rabindranath tagore
শম্ভু সেন

পানীয় থেকে আহারের কথায় আসা যাক। বনফুল স্মরণ করেছেন কবির সঙ্গে তাঁর সে দিনের মোলাকাতের কথা – নিমের রস তো হল। একটু পরেই ভৃত্য নীলমণি বেশ বড়ো একটা কাঁসার থালা এনে রবীন্দ্রনাথের সামনে রাখল। থালার ঠিক মাঝখানে একটা রুপোর বাটি উপুড় করা। আর তার চার পাশে নানা রকমের কাটা ফল গোল করে সাজানো। কাটা ফলের ফাঁকে ফাঁকে গুঁড়ো গুঁড়ো কী সব ছড়ানো। প্রাতরাশের এই অদ্ভুত সজ্জা দেখে বনফুল তো অবাক। তাঁর বিস্ময়ের মাত্রা আরও বেড়ে গেল যখন রবীন্দ্রনাথ আস্তে করে রুপোর বাটিটা তুলে ফেললেন আর তার ভেতর থেকে ওই বাটির মাপের সাদা জমানো একটা জিনিস বেরিয়ে পড়ল। জিনিসটা কী জানতে চাইতেই রবীন্দ্রনাথ বললেন, ক্রিম। আর এগুলো নানা রকমের ফল, বাদাম, ডাল ভেজানো, খাবে তুমি? বনফুল খাননি। তবে লক্ষ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের এই নাতিদীর্ঘ প্রাতরাশ।

আরও পড়া: রবিবারের পড়া : খুশখানেওয়ালা রবীন্দ্রনাথ/প্রথম পর্ব

কবির বৈকালিক আহার কেমন ছিল? তারও একটা নমুনা মেলে প্রমথনাথ বিশীর স্মৃতিকথায়: “তখন তিনি বৈকালিক জলযোগে বসিয়াছেন – সময় নির্বাচনটা হয়তো একেবারে আকস্মিক ছিল না। কবিতাটি লইয়া গিয়া তাঁহার হাতে দিলাম। তিনি এক পলকে পড়িয়া লইয়া হাসিলেন। তারপর এক প্লেট ‘পুডিং’ আমার হাতে তুলিয়া দিলেন। ‘পুডিং’ অতি উপাদেয় খাদ্য সন্দেহ নাই; কিন্তু হায়, আমি কি ইহার জন্য আসিয়াছি? আমি কি ইহার জন্যই সর্পসংকুল বল্মীকস্তূপের পাশে বসিয়া দুপুর রোদে ঘামিতে ঘামিতে কবিতা লিখিয়াছি। পুডিং শেষ করিলাম। কিন্তু কই, প্রশংসা তো করিলেন না। আমি উসখুস করিতেছি দেখিয়া আরো রসপিপাসু মনে করিয়া এক প্লেট আনারস দিলেন।”

কবির এই প্রাতরাশ ও বৈকালিক আহারের বহর দেখে মনে হতেই পারে যে, তিনি প্রবল পরিমাণে ভোজন-প্রিয় ছিলেন, যাকে সাদা বাংলায় বলে পেটুক দামু। কিন্তু মোটেও তা সত্যি নয়। সৈয়দ মুজতবা আলি বলেছেন, “বস্তুত রবীন্দ্রনাথের মতো ভোজনবিলাসী আমি কমই দেখেছি। এবং প্রকৃত ভোজনবিলাসীর মতো পদের আধিক্য ও বৈচিত্র্য থাকলেও পরিমাণে কম খেতেন – তাঁর সেই পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ও তার সঙ্গে মানানসই দোহারা দেহ নিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় ঢের কম। ফরাসিতে বলতে গেলে তিনি ছিলেন গুরমে (ভোজনবিলাসী, খুশখানেওয়ালা); গুরমা (পেটুক) বদনাম তাঁকে পওহারী বাবা (এই সাধুজী নাকি শুধুমাত্র পও = বাতাস খেয়ে প্রাণধারণ করতেন) দেবেন না।”

এমনিতে ঠাকুরবাড়ির খাওয়াদাওয়ার বহরটা কিছু কম ছিল না। সকালে-সন্ধ্যায় পঞ্চব্যঞ্জন ছাড়া পাত পড়ত না। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরদের বাড়ির রন্ধনপ্রণালী ও তার স্বাদ ছিল তখনকার অন্যান্য বনেদি বাড়ির রান্নার থেকে বেশ আলাদা। রান্নায় যশুরে প্রভাব বেশি থাকাটাই এর কারণ বলে মনে করেন ঠাকুরবাড়ির পরবর্তী প্রজন্ম। অনেকে বলতেন, ঠাকুরবাড়ির রান্না খেলে মুখের অরুচি দূর হয়ে যেত। এতই স্বাদে ভরপুর ছিল সে বাড়ির রান্না। সে বাড়ির দেশি রান্না ছিল স্বতন্ত্র – যেমন বড়ি দিয়ে শুক্তো, আলু দিয়ে মুগের ডালের মিষ্টিকারি, পাঁঠার মাংসের পাতলা ঝোল, মরিচ দেওয়া মাছের ঝোল, চিংড়ি মাছের সঙ্গে লাউ দিয়ে নারকোলের মালাইকারি, রুই মাছের খোয়া ক্ষীরের দোমপোক্ত আর কাঁচা আমের স্বচ্ছ সরষে ভাসা স্ফটিক ঝোল। ইলিশ মাছের নানাবিধ রান্না ছিল ঠাকুর-পরিবারের একেবারে নিজস্ব পারিবারিক রান্না।

