শৈবাল বিশ্বাস:

কয়েক দিনের মধ্যেই রামজন্মভূমি বিতর্কের রায় দিতে চলেছে সুপ্রিম কোর্ট। ইতিমধ্যে রায় দান যাতে দ্রুত সেরে ফেলা যায় সে ব্যাপারে প্রধান বিচারপতি জে এস খেহরের ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটি উল্লেখ করেছিলেন বিজেপি নেতা সুব্রহ্মণ্য‌ম স্বামী। প্রধান বিচারপতি সরাসরি মামলার রায়দানের বদলে আপসে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়ার পক্ষে মন্তব্য‌ করেন। বলা বাহুল্য‌, মামলাকারী  তিন পক্ষের কেউই বিষয়টি এ ভাবে মিটমাটের পক্ষপাতী নয়। তারা চায় জমির মালিকানা। কিন্তু বিজেপি বা আরএসএস মনে করে আপসে মিটিয়ে ফেললে অনেকটা দায়মুক্ত হওয়া যাবে। এই নিয়ে রাম জন্মভূমি ন্যাস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে বিজেপির একটু মন- কষাকষি চলছে। মুখ্য‌মন্ত্রী যোগী আদিত্য‌নাথকে ভার দেওয়া হয়েছে বিষয়টির মীমাংসা করার কিন্তু তিনি আদৌ সফল হবেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

রায় যা-ই হোক না কেন, এক নিশ্বাসে ঝালিয়ে নেওয়া যাক রাম জন্মভূমির ইতিবৃত্ত—

১৫২৮-এ মুঘলসম্রাট বাবর নাকি একটি স্থানীয় হিন্দুমন্দির ধ্বংস করে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করেন। যদিও পুরাতাত্ত্বিকরা বারবার অনুসন্ধান চালিয়েও মন্দিরের স্বপক্ষে কোনো পাথুরে প্রমাণ জোগাড় করতে পারেননি। বহু কাল পরে ১৯৪৯ সালে হঠাৎ করে এক দিন বাবরি মসজিদ চত্বরের মধ্যে কে বা কারা একটি রামলালার মূর্তি রেখে যান। খুব সম্ভবত, হিন্দুত্ববাদী  কোনো সংগঠন নিছক সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য‌ নিয়েই এই কীর্তিটি করেছিল। ১৯৫০ সাল থেকে আদালতের রায় নিয়েই রামলালার পুজো শুরু হয়। ১৯৮৬ সালে ফৈজাবাদের আদালত রায় দিল রামলালার পুজোয় হিন্দু পুণ্যার্থীরা যোগ দিতে পারবেন। এই রায়েরই অনুষঙ্গ টেনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মসজিদ চত্বরের কাছেই রামমন্দিরের শিলান্যাসের অনুমোদন দেন। এর ফলে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি চাগিয়ে ওঠে। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের কথা তো সকলেরই জানা। সে দিন লালকৃষ্ণ আডবাণী, মুরলীমনোহর জোশী, উমা ভারতীদের চোখের সামনে ধুলোয় মিশে গেল বাবরি মসজিদের চূড়া।

এর আগেই জমির মালিকানা নিয়ে রামলালা অর্থাৎ রাম জন্মভূমি ন্যাস, নির্মোহী আখড়া এবং সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড মামলা ঠুকে দিয়েছিল। সেই মামলার রায়ের বিরুদ্ধে ইলাহাবাদ হাইকোর্টের লখনউ বেঞ্চে আপিল মামলা হয়। হাইকোর্ট বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমিকে মোট তিন ভাগে ভাগ করে তিন পক্ষের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। বলা বাহুল্য‌, ২০১০ সালের এই রায় কোনো পক্ষই মানতে রাজি হয়নি। তিন পক্ষই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। ইতিমধ্যে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের কোনো কোনো নেতা আখড়াগুলির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বর সঙ্গে কথা বলে আপসের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ২০১৬ সালে সেই প্রচেষ্টার সমাপ্তি ঘটে।

এ বারের উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনের মুখে রামমন্দির প্রসঙ্গ উচ্চারণ না করলেও হিন্দুত্ববাদকে প্রচারের এজেন্ডা করেছিল বিজেপি। মন্দিরপন্থীদের মধ্যে ধারণা হয়, বিজেপি ক্ষমতায় এসেই মন্দির-মসজিদ ইস্যুকে প্রধান গুরুত্ব দেবে। কিন্তু এই মুহূর্তে নতুন করে দেশজোড়া দাঙ্গাহাঙ্গামার পরিস্থিতি সৃষ্টি করার দিকে ঝুঁকবে না বিজেপি। তাই যোগী আদিত্য‌নাথ চূড়ান্ত রায়ের আগেই সমাধানসূত্র বের করে আলোচনার টেবিলে বসতে চাইছেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here