নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি :  আবাসিক পালানোর ঘটনার তদন্তে কোরক হোমে এলেন দুই সিআইডি আধিকারিক। তাঁরা হোমের সুপার প্রণয় দে, হোমের কর্মী ও উদ্ধার হওয়া শিশুদের সঙ্গে কথা বলেন। তবে এখনই এই ঘটনার তদন্তভার সিআইডির হাতে যাচ্ছে না বলেই খবর সূত্রের। উপরমহলের নির্দেশে তাঁরা প্রাথমিক খোঁজখবর নিয়ে যান। ইতিমধ্যে এই ঘটনায় জলপাইগুড়ি শহর তোলপাড় হয়ে গিয়েছে।

জলপাইগুড়ির বেসরকারি হোম থেকে শিশুপাচার নিয়ে রাজ্য তোলপাড় হয়েছিল ফেব্রুয়ারি মাসে। সেই ঘটনার তদন্তে থাকা আধিকারিকরাই শুক্রবার জলপাইগুড়ি শহরের কোরক হোমে তদন্তে আসেন।

সিআইডি-র জিজ্ঞাসাবাদ।

বৃহস্পতিবার রাতে হোমের দোতলার একটি ঘরের দেওয়াল ভেঙে পাঁচিল টপকে পালায় ৮ জন আবাসিক কিশোর। রাতেই তিন জন ধরা পড়ে যায় কোতোয়ালি থানার পুলিশের হাতে। শুক্রবার সকালে ফের তিন কিশোর ধরা পড়ে। বাকি দু’জন এখনও নিখোঁজ।

আরও পড়ুন: হোমের দেওয়াল ভেঙে, পাঁচিল টপকে পালাল ৮ কিশোর, উদ্ধার ৩

শুক্রবার হোমে আসেন জেলাশাসক রচনা ভগত ও জেলা আইনি পরিষেবা সমিতির সম্পাদিকা নীলাঞ্জনা দে এবং জেলা সমাজকল্যাণ আধিকারিক পীযূষ সাহা। তাঁরাও উদ্ধার হওয়া ৬ জন কিশোরের সঙ্গে কথা বলেন। এই ঘটনায় হোম কর্তৃপক্ষের দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। এর আগেও একাধিকবার এই হোম থেকে আবাসিক পালানোর ঘটনা ঘটেছে। পরিসংখ্যান বলছে ২০১২ সালে ১৮ জন, ২০১৩ সালে ১২ জন, ২০১৪ সালে ২৪ জন, ২০১৫ সালে ৭ জন, ২০১৬ সালে ১ জন এবং চলতি বছরে গত কালের ঘটনা নিয়ে সেই সংখ্যা এখনও পর্যন্ত ১০ জন। এদের মধ্যে ৬ জন উদ্ধার হয়েছে।

এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে সমস্যাটা গভীরে।

উদ্ধার হওয়া কিশোররা।

এই হোমে মূলত অভিভাবকহীন বা দরিদ্র পরিবারের শিশু-কিশোররা থাকে। এ ছাড়া কৈশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে পুলিশের হাতে ধৃত কিশোরদেরও ঠাঁই হয় এই হোমে। খাদ্য, পোশাক এবং নিশ্চিত বাসস্থান পাওয়া সত্ত্বেও কেন বারে বারে তারা হোম থেকে পালিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালের অন্যতম মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ স্বস্তিশোভন চৌধুরীর বিশ্লেষণ, এই কিশোররা চার দেওয়ালের মধ্য বদ্ধ জীবনযাপন করে। বাইরের জগতের চাকচিক্য তাদের প্রবল ভাবে প্রলুব্ধ করে। তা ছাড়া, বাবা-মা’র ভালোবাসা না পাওয়ায় একটা মানসিক দ্বন্দ্বে ভোগে হোমে থাকা এই কিশোররা। যার থেকে মুক্তির রাস্তা খুঁজে নিতেই কিশোররা এই ধরনের ‘অ্যাডভেঞ্চারে’ জড়িয়ে পড়ে বলে মত মনোবিদ স্বস্তিশোভন চৌধুরীর। এর থেকে মুক্তির উপায়ও বাতলেছেন তিনি। যতটা সম্ভব এদের ‘হোমলি অ্যাটমোস্ফিয়ার’ দিতে হবে। এদের মানসিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে প্রত্যেকের জন্য আলাদা ভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ  দিয়েছেন ডাঃ চৌধুরী। পড়াশোনা, খেলাধুলো, ভোকেশনাল ট্রেনিং-এর মতো কাজে ব্যাস্ত থাকলে এদের এই ধরনের প্রবণতা কমবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

এইখানেই বড়ো প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। বহু পুরোনো এই হোম, যেখানে ৮৭ জন আবাসিক রয়েছেন, সেখানে নেই কোনো কাউন্সিলর। এর আগে এই ধরনের ঘটনার পর একাধিকবার কাউন্সিলর নিয়োগের দাবি উঠেছিল, প্রশাসনের তরফে আশ্বাসও মিলেছিল। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। নেই স্থায়ী কোনো চিকিৎসক। কর্মী ও নিরাপত্তা রক্ষীর সংখ্যা অপর্যাপ্ত। সব মিলিয়ে হোম থাকলেও, ‘নেই’-এর তালিকা বেশ দীর্ঘ। যদিও অন্য বারের মতোই এ বারেও প্রশাসনের তরফে প্রতিশ্রুতি মিলেছে। জেলাশাসক রচনা ভগত জানিয়েছেন, কাউন্সিলর নিয়োগ করা হবে। জেলা আইনি পরিষেবা সমিতির সম্পাদিকা নীলাঞ্জনা দে জানিয়েছেন, এদের মানসিক বিকাশের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং-এর করার জন্য সুপারিশ করবেন উচ্চ আদালতের কাছে।

যে ভাবে পালিয়েছিল কিশোররা।

দিও দেওয়াল ভাঙা থেকে শুরু করে, বিছানার চাদর বেয়ে নেমে, আমগাছে উঠে, ২১ ফুট উচু পাঁচিল টপকে পালিয়ে যাওয়ার গোটা ঘটনায় হোম কর্তৃপক্ষের গাফিলতি স্পষ্ট। কিন্তু এখনই তাদের শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে না। জেলাশাসক রচনা ভগত জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ তদন্ত শেষ হওয়ার পরই এই নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

যদিও এখন নাগরকি সমাজে একটা প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে, এর সমাপ্তি কোথায়? অবহেলিত এই শিশু-কিশোর’রা কি সারা জীবন এই ভাবে ‘ভ্যাগাবন্ড’-এর জীবন কাটাবে?

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here