প্রমুখদের অভিমত হল ব্রাহ্মী বর্ণমালা গ্রিক বর্ণমালা থেকে উদ্ভূত। জোসেফ অনেভি, উইলসন প্রমুখরা হেলেনীয় প্রভাবের কথা বলছেন। ঐতিহাসিক কারণে তা মানা যায় না। ভারতে গ্রিক সাংস্কৃতিক প্রভাব পড়ার কয়েকশো বছর পূর্বেই ব্রাহ্মী বর্ণমালা আত্মপ্রকাশ করেছিল। সমকালে অনেক লিপিবিদ ও পণ্ডিতের ধারণা, অন্যান্য প্রাচীন বর্ণমালার মতো ব্রাহ্মী বর্ণমালাও সেমিটিক বর্ণমালা থেকে  উদ্ভূত হয়েছে। আবার কেউ কেউ মনে করেন, ফিনিশীয় বর্ণমালা ব্রাহ্মী বর্ণমালাকে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু মনে রাখা ভালো বর্ণমালার বিস্তার আর প্রভাব সম্পর্কে কোনো যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না।

অপর দিকে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ সেমেটিক অথবা আরামায়িক বর্ণমালা ব্রাহ্মী লিপি দক্ষিণ সোমেটিক থেকে উদ্ভূত। তবে যে বর্ণমালা থেকেই প্রভাব পড়ুক না কেন, সে বিতর্কে না গিয়ে বলা যায় ব্রাহ্মী বর্ণমালার আবিষ্কারক আর্যগণ যথেষ্ট স্বকীয়তার পরিচয় দিয়েছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই ভাষা সংস্কৃত ভাষা প্রকাশের উপযোগী করে সৃষ্টি হয়েছিল। ভাষাতত্ত্ব ও ধ্বনিতত্ত্বের দিক থেকে এই রূপ নিখুঁত ও সর্বাঙ্গসুন্দর বর্ণমালা সৃষ্টির দৃষ্টান্ত খুবই অল্প। (শেষ)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here