hydel power project in teesta

তপন মল্লিক চৌধুরী

একটি নদী-অববাহিকায় অসংখ্য ছোটো ছোটো জনপদ নানা ভাবেই ওই নদীর ওপর নির্ভরশীল। ওই নদী যত সমতলের দিকে বইতে থাকে জনপদগুলির জনসংখ্যাও তত বাড়তে থাকে। ঠিক সে রকমই একটি নদী তিস্তা।

সিকিম থেকে সেবকের সমতল পর্যন্ত যে প্রচুর জনবসতি রয়েছে, সেগুলি তিস্তার ওপর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে নির্ভরশীল। অর্থাৎ আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণে ওই সব মানুষের জীবনযাত্রা তিস্তার সঙ্গে ডড়িয়ে আছে ওতপ্রোত ভাবে। কিন্তু যখনই ওই নদী কিংবা নদী-অববাহিকা ঘিরে উন্নয়নের কথা ওঠে তখনই সরকার-প্রশাসন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ওই সব মানুষের অধিকারকে অস্বীকার করে। অধিকারগুলি বেআইনি হয়ে যায়। স্থানীয় ভাবে চাহিদাগুলিকে সরকার দাবিয়ে রাখে প্রশাসনিক সাহায্যে এবং প্রকল্পের কাজ চলতে থাকে। ঠিক এ রকমটাই ঘটেছে তিস্তানদীর ওপর সিকিমে চারটি ও পশ্চিমবঙ্গে দু’টি প্রকল্পের ক্ষেত্রে। নদীর বহনক্ষমতা সম্পর্কে কোনো গবেষণা বা সমীক্ষা না করেই তিস্তার বুকে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে, নির্ধারিত হয়েছে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা।

পশ্চিমবঙ্গে তিস্তা লোয়ার-৩ এবং লোয়ার-৪ বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ শুরু করার পর লক্ষ করা যাচ্ছে ভাটিতে নদীর জলের পরিমাণ কমতে শুরু করেছে। জলদূষণের মাত্রা বাড়ছে। অন্য দিকে তিস্তা নদীর ওপর সিকিমে চারটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী তিস্তা–৩ ও তিস্তা–৫ প্রকল্পের জন্য ২৬৫ ও ২০৪টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত তিস্তা–৪ প্রকল্প শুরু হলে উচ্ছেদ হতে হবে আরও ২৫৬টি পরিবারকে।

প্রসঙ্গত, তিস্তা–৩ ও তিস্তা–৫ প্রকল্পের ক্ষেত্রে ন্যাশনাল বোর্ড ফর ওয়াইল্ড লাইফ-এর অনুমোদন ছাড়াই কাজ শুরুর অভিযোগ রয়েছে। তিস্তা– ৪ প্রকল্প ২০১৪-য় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের ছাড় পেলেও ইকোসেনসিটিভ জোন তথা সংবেদনশীল অঞ্চলের পরিধি অত্যন্ত কম রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত তিস্তা–৪ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা জাতীয় উদ্যান ও ফাম্বং লো অভয়ারণ্য থেকে ৪ কিমির মধ্যে অবস্থিত। এখানকার জঙ্গলগুলি কেবলমাত্র  ১ নং বা ২নং তালিকাভুক্ত বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণীর জন্যই বিখ্যাত নয়, মিসমির রিপোর্ট অনুসারে এই অঞ্চলে ১০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৩৪টির বেশি প্রজাতির সরীসৃপ, ২৩০টির বেশি প্রজাতির পাখি, ১০ প্রজাতির উভচর এবং ৩২ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এদের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে এই প্রকল্পের। কাটা পড়বে ৭৫ হাজার গাছ।

মূল তিস্তার ওপর আরও পাঁচটি বড়ো প্রকল্পের ফলে নদী যেমন তার স্বাভাবিক গতি-চরিত্র হারাচ্ছে তেমনই মাত্রাতিরিক্ত ভাবে কমে যাচ্ছে জলের পরিমাণ। স্বভাবতই নদীর গতি শ্লথ হচ্ছে। পলি, বালি, নুড়ি নদীগর্ভে জমে নদীর নাব্যতা কমছে, বেড়ে যাচ্ছে বন্যার আশঙ্কা।

তিস্তার বুকে তিনটি প্রকল্পের জন্য সিকিমে এই নদী বইছে মোট ৬৩ কিমি টানেলের মধ্য দিয়ে। এর ফলে ব্যাহত হবে ৭০.৬ কিমি স্বাভাবিক গতিপথ, পরবর্তীতে সিকিমে তিস্তার স্বাভাবিক গতিপথ বলেই কিছু আর থাকবে না। সেটা না থাকলে নদীর দু’পারের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জলস্তর চলে যাবে অনেক নীচে। ব্যাপক প্রভাব পড়বে দু’ ধারের বাসিন্দা যারা মূলত এলাচ ও অন্যান্য শাক-সবজি চাষ করে জীবননির্বাহ করে। এলাচ চাষের ক্ষতি মানে এই এলাকার অর্থনীতি বিপর্যস্ত। তা ছাড়া মাছের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এখানে এমন বিরল প্রজাতির মাছ মেলে যা দুনিয়ার অন্যত্র পাওয়া যায় না।