ফরাসিতে বলতে গেলে তিনি ছিলেন গুরমে (ভোজনবিলাসী, খুশখানেওয়ালা); গুরমা (পেটুক) বদনাম তাঁকে পওহারী বাবা (এই সাধুজী নাকি শুধুমাত্র পও = বাতাস খেয়ে প্রাণধারণ করতেন) দেবেন না।”

সারা বছরে হরেক রকমের নানাবিধ ডালের বড়ি দেওয়ার আসর বসত তরকারি-ঘরে। পৌষ মাসের সংক্রান্তিতে বড়ি দেওয়া শুরু হত, তবে তার প্রস্তুতি চলত কয়েক দিন আগে থেকেই। তরকারি-ঘরের দক্ষিণে একতলার খোলা চাতালে একটা ছাউনির নীচে থাকত কাঁঠাল কাঠের একটা মহামজবুত ঢেঁকি। সেটায় পাড় পড়ত দু-একদিন আগে থেকেই। বাড়ির লোকজনরা ডাল-চাল-কলাই কুটে সব ঠিকঠাক করে রাখত পৌষ সংক্রান্তির বড়ি, পিঠে ও নবান্নর জন্য। সংক্রান্তির সকালে বাড়ির মা-বউ-মেয়ে স্নান করে এলোচুলে পরিষ্কার শাড়ি পরে এসে বসতেন। তাঁদের সামনে মাঝখানে বড়ি দেওয়ার জন্য জাল লাগানো ছোটো ছোটো খাট থাকত। এক একটা বড়ির খাট শেষ হত আর তা চলে যেত রোদে এবং সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা জাল লাগানো খাট দাসীরা নিয়ে এসে বসিয়ে দিত মেয়েদের সামনে। এই ভাবে শীতের সকালে প্রায় পনেরো দিন ধরে বড়ি দেওয়া হত তরকারি-ঘরে। সংক্রান্তির দিন থেকেই তৈরি হত দুধে দেওয়া, রসে জড়ানো নারকেলের পুর দেওয়া নানা ধরনের পিঠে। বৈশাখীর সংক্রান্তিতে তৈরি হত সারা বছরের ঝাল ও আম কাসুন্দি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “কাঁচা আম ফালি করে কেটে কেটে আমসি শুকনো হত। ছোটো বড়ো নানা সাইজের নানা কাজ-করা কালো পাথরের ছাঁচে আমের রস থাকে থাকে জমিয়ে তোলা হত। রোদ-খাওয়া সরষের তেলে মজে উঠত ইঁচড়ের আচার।”

তবে রবির পক্ষে ভোজনের এই অবারিত লোভনীয় ক্ষেত্রে অবাধ বিচরণ শৈশবে প্রবল ভাবে ব্যাহত হয়েছিল ভৃত্যরাজকতন্ত্রের জন্য। ভৃত্য সর্দার ব্রজেশ্বর তথা ঈশ্বরের দাপটে একটি-দু’টির বেশি লুচি পাতে পড়ার জো ছিল না। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “লুচি আমাদের সামনে একটা মোটা কাঠের বারকোশে রাশ করা থাকিত। প্রথমে দুই-একখানি লুচি যথেষ্ট উঁচু হইতে শুচিতা বাঁচাইয়া সে (ইশ্বর) আমাদের পাতে বর্ষণ করিত।… তাহার পর ঈশ্বর প্রশ্ন করিত, আরও দিতে হইবে কিনা। আমি জানিতাম, কোন উত্তরটি সর্বাপেক্ষা সদুত্তর বলিয়া তাহার কাছে গণ্য হইবে। তাহাকে বঞ্চিত করিয়া দ্বিতীয়বার লুচি চাহিতে আমার ইচ্ছা করিত না। বাজার হইতে আমাদের জলখাবার কিনিবার পয়সা ঈশ্বর পাইত। আমরা কী খাইতে চাই প্রতিদিন সে তাহা জিজ্ঞাসা করিয়া লইত। জানিতাম, সস্তা জিনিস ফরমাশ করিলে সে খুশি হইবে। কখনো মুড়ি প্রভৃতি লঘুপথ্য, কখনো বা ছোলাসিদ্ধ, চিনা বাদাম-ভাজা প্রভৃতি অপথ্য আদেশ করিতাম।” চাকরদের হাতযশে বৈকালিক আহারে কখনও মিলত এক পয়সা দামের গোলাপ-রেউড়ি, কখনও বা সস্তা দামের তিলে গজা। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং কবুল করেছেন, “এমনি করে অল্প খাওয়া আমার ছেলেবেলা থেকেই দিব্যি হয়ে গিয়েছিল। সেই কম খাওয়াতে আমাকে কাহিল করেছিল এমন কথা বলবার জো নেই।” শেষ পর্যন্ত যখন ব্রজেশ্বরের ফর্দ এড়িয়ে জলপানে বরাদ্দ হল পাউরুটি আর কলাপাতা মোড়া মাখন, তখন কিশোর রবির মনে হয়েছিল, আকাশ যেন হাতের নাগালে পাওয়া গেল। অবশ্য নিয়মের ব্যত্যয় ঘটত কখনও সখনও। বৈকালিক আহারে “যদি জুটে যেত কচুরি-সিঙাড়া, এমন-কি আলুর দম, সেটা মুখে পুরতে সময় লাগত না।”

জ্বরজারি হলে প্রথম দিনেই ব্যবস্থা হত উপোসের। অল্প অল্প জল খাওয়া চলত, তবে তা গরম জল। তার সঙ্গে এলাচদানা চলতে পারত। তিন দিন উপোসের পর যখন মৌরালা মাছের ঝোল আর গলা ভাত বরাদ্দ হত, তখন তা কিশোর রবির কাছে মনে হত অমৃত। (চলবে)          

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here