উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৭/ সামসিং, সান্তালেখোলা হয়ে রকি আইল্যান্ড

0
588

মূর্তি নদী, রকি আইল্যান্ড

wrivuশ্রয়ণ সেন

‘রকি আইল্যান্ড’ — মানে পাথুরে দ্বীপ। নামটা শুনে প্রথমে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।

দ্বীপ তো প্রধানত সমুদ্রেই হয়। নদী-দ্বীপ বলতে জানি অসমের মাজুলি। ব্রহ্মপুত্রের বুকে বিশাল দ্বীপ এই মাজুলি। কিন্তু উত্তরবঙ্গের ছোটো নদীতে দ্বীপ কী ভাবে হবে?

এই কৌতূহলকে সঙ্গী করেই বেরিয়ে পড়েছি, এক দিনের ট্যুরে। গন্তব্য সামসিং হয়ে সান্তালেখোলা, এবং রকি আইল্যান্ড। চালসা থেকে এগিয়ে চলেছি সামসিং-এর দিকে। মালবাজারের দিক থেকে এলে চালসা মোড় থেকে বাঁ দিকে মেটেলির পথ। সে দিকে ঘুরতে হয়। মেটেলি পেরোতেই বদলে গেল প্রাকৃতিক চরিত্র। রাস্তার দু’ধারে চা-বাগান। দু’টি পাতা-একটি কুঁড়ি তুলতে ব্যস্ত শ্রমিকরা। সামসিং পৌঁছোতেই হঠাৎ করে কাছে চলে এল পাহাড়। মূলত চা-বাগানের জন্যই বিখ্যাত এই সামসিং। প্রকৃতিপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্য তো এখান থেকে চার কিমি দূরে, সান্তালেখোলা।

samsing
সামসিং ছাড়িয়ে।

এই সামসিং থেকেই শুরু হয় নেওড়া ভ্যালি জাতীয় উদ্যান, যার বিস্তৃতি সমুদ্রতল থেকে প্রায় দশ হাজার ফুট পর্যন্ত। জাতীয় উদ্যানের মধ্যে ট্রেক রুটও শুরু হয়েছে এখান থেকে।

সামসিং ছাড়াতেই পাহাড়ি রাস্তা শুরু। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে উঠে চলেছে গাড়ি। কানে আসছে নানা প্রজাতির পাখির কিচিরমিচির শব্দ। সান্তালেখোলা পৌঁছোনোর দেড় কিলোমিটার আগেই নিজেদের গাড়ি ছাড়তে হল। নিতে হল স্থানীয় গাড়ি। সারথি এক নেপালি যুবক।

পাহাড়ি পথ বেয়ে সান্তালেখোলার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে কিছু কথা হল ওই যুবকের সঙ্গে। মূলত স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্যই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানায় সে। তবে সান্তালেখোলার বনোন্নয়ন নিগমের কটেজগুলিতে বুকিং থাকলে নিজেদের গাড়িতেই যাওয়া যায়। 

পৌঁছোলাম সান্তালেখোলা। ‘সান্তালে’ শব্দর অর্থ কমলা, ‘খোলা’ মানে ঝোরা। সমুদ্রতল থেকে হাজার তিনেক ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই সান্তালেখোলার নাম এসেছে এই খোলা বা ছোটো নদীটার জন্যই। নদীটার ওপর ঝুলন্ত সেতু। পেরিয়ে গেলাম। 

suntaney
সান্তালেখোলার ঝুলন্ত সেতু।

হাঁটা পথ চলে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ বনোন্নয়ন নিগমের কটেজগুলির দিকে। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নদীটা। পাহাড়ের ওপর থেকে এসে নেমে যাচ্ছে সমতলের দিকে। সান্তালখোলার মূল আকর্ষণ অপার নির্জনতা এবং সেই নির্জনতা চিরে ভেসে আসা পাখিদের কলতান। পক্ষিপ্রেমিকদের আদর্শ এই সান্তালেখোলা।

হাতে সময় অল্প বলে সান্তালেখোলা থেকে দ্রুত বিদায় নিতে হল, কিন্তু একটা রাত কাটানোর অপূর্ণ স্বাদ থেকে গেল। সারথি ওই যুবকটির কথায় এখানে একটা রাত না কাটালে নাকি মন ভরে না। এটাও ঠিক যে বনোন্নয়ন নিগমের কটেজগুলিতে থাকলেই সান্তালেখোলার আসল রূপের পরিচয় পাওয়া যায়।   

এ বার গন্তব্য রকি আইল্যান্ড। সান্তালেখোলা থেকে সামসিং-এর দিকে কিছুটা এসে বাঁ দিকে উঠে গিয়েছে রকি আইল্যান্ডের রাস্তা।

‘আইল্যান্ড’ সংক্রান্ত কৌতূহলটি মিটল এখানে পৌঁছেই। মেন রোডের ওপর গাড়ি রেখে নেমে গেলাম নদীর দিকে। পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসছে মূর্তি নদী। নদীর বুকে বসে রয়েছে অসংখ্য পাথর।

rocky-murtiছোটোখাটো পাথর নয়, বেজায় বড়ো বড়ো সব বোল্ডার। বোল্ডারগুলোর পাশ কাটিয়ে নেমে যাচ্ছে মূর্তি। অবলীলায় সেই পাথরের ওপর উঠে পড়ছেন পর্যটকরা। বলা বাহুল্য, আমরাও সেই পথই অনুসরণ করলাম। এমনিতে খুব বিপজ্জনক নয়। বর্ষা নয় বলে নদীতে জলও সে ভাবে নেই, কিন্তু সতর্কতা অবলম্বন করা সব সময় প্রয়োজন।

কিছুটা সময় কাটিয়ে পরবর্তী গন্তব্যের দিকে পা বাড়ালাম। মূর্তিকে ছেড়ে এ বার যে জলঢাকাকে সঙ্গী করতে হবে।

আরও পড়ুন: উত্তরবঙ্গের ডায়েরি ৬/ মূর্তির ধারে

কী ভাবে যাবেন

শিয়ালদহ থেকে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে পৌঁছোন নিউ মাল জংশন। এখান থেকে সামসিং হয়ে সান্তালেখোলা ৩০ কিমি। এনজেপি থেকে সান্তালেখোলার দূরত্ব ৮০ কিমি। সান্তালেখোলা থেকে রকি আইল্যান্ডের দূরত্ব ৫ কিমি।

কোথায় থাকবেন

সান্তালেখোলাতে থাকার সব থেকে ভালো জায়গা হল পশ্চিমবঙ্গ বনোন্নয়ন নিগমের ‘নেচার রিসোর্ট’। অনলাইনে বুক করার জন্য লগ-ইন করুন www.wbfdc.com । থাকতে পারেন সামসিং-এর অদূরে পশ্চিমবঙ্গ বনোন্নয়ন সংস্থার মৌচুকি ক্যাম্পে। অনলাইনে বুক করতে পারেন। এ ছাড়া সামসিং, সান্তালেখোলা এবং রকি আইল্যান্ডে কিছু বেসরকারি হোম-স্টে রয়েছে।

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here