indira gandhi
তপন মল্লিক চৌধুরী

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর গৃহস্থালির দায়িত্ব প্রথম থেকেই সামলেছেন ইন্দিরা গান্ধী। স্বামীর মৃত্যুর অনেক আগে দুই সন্তানের জননীর ঠিকানা ছিল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন। যদিও জওহরলাল নেহরুর পর দেশের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রীর আসন দেখেছিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। বলতে গেলে তিনিই ইন্দিরাকে হাতে ধরে টেনে এনেছিলেন মন্ত্রিসভায়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তাঁকে ঠাঁই করে দেওয়া হয়েছিল রাজ্যসভায়। জন্মেছিলেন রুশ বিপ্লবের বছরে, ঐতিহাসিক ঠিকানা আনন্দভবনে। মোতিলাল নেহরুর বেতের চেয়ার ঘিরে যখন থেকে জাতীয় নেতাদের আসর, তখন তাঁর কোলে নাতনি ইন্দিরা বসতেন। ইন্দিরা প্রায়শই কংগ্রেস নেতাদের স্মরণ করিয়ে দিতেই বলতেন দলে তাঁর আবির্ভাব তিন বছর বয়সে। সক্রিয় ভাবে ইন্দিরার কংগ্রেসে যোগদান ১৯৩৮ সালে, ১৯৫৫-তে ওয়ার্কিং কমিটিতে আসেন আর ৫৯ সালে হলেন সভানেত্রী।

নেহরুর পর কে? প্রশ্নটি এক সময়ে খুব শোনা যেত। প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী চিতাভস্ম দেশের মাটিতে আর গঙ্গার স্রোতে মিলিয়ে যেতে না যেতেই শূন্য আসন ঘিরে দর কষাকষি শুরু হয়। কামরাজ, নিজলিঙ্গাপ্পা, অতুল্য ঘোষ, সঞ্জীব রেড্ডি, এসকে পাটিল প্রমুখ তখন কংগ্রেসের নিয়ামক শক্তি। কিন্তু তাঁদের সমর্থনের মোরারজি দেশাইকে পাশে সরিয়েই লালবাহাদুর শাস্ত্রী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। লালবাহাদুরের মন্ত্রিসভায় ইন্দিরা ছিলেন তথ্যমন্ত্রী। লালবাহাদুরের আকস্মিক মৃত্যুর পর ইন্দিরাই কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হলেন। প্রবীণ নেতা মোরারজি আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁর আপত্তি অগ্রাহ্য হওয়ার পর ’৬৭ সালে সরাসরি মোরারজিকে পরাস্ত করেই ইন্দিরা প্রধানমন্ত্রীর আসন দখল করেন। যদিও পরে মোরারজিকে অর্থমন্ত্রী করতে হয়। কিন্তু ১৯৬৯-এর এপ্রিলে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের ফরিদাবাদ অধিবেশনের সময়েই ইন্দিরা প্রায় প্রকাশ্যে পুরোনো কংগ্রেস নেতাদের বিরুদ্ধ উপদল সংগঠিত করেন। জুলাই মাসে রাষ্ট্রপতি পদে ঘোষিত প্রার্থী সঞ্জীব রেড্ডি প্রধানমন্ত্রী মনোনীত ভি ভি গিরির কাছে পরাজিত হওয়ার পরই ১৬ জুলাই ইন্দিরা নিজের হাতে অর্থ দফতর নিয়ে মোরারজিকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। পরপর ঘটনাবলি থেকে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতারা বুঝে যান ইন্দিরাকে হাতের মুঠোয় রাখা অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভেঙে অতঃপর ইন্দিরা কংগ্রেস।

নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে ইন্দিরার এর পর ১৪টি ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ, প্রাক্তন দেশীয় রাজন্যবর্গের পদমর্যাদা লোপ ও ভাতা বন্ধ, জীবনবিমা ব্যবসা জাতীয়করণ ইত্যাদি কার্যকর করেন ১৯৭২-এর ১ জানুয়ারি থেকে ’৭৩-এর মে মাসের মধ্যে। এর মধ্যে ৭২-এ মেঘালয় ও অরুণাচল প্রদেশ, ত্রিপুরা পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে। মহারাষ্ট্র থেকে তিনটি ছোটো দ্বীপ বিচ্ছিন্ন করে গঠন করা হয় কেন্দ্রশাসিত লাক্ষাদ্বীপ। সিকিম বাইশতম রাজ্য হিসাবে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। এগুলির পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা চণ্ডীগড়-সমস্যার সমাধানও ঘোষণা করেন ইন্দিরা, যাতে খুশি হতে পারেননি অকালি নেতারা। প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়ে হরিয়ানা। পরবর্তীতে বলা যায় তিনি বছরের পর বছর ধরে দাবি পালটা-দাবি জিইয়ে রাখেন পাঞ্জাবিভাষী ও হিন্দিভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের প্ররোচনা দিয়ে।

ইন্দিরার মধ্যে জাগে কংগ্রেসি মাতব্বরদের বশীভূত করার আত্মতৃপ্তি। এর থেকেই জন্ম নেয় স্বৈরাচারী মনোভাব ও একনায়কসুলভ আধিপত্যের প্রবণতা।