২০০৮ সালে ডিকচুতে এনএইচপিসি-র ৫১০ মেগাওয়াট প্রকল্পের উৎপাদনের কাজ শুরু হওয়ায় ডিকচু থেকে পাওয়ার হাউস পর্যন্ত ২৩ কিমি লম্বা ট্যানেলের মধ্যবর্তী প্রধান দু’টি বসতি সিংবেল ও মাখা’র ১০০ ও ৭০টি বাড়িতে বিপজ্জনক ফাটল দেখা দিয়েছে। এখানকার অধিকাংশ খেত ও পানীয় জলের মোড়গুলি শুকিয়ে গিয়েছে। একই রকম পরিস্থিতি লেপচা সংরক্ষিত অঞ্চল জোঙ্গুতে। সেখানেও ভূগর্ভস্থ টানেলের জন্য ২০১২ সাল থেকে আর ধান চাষ হচ্ছে না।

তিস্তার উপনদী লাচুং চু, হেমু চু, রংপো চু, ডিক চু, রঙ্গিত, রংগিয়া প্রভৃতির ওপর ২৬টি ছোটো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। ফলে ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপনদীগুলি। মূল তিস্তার ওপর আরও পাঁচটি বড়ো প্রকল্পের ফলে নদী যেমন তার স্বাভাবিক গতি-চরিত্র হারাচ্ছে তেমনই মাত্রাতিরিক্ত ভাবে কমে যাচ্ছে জলের পরিমাণ। স্বভাবতই নদীর গতি শ্লথ হচ্ছে। পলি, বালি, নুড়ি নদীগর্ভে জমে নদীর নাব্যতা কমছে, বেড়ে যাচ্ছে বন্যার আশঙ্কা।

জলপাইগুড়ি শহরের পাশে তিস্তা বইছে শহর থেকে ৪ ফুট ওপর দিয়ে। সারা বর্ষাই শহরবাসী থাকেন বন্যার আশঙ্কায়। সেবকে করোনেশন ব্রিজের পরে তিস্তা সমতলে নেমে বিস্তৃতি লাভ করে ডান দিকে ঘুরে মহানন্দা অভয়ারণ্যের মধ্য দিয়ে জলপাইগুড়ি জেলায় ঢুকেছে। অভয়ারণ্যের ভেতর সমতলের প্রথম বসতি চমকডাঙির বহু চাষের জমি এখন নদীগর্ভে বিলীন। তিস্তার কবল থেকে এখনও বেঁচে থাকা ওই গ্রাম এখন নদী থেকে ২০০ মিটারেরও কম দূরে। এই গ্রামটিও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে। যদি তা-ই ঘটে, তা হলে লালটং বনবসতি ও মহানন্দা অভয়ারণ্যের একটি অংশও নদীতে মিশে যাবে। নিরাপদে থাকবে না ৩১ নং জাতীয় সড়কও।

coronation bridge at sevak over teesta
সেবকে তিস্তার ওপর করোনেশন ব্রিজ।

মহানন্দা অভয়ারণ্য, বৈকুন্ঠপুর বনাঞ্চল পেরিয়ে তিস্তা পৌঁছেছে গজলডোবা। ১৯৮৭ সালে গজলডোবায় ব্যারেজ তৈরি করে তিস্তার জলের বেশিটাই ক্যানেলের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর জেলায় নিয়ে যাওয়া শুরু হয়। সরকারি হিসাব অনুসারে ৩,৪২,০০০ হেক্টর জমি এর আওতায়। এই অঞ্চলের বহু চাষের জমি রূপান্তরিত হয়েছে চা-বাগানে, যেখানে ক্যানেলের জল বেআইনি ভাবে ব্যবহার করে হচ্ছে। এত বড়ো প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণের পর্যাপ্ত কর্মী না থাকায় এক দিকে সরকারি অর্থের অপচয় যেমন হচ্ছে, অন্য দিকে যাদের জন্য প্রকল্প তারা লাভের অংশ থেকে বঞ্চিত।

আরও পড়ুন : হিউস্টন হোক বা মুম্বই, বিপর্যয়ের মূলে ‘বেহিসাবি উন্নয়ন’ 

গজলডোবার পর থেকে তিস্তা ডান দিকে ভাঙতে শুরু করে এবং রংধামালি ও ডেঙুয়াঝাড় অঞ্চলে ২-৩ কিমি ছড়িয়ে যায়। জলপাইগুড়ি শহর পার করে তিস্তা আরও এগিয়ে হলদিবাড়ি ও মেখলিগঞ্জ শহরের মধ্যে দিয়ে কোচবিহার জেলায় প্রবেশ করে। হলদিবাড়ি ও মেখলিগঞ্জের মাঝে তিস্তার ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গজলডোবার পর থেকেই তিস্তায় প্রচুর চর। জলপাইগুড়ি শহরের পর থেকে ওই চরের সংখ্যা বেড়েছে। চরের জমি উর্বর, ফলে প্রচুর লোক চাষাবাদ ও পশুপালন করে ঝুঁকি নিয়েই বসবাস করে। গত কয়েক বছর বন্যায় উর্বর পলিমাটি না হওয়ায় এখন চরের চাষাবাদে রাসায়নিক সার ব্যবহৃত হচ্ছে। তার মানে, ঠিক যে সময় থেকে তিস্তায় প্রথম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প উৎপাদনের কাজ শুরু করেছে তখন থেকেই পলি উজানে জমা হতে শুরু করে। একই সঙ্গে গজলডোবা ব্যারেজ থেকে অপরিকল্পিত ভাবে জল ছাড়ার জন্য ভাঙনও বাড়তে শুরু করেছে।

কৃতজ্ঞতা : নেক্সপন (NEXPON)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here