jagaddhatri idol at pirer hat
পিরের হাটের জগদ্ধাত্রী প্রতিমা।
srila pramanik
শ্রীলা প্রামাণিক

কোনো পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে প্রাচীন ইতিহাস, আবার কোনো পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে কোনো না কোনো অলৌকিক কাহিনী। আবার কোনো পুজো বার্তা দেয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির। শান্তিপুরের ‘মিনি চন্দননগর’ সূত্রাগড়ের একাধিক জগদ্ধাত্রী পুজোকে এ ভাবেই ছুঁয়ে আছে এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, যার সঙ্গে জড়িয়ে নদিয়ারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের নামও।

শান্তিপুর শহরের মধ্যেই এই সূত্রাগড়। কথিত আছে, এক সময়ে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের কাছারিবাড়ি ছিল এই এলাকায়। সূত্রাগড়ের পিরের হাট এলাকায় জগদ্ধাত্রী পুজোর সূচনা কৃষ্ণচন্দ্রের হাত ধরেই হয়েছিল বলে কথিত। সেটাও প্রায় ৩০০ বছর আগেকার কথা। আজও এই পুজোর সংকল্প হয় কৃষ্ণচন্দ্রের নামে। এই এলাকায় এক পিরসাহেবের মাজার রয়েছে। তার পাশেই এক সময় হাট বসত। তার থেকেই এই স্থানের নামকরণ। আজ আর হাট বসে না। তবে মাজার রয়েছে আজও। এই এলাকায় বাস ছিল রাজার সৈন্যদের। সেখানেই নদিয়ারাজের উদ্যোগে জগদ্ধাত্রী পুজোর শুরু।

এখানে একটি অশ্বত্থগাছের তলায় বাঁধা থাকত রাজার হাতি অঞ্জু। মারা যাওয়ার পরে সেখানেই তাকে কবরস্থ করা হয় বলে কথিত। আর এই মাজারের পাশেই প্রায় তিনশো বছর ধরে জগদ্ধাত্রী পুজো হয়ে আসছে। স্থানীয় সংখ্যালঘু মানুষরা যেমন এই পুজোয় সমান ভাবে অংশ নেয়, তেমনি মাজারের দেখাশোনা করার দায়িত্ব সমান ভাবে সামলান এলাকার হিন্দুরা। পিরের হাট বারোয়ারি পুজোর প্রতিমা আজও অবিকল রাখা হয়েছে সেই তিনশো বছর আগের মতোই। এই পুজোর ভোগের জন্য রান্না হয় চার কুইন্টালের মতো খিচুড়ি। এ ছাড়াও থাকে পরিমাণমতো পোলাও এবং অন্যান্য তরিতরকারি।

এই পুজোকে ঘিরে রয়েছে অলৌকিক কাহিনিও। এখানে পুজোর সময়ে বাজে না মাইক বা সাউন্ড বক্স। কখনও তা বাজানোর চেষ্টা করলেও মণ্ডপে তা বাজেনি। মণ্ডপে এনে বাজানোর চেষ্টা করতেই তা খারাপ হয়ে গিয়েছে। তাই আর এখানে সেগুলি বাজানোর চেষ্টা করেননি বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন: কলকাতার কয়েকটি বনেদি পরিবারের জগদ্ধাত্রীপুজো

স্থানীয় বাসিন্দারাই এই পুজোর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বর্তমান পূজা কমিটির সভাপতি উত্তম দাস বছর কুড়ি আগের এক অত্যাশ্চর্য ঘটনার সাক্ষী। সেই বছর বিসর্জনের দিন দেবীপ্রতিমাকে কিছুতেই মণ্ডপ থেকে বের করা যায়নি। সকলে মিলে হাজারো চেষ্টা করেও বিসর্জন দিতে যাওয়ার জন্য এক চুলও নাড়াতে পারেননি। সেই সময়ে নাকি প্রতিমার মুখে বিষাদের ছায়া দেখেছেন অনেকেই।