ইন্দিরা জমানাতেই উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক মানচিত্রে বহু ঘটনা সন্নিবেশিত হয়। ’৭১ সালে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সঙ্গে শিমলা চুক্তি। একই সময়ে (১৯৭১) সাধারণ নির্বাচনে বিপুল জয়লাভ, কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতাদের গুরুত্ব লোপ প্রভৃতি ঘটনায় ইন্দিরা তখন আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদার তুঙ্গে। একই সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আশাতীত সাফল্যে ইন্দিরা হয়ে ওঠেন প্রতিহিংসাপরায়ণ। প্রায় কোন্দল পাকিয়েই ভেঙে দেন উত্তরপ্রদেশের সংযুক্ত বিধায়ক দল। মন্ত্রিসভার পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠা করেন কমলাপতি ত্রিপাঠীকে। ভাঙা হয় কর্নাটক ও গুজরাতের কংগ্রেস (সংগঠন) সরকার, পঞ্জাবের জনসঙ্ঘ-অকালি কোয়ালিশন সরকার। অব্যাহতি পায় না পশ্চিমবঙ্গের যুক্তফ্রন্ট সরকারও। এর পর বাংলাদেশ ও আপৎকালীন জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে চালু করেন মিসা – রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য যে কোনো ভারতীয় বা বিদেশি নাগরিককে আটক করার ফরমান। প্রকৃতপক্ষে আটটি রাজ্যে অকংগ্রেসি সরকার ভোটের মাধ্যমে রাজ্য পালনের দায়িত্ব পেলেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সেগুলো ভাঙার সার্থক চক্রান্তে, ইন্দিরার হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে থাকার ফলে এবং সংবিধানের খেয়ালখুশিমতো ব্যাখ্যা ও রাজ্যপালদের ক্ষমতার অপব্যবহারে ধীরে ধীরে বিনষ্ট হতে থাকে যুক্তরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সংবিধান। এটা যে রাজ্য সরকারগুলিকে উৎখাত করারই খেলা তা বলা বাহুল্যমাত্র। এই খেলায় মেতে ওঠেন কংগ্রেসি নেতৃবৃন্দ। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর কৃপাদৃষ্টি ও দাক্ষিণ্য পেতে তোষামোদের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। অন্য দিকে ইন্দিরার মধ্যে জাগে কংগ্রেসি মাতব্বরদের বশীভূত করার আত্মতৃপ্তি। এর থেকেই জন্ম নেয় স্বৈরাচারী মনোভাব ও একনায়কসুলভ আধিপত্যের প্রবণতা।

নিজের মর্যাদা আর ক্ষমতা সুদৃঢ় করার পাশাপাশি জনমন জয় করতে ইন্দিরা গরিবি হটাও স্লোগান চালু করেছিলেন। অসাম্য-অরাজকতায় তৈরি হওয়া ক্ষোভ দমন করতে, প্রতিবাদী মনস্কতায় বিঘ্ন ঘটাতে স্লোগান তুলেছিলেন ‘কথা কম কাজ বেশি’। কিন্তু দারিদ্র দূরীকরণ কিংবা কথার বদলে কাজের জন্য যে অর্থনৈতিক-সামাজিক অবস্থা-ব্যবস্থা অপরিহার্য, তার তো কিছুই ঘটেনি। ফলে তা নিছক চটকদার অন্তঃসারশূন্যতায় পর্যবসিত হয়। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে ধনিক শ্রেণির আধিপত্য কায়েম হয়। গরিবিয়ানার সংকট গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ওঠে। শ্রমিক-কর্মচারী থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবী-পেশাদার, সর্ব স্তরে ক্ষোভ তৈরি হয়। বাংলাদেশের অভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য ইন্দিরাকে এশিয়ার মুক্তিসূর্য হিসাবে গৌরবান্বিত করেছিল, কিন্তু ’৭৫-এ অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা জারির পর তাঁর জনপ্রিয়তা তলানিতে নেমে আসে। কারাগারে হাজার হাজার মানুষ। স্বাধীনতাহীন সংবাদমাধ্যম। জনসাধারণের মৌলিক অধিকার লুঠ – এমন অন্ধকারে আইনসম্মত ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে ছোটো ছেলে সঞ্জয়ের অভ্যুত্থান – বুঝতে অসুবিধা হয় না সব কিছুর আয়োজনের লক্ষ্য আসলে অপরিসীম ক্ষমতার আসনটিকে নিরাপদ-নির্বিঘ্ন ও বিরোধিতাহীন করা এবং আবহমানকালের জন্য এ দেশে পারিবারিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জমি তৈরি করা। কিন্তু অকস্মাৎ আত্মবিশ্বাসে প্রখর ইন্দিরা ১৯ মাস পর ফের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করেন। ’৭৭-এর ভোটে তিনি আর তাঁর দল সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত হয়। নানা ভাবে দণ্ড পেতে হয় তাঁকে। অপমানের পর অপমান – কারও পক্ষে ভাবা সম্ভব হয়নি সে দিনের ওই অবস্থা থেকে ইন্দিরা ফের উঠে দাঁড়াবেন। কিন্তু ওই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছিলেন ইন্দিরা।  ১৯৮০-এর নির্বাচনে সগৌরবে ক্ষমতায় ফিরে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু ক্ষমতায় ফিরলেও মনে হয় নিজেকে আর ফিরে পাননি। পারিবারিক বিপর্যয় – দুর্ঘটনায় সঞ্জয়ের মৃত্যু, নিঃসঙ্গ ইন্দিরা কাছে টানেন নিরাসক্ত রাজীবকে। দলের কারও ওপর আস্থা না থাকলেও তিনি অপ্রতিরোধ্য এবং দুঃসাহসিকও বটে। স্বর্ণমন্দিরে সেনা পাঠান। যদিও তিনি বার বার বলেছিলেন কোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়কে শায়েস্তা করতে নয়, কিন্তু দেশের ঐক্য বা সংহতি কি তাতে রক্ষা পেয়েছিল? এ তো খুবই লজ্জার যে আততায়ীর গুলিতে তাঁকে প্রাণ দিতে হয়, তাঁরাই তো ছিলেন তাঁর বিশ্বস্ত প্রহরী – রক্ষক।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here