convict jyotish pramanik

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: নির্বিকার মুখে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন সাদা টি-শার্ট, ব্ল্যাক জিনস, স্নিকার্স পরা  যুবকটি। নিজের আইনজীবীকে খুনের দায়ে যাবজ্জীবন সাজা শোনার পরও কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না দোষী সাব্যস্ত জ্যোতিষ প্রামাণিকের। শুধু আদালত থেকে বের হয়ে কোর্ট-লক আপে যাওয়ার সময় জানালেন, তাঁর কিছু বলার নেই। প্রায় দু’বছর আগে রাজ্য জুড়ে আলোড়ন ফেলে দেওয়া আইনজীবী কিশোর চন্দ হত্যা মামলার রায় ঘোষণায় স্বস্তি আইনজীবী মহল সহ সব মহলেই।

২৩ নভেম্বর, ২০১৫। সে দিন জলপাইগুড়ির স্টেশন রোডের তিনতলার ফ্ল্যাটে নিজের চেম্বারেই ছিলেন জলপাইগুড়ি আদালতের নামী আইনজীবী কিশোর চন্দ। সকাল ৯টার কিছু পর তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন তাঁর পুরোনো মক্কেল শিলিগুড়ির ভক্তিনগর এলাকার বাসিন্দা জ্যোতিষ প্রামাণিক। দশটা নাগাদ তিনি ফ্ল্যাটের সিড়ি দিয়ে তাড়াহুড়ো করে নেমে চলে যান। তাঁর চলে যাওয়ার ধরন দেখে সন্দেহ হয় আইনজীবীর মুহুরি এবং গাড়ির চালকের। তাঁরা ওপরে এসে দেখতে পান কিশোর চন্দ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। পাশে একটি রক্ত মাখা ভোজালি। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। দিনের আলোয় এক আইনজীবীর নৃশংস খুনের ঘটনা আলোড়ন ফেলে আইনজীবী মহলে।

আতঙ্কিত হয়ে পড়েন শহরের বাসিন্দারাও। মৃত কিশোর চন্দের দেহে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ১৮টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় ময়নাতদন্তে, যা থেকে খুনির নৃশংসতার প্রমাণ মেলে।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সময় আইনজীবীর মুহুরি বিবেক দে সরকার জানান, তিনি যখন সিঁড়ি দিয়ে ফ্ল্যাটে উঠছিলেন সেই সময় জ্যোতিষ প্রামাণিক তাঁকে ধাক্কা মেরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যান। জ্যোতিষের জামায় রক্তের দাগ লেগে ছিল বলে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তিনি।

lawyer kishore chanda
আইনজীবী কিশোর চন্দ।

মৃত আইনজীবীর স্ত্রী দোলা চন্দ কোতোয়ালি থানায় খুনের অভিযোগ দায়ের করেন। আরও কিছু তথ্যপ্রমাণ জোগাড়ের পর জ্যোতিষ প্রামাণিকই যে খুনি তাতে নিশ্চিত হয়ে যায় পুলিশ। কিন্তু খুনের কারণ নিয়ে তৈরি হয় ধন্ধ। এক জন সামান্য মক্কেল তার আইনজীবীকে খুন করতে যাবে কেন?

এর উত্তর দিতে পারতেন একমাত্র জ্যোতিষ নিজে। কিন্তু তিনি তখন পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। হন্যে হয়ে তাঁর খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিল জলপাইগুড়ি জেলা পুলিশ। এমনকি ভিন রাজ্যেও তাঁর খোঁজ চলছিল। এ দিকে এক প্রতিষ্ঠিত আইনজীবীর দিনেদুপুরে খুন এবং তার খুনি ধরা না পড়ায় সমালোচনার মুখে পড়ছিল পুলিশ। বাড়ছিল চাপও। অবশেষে সাফল্য মেলে। ঘটনার দশ দিন পর উত্তরপ্রদেশের বাগপত থেকে ধরা পড়েন আততায়ী। সেখানে একটি হোটেলে ‘কুক’-এর কাজ নিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন তিনি।

তাঁকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হয় জলপাইগুড়ি। আদালতে আবেদনের মাধ্যমে তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ। চলে লাগাতার জেরা। পুলিশের দাবি, জেরায় জ্যোতিষ খুনের কথা কবুল করেন। জ্যোতিষ প্রামাণিক দাবি করেন, শিলিগুড়িতে তাঁদের পারিবারিক একটি জমি আইনজীবী কিশোর চন্দের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছিল তিরিশ লক্ষ টাকায়। কিন্তু সামান্য কিছু টাকা পেলেও বাকি কয়েক লক্ষ ফেরত দিচ্ছিলেন না ওই আইনজীবী, অভিযোগ ছিল জ্যোতিষের। সেই রাগেই পরিকল্পনামাফিক ঠান্ডা মাথায় ওই দিন জ্যোতিষ আইনজীবীকে খুন করেন, আদালতে এমনটাই জানিয়েছিল পুলিশ।

আদালতে অভিযুক্ত জ্যোতিষের ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় ‘কাস্টোডি ট্রায়াল’ শুরু হয়। মৃত আইনজীবীর মুহুরি এবং তাঁর গাড়িচালক সহ বারো জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। প্রায় দু’ বছর ধরে মামলা চলার পর সমস্ত শুনানি শেষে মঙ্গলবার জলপাইগুড়ি জেলা ও দায়রা আদালতের বিচারক সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় জ্যোতিষ প্রামাণিককে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন। বুধবার তাঁর সাজা ঘোষণা হয়। জেলা আদালতের সরকারি আইনজীবী সুভাষ বোস জানিয়েছেন, যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন বিচারক। পাশাপাশি এক হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন মাসের কারদণ্ড।

সাজা ঘোষণার পর বিচারক নেমে যাওয়ার সময় দোষী সাব্যস্ত জ্যোতিষকে বিচারকের উদ্দেশে হাতজোড় করে প্রণাম করতে দেখা যায়। এ ছাড়া পুরো সময়টুকুই তিনি ছিলেন ভাবলেশহীন। আদালত থেকে বেরিয়ে কোর্ট-লক আপে যাওয়ার সময় তিনি জানান, আদালতের রায় তিনি মেনে নিচ্ছেন, তাঁর আর কিছু বলার নেই।

আদালতের রায়ের পর কান্নায় ভেঙে পড়েন মৃত আইনজীবীর দিদি বনানী রুদ্র। তিনি জানিয়েছেন, এই শাস্তির দরকার ছিল, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আর না ঘটে।

এই ঘটনা নিয়ে তুমুল আলোড়ন তৈরি হয়েছিল আইনজীবী মহলে। আজকের রায়কে যথার্থ জানিয়ে জলপাইগুড়ি বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দীপক দত্ত বলেছেন, তাঁদের প্রাণবন্ত সহকর্মী বিচার পেলেন।

 

তিতাস পাল।
[21:12, 11/8/2017] Titas Pal Slg: দোষী সাব্যস্ত জ্যোতিষ প্রামাণিক

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here