শান্তিপুরের অন্যান্য জগদ্ধাত্রী পুজোর মতো পিরের হাটের পুজোও হয় এক দিনে। সুর্যোদয়ের সময় থেকে তিন ব্রাহ্মণ পুজো শুরু করেন। রাতের মধ্যেই সম্পন্ন হয় সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর পুজো। এক সময় বিসর্জনের শোভাযাত্রায় মশাল নিয়ে যাওয়া হত। তবে এখন মশালের বদলে গ্যাসবাতি এবং আলোকসজ্জা ব্যবহৃত হয়।

jagaddhatri idol at sutradhar para
সূত্রধরপাড়ার জগদ্ধাত্রী প্রতিমা।

পিরের হাটের পুজোর মতো না হলেও এক অন্য বৈশিষ্ট্য স্বকীয়তা দান করেছে সূত্রাগড়ের সূত্রধরপাড়া বারোয়ারির জগদ্ধাত্রী পুজোয়। এলাকার সূত্রধরদের হাত ধরে প্রায় ১৭০ বছর আগে এই পুজোর সুচনা। এই পুজোর প্রথা অনুযায়ী এখানে রান্না করা ভোগ নিবেদন করা হয় না। দেওয়া হয় ফলবলি। নানা ফলমূল, চাল, ডাল, সবজি ইত্যাদি কাঁচা অবস্থায় সাজিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। কোনো ভাবেই কাঁচা ভোগের পরিবর্তে রান্না করা ভোগ দেওয়া হয় না। তা দেবী গ্রহণ করেন না বলে কথিত। এক বার রান্না করা ভোগ নিবেদন করে ক্ষতির মুখে পড়তে হয় এক বাসিন্দাকে। এখানকার প্রতিমার রং লাল।

শান্তিপুর শহরের অদুরেই ব্রহ্মশাসনে প্রায় ২০০ বছর আগে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় চন্দ্রচূড় তর্কচুড়ামণি জগদ্ধাত্রী পুজোর নিয়ম এবং মন্ত্রের সন্ধান পান। সেই মন্ত্র এবং নিয়ম মেনেই সর্বত্র জগদ্ধাত্রী পুজো হয়ে আসছে বলে কথিত। চন্দ্রচূড়কে ধ্যানমগ্ন অবস্থায় দেবী যে রূপে দেখা দিয়েছিলেন তার বর্ণ ছিল সূর্যোদয়ের সময়কার আকাশের মতো লাল। চন্দ্রচুড়ের সময় থেকেই ব্রহ্মশাসনে পূজিত জগদ্ধাত্রীর রং লাল। পাশাপাশি সূত্রধরপাড়া বারোয়ারিতেও রক্তিম বর্ণের জগদ্ধাত্রী পুজিত হন।

শুধু এই দুই পুজোই নয় তামলিপাড়া বারোয়ারি, চড়কপাড়া বারোয়ারি, ষড়ভুজ বাজার, চুনুরিপাড়া বারোয়ারির মতো একাধিক পুজো শতাধিক বছরের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য বহন করে আসছে। শান্তিপুরের সর্বত্রই পুজো হয় এক দিনে। তবে বিসর্জন হয় কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী প্রতিমা বিসর্জনের এক দিন পরে। কথিত আছে, কৃষ্ণনগরের বিসর্জন দেখে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় সূত্রাগড়ের বিসর্জন দেখতে যেতেন। সেই কারণেই এই ব্যবস্থা। শোভাযাত্রার জন্য নির্দিষ্ট পথে প্রতিমা বিসর্জন হয় স্থানীয় ভাগীরথী নদীতে। তবে সবার আগে বের হয় পিরের হাটের প্রতিমা।

1 মন্তব্য

  1. ৩০০ বছর আগে কৃষ্ণনগরে পুজো শুরু হয়নি। শান্তিপুর তার আগে কী করে হবে?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here