doljayta in vrindavan
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

খাঁ খাঁ দুপুরে কৃষ্ণচূড়ার ডাল থেকে কোকিলটা ডাকছে একটানা। একলা পথে চালক প্যাডেল ঘুরিয়ে যাছে আপনমনে। দোলের ছুটিতে বাড়িমুখো অনেকেই। কেউ বলে ফাল্গুন/কেউ বলে পলাশের মাস/আমি বলি আমার সর্বনাশ। কেউ বলে দখিনা/কেউ বলে মাতাল বাতাস/আমি বলি আমার দীর্ঘশ্বাস। গানটা চলছে রিকশয় বাঁধা রেডিওয়।

বাড়ির পথে ফিরছিলেন নতুনদাও। পথে গান শুনলেন ‘এসো হে বন্ধু থেকো না দূরে গাও ফাগুয়ার গান’। ফাগ-ফাগুনের মাতোয়ারায় আজ আকাশবাতাস। সুর-ছন্দ-তাল-লয় নিয়ে উৎসব কড়া নাড়ছে দরজায় দরজায়। ফাগুনের যে কী আগুন তা নিয়ে নানা চলচ্চিত্রে কত অম্লমধুর দৃশ্য তৈরি করেছেন পরিচালকেরা। শুধু পরিচালকেরা নন, তারও আগে সৃষ্টি হয়েছে কালজয়ী বহু গান। গীতিকার আর সুরকাররা কোমর বেঁধে নেমে পড়তেন দোলের গান রচনাতে। এখানেই থেমে থাকা নয়। গান রচনা করতে করতেই প্রেমে পড়ে যেতেন এমন অনেকেই। সে কথা আজ থাক।

মধুমাসের প্রতিটি ক্ষণ যেন রোম্যান্টিকতায় ভরা। কী রাত, কী সন্ধে, আবার ভোর যদি ধরা যায় তারও পাশে উঁকি দেয় একাকী দুপুর। এক সন্ধে উপহার দিল সে দিন ‘নিশীথে চলে হিমেল বায়, চামেলি বাস বিফল রাতি, স্বপনে কী যে কহিতে চায়’, কবীর সুমনের এ গান প্রায় সকলের শোনা। কিন্তু আর একটু পিছিয়ে গেলে এই গানটি নির্মলা মিশ্র গেয়েছেন ১৯৭২-এ, ও সাবিত্রী বসুর গাওয়া ইমনশঙ্করা রাগে এই গানটি ১৯৩৬-এ, কথা মমতা মিত্র ও সুর হিমাংশু দত্ত। দোল আমাদের মনের আঙিনায় রঙিন এক অতিথি। ক্ষণিকের তরে নাড়া দিয়ে যায়। রেশ রেখে যায় সম্পর্কের বুননে।

dol festival
আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে।

প্রেমের পরশ নাচের তালে। ছন্দ মিলিয়ে নিচ্ছে গলির মোড়ে তিনতলার কিশোরী। ‘আজ সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে’। ঠিক যেমনটি করে নায়কের ছবি ধরে মহানায়িকা নেচে নেচে গেয়েছিলেন। আন্দাজ করে নিতে হয়। কাননদেবীর গান ভেসে আসছে উঁচু ঘর থেকে। কিংবা আব্দুল করিম শাহের লেখা ‘বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে, সইগো বসন্ত বাতাসে’ সুর করে গেয়ে চলেছে এক উঠতি শিল্পী। ভরা পূর্ণিমায় চাঁদের তিলক আঁকা নওলকিশোরের কপাল। তা দেখে শচীনকর্তা গাইছেন ‘নিধুবনে সখা লয়ে, খেলে হরি শিশু হয়ে, অধরে মধুর হাসি জাগে, বনফুল মালা দোলে’। আহা এমন ভাবে যদি গাওয়া যেত ‘আজ হোলি খেলব শ্যাম তোমার সনে, একলা পেয়েছি তোমায় নিধুবনে’। সত্যি তো শ্যামের যখন ইচ্ছে হবে তখন রঙ খেলবে? কিন্তু এমন তো হতেই পারে আজ শ্যামকে ধরলে ছেড়ে দেওয়া যাবে না!

মাধবী দ্বিধা করেনি, পলাশ-শিমুল ডাক দিয়েছিল লালমাটির গ্রামের পথে। সেখানে ফাগুনের মোহনায়, মন মাতানো মহুয়ায় আবিষ্ট কৃষ্ণচূড়া-রাধাচূড়া। লালগুলালে রঙিন হয়েছে কাঁসাই, শিলাই, দামোদর, অজয়ের জল। তারই কূলে এক হয়েছে দোলের প্রেমিকপ্রেমিকারা। সেই ভিড়ে দেখা মিলতে পারে তোমার সঙ্গে আমার, যেমনটি কথা ছিল। আবির নেব না, রঙ খেলব না বললে কিন্তু চলবে না। এক রাশ বিপদ নিয়ে শুকনো পাতার বুকে নির্লজ্জের মতো শুয়ে থাকতে দেখে হিংসার আগুনে পুড়ে ছিল যে মেয়ে সে চিৎকার করে বলছে শোনো ‘তার ছেঁড়া যন্ত্রের মাঝখানে শুয়ে আছি, আমলকি বনে বসন্ত এসে গেছে। তাই ‘বনে নয়, মনে মোর পাখি আজ গান গায়’। আর আড়াল থেকে রঙ যদি দিয়েই দাও তা হলে ‘ও আমার চাঁদের আলো, আজ ফাগুনের সন্ধ্যাকালে’ আমার পাগলামিকে প্রশ্রয় দিও।

মনের গোপনে বেজে চলেছে মহুলের নেশায় আজ সারা রাত মাতামাতির সুর। দিনে রঙের ভেলকিতে ফাগুনের জয়। রাঙা ফাগে আবিরের অনুরাগে মালা গাঁথা শেষ। ধুলোভরা পা নিয়ে রিকশাচালক বুঁদ হয়েছে মহুয়ায়। দখিনা বাতাসে পলাশমেলার হাতছানি। আদুল গায়ে তনুমন এসে দাঁড়ায় অযোধ্যার পাহাড়ে। রুপোলি বন্যার বাঁধ ভাঙল বলে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here