anubhab home

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি : নদীর চার পাশ দিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ। তারা ভাবতেও পারেনি,  সামনেই অন্ধকারে জলের মধ্যে মাথা ডুবিয়ে লুকিয়ে রয়েছে চার কিশোরী। আধ ঘণ্টা তল্লাশি চালিয়ে পুলিশকর্মীরা চলে যাওয়ার পর জল থেকে উঠে আসে তারা। তার পর হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যায় শহরের নতুনপাড়া এলাকায়।

সেখানে নর্দমার পাইপের মধ্যে বসে রাত কাটানো। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। দিনের আলো ফুটতেই পুলিশের চোখে পড়ে গেল ‘অনুভব’ হোম থেকে পলাতক চার কিশোরী, যারা পালিয়ে যাওয়ায় কার্যত ঘুম ছুটে গিয়েছিল হোম কর্তৃপক্ষ আর পুলিশ-প্রশাসনের। তাদের এক রাতের কীর্তি যেন সিনেমার অ্যাডভেঞ্চারকেও হার মানায়।

the broken tin fencing
পিছনের এই টিনের বেড়া ভেঙে পালিয়েছিল কিশোরীরা।

জলপাইগুড়ির ক্লাব রোডে রয়েছে মেয়েদের হোম ‘অনুভব’। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পরিচালিত সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত হোমটির এমনিতে সুনাম রয়েছে। বিভিন্ন বয়সের মেয়েরা এখানে থেকে স্কুলে পড়াশোনা বা হাতের কাজ শিখে স্বনির্ভর হয়েছে। তারা কর্মসূত্রে রোজই বাইরে যাতায়াত করে। কিন্তু এত দিন পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা এখান থেকে ঘটেনি বলে দাবি হোম সুপার ডালিয়া ভট্টাচার্যের।

রবিবার সন্ধ্যায় প্রার্থনার সময় দেখা যায় ৫৩ জন আবাসিকের মধ্যে ৫ জন কিশোরী অনুপস্থিত। হোমের কর্মীরা খোঁজ করতে গিয়ে দেখেন পেছনের টিনের বেড়া ভাঙা। তাঁরা অনুমান করেন, টিনের বেড়া ভেঙে প্রাচীর টপকে পালিয়েছে কিশোরীরা। সঙ্গে সঙ্গে খবর দেওয়া হয় কোতোয়ালি থানায়। তল্লাশিতে নেমে পড়ে পুলিশ।

হোমের কর্মীরাও বিভিন্ন জায়গায় খোঁজখবর করতে শুরু করেন। রবিবার রাতেই এক টোটোচালকের সাহায্যে জেওয়াইএমএ ময়দান থেকে কোতোয়ালি থানার পুলিশ এক কিশোরীকে উদ্ধার করে। কিন্তু বাকি চার কিশোরী নিখোঁজ থাকায় ঘুম উড়ে গিয়েছিল হোম কর্তৃপক্ষের। কারণ কিশোরীদের নিরাপত্তার বিষয়টি এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। এদের তল্লাশির জন্য পুলিশের বেশ কিছু দল বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয়। কিন্তু রাতভর তাদের খোঁজ মেলেনি। হোম থেকে একটু দূরেই করলা নদীর ধারেও তল্লাশি চলে। পুলিশ দেখেই নদীতে নেমে যায় কিশোরীরা। পুলিশকর্মীরা বুঝতেও পারেননি অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে তাঁদের থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে জলের মধ্যে মাথা ডুবিয়ে বসে রয়েছে কিশোরীরা।

সোমবার সকালে জলপাইগুড়ি শহরের নতুনপাড়া থেকে তাদের উদ্ধার করে পুলিশ। তারা একটি নর্দমার পাইপের মধ্যে লুকিয়েছিল। উদ্ধার করার পর তাদের কোতোয়ালি থানায় নিয়ে আসা হয়। খবর পেয়ে আসে হোম কর্তৃপক্ষ। থানাতেই তাদের দীর্ঘ সময় কাউন্সেলিং চলে, যদিও পালানোর কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।

police supar amitava maity
ঘটনার বিবরণ দিচ্ছেন পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতি।

হোম সূত্রে জানা গিয়েছে, পলাতক কিশোরীদের মধ্যে দু’জন বাড়ি থেকে পালানো আর তিন জন বাল্যবিবাহের শিকার। এদের মধ্যে দুই কিশোরী তাদের প্রেমিকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে পালিয়ে যাওয়ার ছক কষেছিল। তারাই অন্য মেয়েদের ফুসলে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল। ওই কিশোরীদের এক জনের হাতে একটি সোনার আংটি ছিল। প্ল্যান ছিল সেটি বিক্রি করে টাকা জোগাড় হবে। তার পর বাসে চেপে শহর ছেড়ে পালানো। সেই উদ্দেশ্যেই করলা নদীর পাড় থেকে তারা শহরের নতুনপাড়ায় আসে কারণ সংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন রুটের বাসস্ট্যান্ড রয়েছে। কিন্তু পুলিশের চোখে পড়ে যাওয়ায় তাদের ছক ভেস্তে যায়। কিশোরীদের কাছ থেকে সব জানার অনেকটাই হতচকিত হোম কর্তৃপক্ষ।

হোমের সুপার ডালিয়া ভট্টাচার্য আশঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন,  রাতের অন্ধকারে এতগুলো মেয়ে যে কোনো ধরনের বিপদের সন্মুখীন হতে পারত। রাতভর নজরদারি চালিয়ে তৎপরতার সঙ্গে কিশোরীদের উদ্ধার করার জন্য পুলিশের প্রশংসা করেছেন হোমের কোঅর্ডিনেটর দীপশ্রী রায়।

জেলার পুলিশ সুপার অমিতাভ মাইতি জানিয়েছেন, খবর পাওয়ার পরই পুলিশের অনেকগুলি টিম শহর এবং শহরের বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।আপাতত নিয়ম অনু্যায়ী উদ্ধার পাঁচ কিশোরীকে শিশু সুরক্ষা সমিতির হাতে তুলে দেওয়া হবে। তাদের মাধ্যমে ফের হোমে পাঠানো হবে তাদের।

হোমের তরফে দীপশ্রী রায় এবং ডালিয়া ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, হোমে আসার পর ওই কিশোরীদের বিশেষ কাউন্সেলিং-এর ব্যবস্থা করা হবে যাতে তারা ফের এই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ না নেয়। এতগুলো মেয়ে এক সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ায় জনমানসে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে তারা সুস্থ ভাবে ফিরে আসায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে শহরবাসী।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here