durga puja
নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: সন্তানের ডাক কি মা ফেলতে পারে! তাই আরাধনা শেষ হলেও এখনও কৈলাসে ফিরতে পারেননি মা দুর্গা। রয়ে গিয়েছেন মর্ত্যেই। বিসর্জনের পরও এখনও বিভিন্ন তিথিতে বিভিন্ন জায়গায় ভক্তদের কাছে পূজিত হচ্ছেন তিনি।
জলপাইগুড়ি শহর থেকে বারো কিলোমিটার দূরে রংধামালি গ্রাম। বৃহস্পতিবার সেখানে সাড়ম্বর পূজিতা হলেন দশভূজা। টানা ১৩৬ বছর ধরে এখানে এই পুজো হচ্ছে। লক্ষ্মীপুজোর পর এবং কালীপুজোর আগে এই পুজো হয়।
স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, মর্ত্যে পুজোর শেষে সপরিবার কৈলাসে ফিরছিলেন মা দুর্গা। তখন রংধামালির এই এলাকায় একটি বাগানে বিশ্রাম নিতে বসে পড়েন তিনি। তা জানতে পেরে ওই বাগানের মালিক মহারাজ নামে এক ব্যাক্তি ও স্থানীয় বাসিন্দারা সে খবর পেয়ে সেখানে ছুটে আসেন। নানা ভাবে সেবা করেন মা দুর্গা ও তাঁর সন্তান-সন্ততিদের। তাঁকে সপরিবার এখানে একদিন থেকে যাওয়ার অনুরোধ করেন গ্রামবাসীরা। তাতে রাজি হন দেবী। সেখানেই তাঁকে সপরিবার আরাধনা করেন সমস্ত গ্রামবাসী। তাতে খুশি হয়ে মা দুর্গা তাঁদের আশীর্বাদ করেন এবং বর দেন এই জায়গা শস্যশ্যামলা থাকবে চিরদিন। তখন থেকেই এখানে সাড়ম্বর পুজো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে মায়ের মন্দির। সেই মন্দিরেই গ্রামের সকলে মিলে পূজোর আয়োজন করেন। নিজের সাধ্যমতো আর্থিক সহযোগিতা করেন গ্রামবাসীরা।
মন্দিরের পূজারি বিষ্ণু চক্রবর্তী বংশ পরম্পরায় এখানে পূজো করে আসছেন। তাঁর কাছ থেকে এই পুজোর কিছু নিয়মকানুন জানা গেল। মায়ের প্রতিমায় সাবেকিয়ানা। লক্ষ্মী, গণেশ, সরস্বতী, কার্তিক ও মহাদেবের পাশাপাশি জয়া ও বিজয়ার প্রতিমা স্থান পেয়েছে এইখানে। পুজোতে এখনও ছাগল বলি দেওয়ার রীতি আছে। তবে এই পুজোর সব চেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, চার দিনের বদলে এক দিনেই সমস্ত পুজো হয়। অর্থাৎ ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী পুজো এক দিনেই সাঙ্গ করা হয়। কারণ মা এখানে একদিন অধিষ্ঠান করেছিলেন। আজ শুক্রবার বিসর্জন।
যে হেতু মহারাজ নামে ওই ব্যাক্তির বাগানে এই পুজোর শুরু হয়েছিল, তাই এই এলাকায় মহারাজের দুর্গাপুজা নামেই এর পরিচিতি। এ ছাড়াও পাশেই রয়েছে কালীমন্দির। কালীপুজো আয়োজন  হয় সেখানে। বংশ পরম্পরায় মন্দিরের সেবায়েত অনন্ত দাস জানালেন, দেবী দুর্গার সঙ্গে সঙ্গে মা কালীরও তিনটি রূপের পুজো হয়েছে।
durga puja fair
এই পুজোকে উপলক্ষ করে তিন দিন ধরে বিশাল মেলা চলে। বৃহস্পতিবার এই মেলার উদ্বোধন করেন এসজেডিএ চেয়ারম্যান সৌরভ চক্রবর্তী। শহরের হইহুল্লোড় থেকে দূরে গ্রামীণ পরিবেশে শতাব্দী প্রাচীন মেলায় আসতে পেরে আপ্লুত তিনি। জানিয়েছেন, প্রাচীন এই পুজোটি যাতে আরও প্রচার ও প্রসার পায় তার চেষ্টা করবেন।
এই পুজোর উদ্যোক্তাদের পক্ষে বারোপাটিয়ার পঞ্চায়েত প্রধান কৃষ্ণ দাস জানিয়েছেন, মেলা চলবে শনিবার পর্যন্ত।
এই পুজো এবং মেলার আর একটা বৈশিষ্ট্য, স্থানীয় যাঁরা বাইরে থাকে তাঁরা সকলেই এই সময় ঘরে ফেরেন। বিশেষ করে বিবাহিত মেয়েরা দুর্গা উৎসবে বাপের বাড়িতে আসতে না পারলেও মহারাজ মেলার সময় তাঁদের বাপের বাড়ি আসা চাই-ই চাই। এলাকার অঞ্জনা সরকার, রমিতা রায়, মাম্পি বর্মণদের মতো গৃহবধুরা এই সময়টার জন্য যেন সারা বছর  অপেক্ষা করে থাকেন। আর কচিকাঁচাদের তো দ্বিগুণ উৎসাহ। পুজো একদিন হলেও মেলা তো তিন দিন। স্কুলপড়ুয়া ববিতা, সাধনা, বেবি’রা জানাল, এই তিন দিন তাদের অবাধ ছাড়। বিকেল হলেই মেলার মাঠে। রসে ভেজা জিলিপি, মোগলাই পরটা-কষা মাংসের সুগন্ধে কি আর বাড়িতে বসে থাকায় যায়। তা ছাড়া সার্কাস, নাগারদোলা, যাত্রা আর আইসক্রিমের আকর্ষণ। আরও কত রকমের দোকান, খেলনা থেকে সাজগোজ, কী নেই। তিন দিন ধরে হবে হরেক রকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও।
দশমীর বিসর্জনের পর যখন বাঙালির মন খারাপ, তখন মায়ের এই অকালবোধন নতুন করে আনন্দে মেতে ওঠার ডাক দেয়। শুধু রংধামালি নয়, উৎসবের স্বাদ নিতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষের ঢ্ল নামে মহারাজ মেলায়।
সব চেয়ে বড়ো কথা, জাত-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই মিলে পুজো আনন্দ করেন এখানে। পুজো দেওয়া, পাত পেড়ে মায়ের ভোগ খাওয়া আর মেলার মজা। সর্বধর্ম নির্বিশেষে আনন্দ-আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই মেলা হয়ে ওঠে  সম্প্রীতির মিলনক্ষেত্র। এটাই তো যে কোনো উৎসবের আসল আমেজ, যেখানে ভেদাভেদ ভুলে ভাগ করে নেওয়া যায় হাসি-কান্না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here