subarnarekha in ghatshila
ঘাটশিলায় সুবর্ণরেখা।
papiya mitra
পাপিয়া মিত্র

অগত্যা সাংবাদিক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হল। পথ ডাকলে কী হবে? মনের সাড়া পেতে হবে। এ ঘর সে ঘর ঘুরে মন বলল চলো যেখানে প্রকৃতির চেটেপুটে স্বাদ নেওয়া যায়, যেখানে বাইরে কঠি্‌ন, ভিতরে নরম মাটির সুর শোনা যায়, সেখানেই খ্যাপার দেখা মিলতে পারে। হয়তো সে অপেক্ষায় থাকবে।

পথের ঠিকানা মিলল। তিন দিনের টানা ছুটি মিলেছে। ঘরকুনো মানুষদের রবীন্দ্রনাথ নিতান্তই জড়প্রকৃতির মনে করতেন। আর বিভূতিভূষণ মনে করতেন এর জন্য দায়ী অশিক্ষা। গ্রামজীবনের দূরত্ব ও তার উপরে অজ্ঞতার সঙ্কীর্ণ গণ্ডিতে জীবন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গেলে চলমান জীবনে প্রকৃতির তাপ সেই ভাবে পড়ে না। অতি বৈষয়িক মানুষ কখনও অনন্ত যাত্রাপথের সঙ্গী হতে পারে না। ২৬ জানুয়ারির ভোরে ইস্পাত এক্সপ্রেস মিলিয়ে দিল মেয়েবেলার তিন সঙ্গীকে। অনন্ত প্রকৃতির কাছে নিজেদের সঁপে দিতে ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলা। চলল গাড়ি রেলের গাড়ি, বাজল বাঁশি দূরের পাড়ি…

কুয়াশার চাদর সরিয়ে কখনও কখনও গ্রামজীবন উঁকি মারে। সাধারণ কামরায় সংরক্ষিত অনুমতি মিলেছে। তাই সই। যত সব খ্যাপার দল। নাও, এ বার হু হু শীতল হাওয়ায় ঠকঠক কেঁপে মরো। মধ্য দিনের ঘণ্টা দেড়েক আগে পৌঁছে গেলাম নির্জনবিলাসী ঘাটশিলায়। এখন মানুষ নড়ে বসার শিক্ষা নিচ্ছে। ছোটো ছোটো দল দু’এক দিনের ছুটিছাটায় ঘর থেকে বের হচ্ছে। তা এ বারে ছুটি মিলেছে তিনদিন, বাঙালিকে দেখে কে?

dharagiri, ghatshila
ধারাগিরি।

সাংবাদিক বন্ধুর সৌজন্যে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ‘গৌরীকুঞ্জ উন্নয়ন সমিতি’-এর সভাপতি তাপসবাবু। স্টেশনে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন। মিষ্টি নামের রিসোর্ট ‘সুহাসিতা’য় থাকার ব্যবস্থা। মানুষের ঢল নেমেছে ঘাটশিলার মাটিতে। ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই পরিবেশে থাকার জন্য বরাদ্দ ঘরে ব্যাগ নামিয়েই মধ্যাহ্নভোজে বসে পড়া। এখন সব কিছুর তদারকির জন্য গুগুলজ্যাঠা একাই পৃথিবী। সঙ্গে হোয়াটস অ্যাপ-এ মেনু জানিয়ে দেওয়া। হাতে থাকে যদি মুঠোফোন। ধুমায়িত ভাত ও মুসুরির ডালের সঙ্গে আলুভাজা, এঁচোড়ের ডালনা, মাছের হালকা গা-মাখা, চাটনি, পাঁপড় – কথামতো সবই।

burudi dam, ghatshila
বুরুডি ড্যাম।

ঘাটশিলার কশিডায় বরদা পাইন রোডে ‘সুহাসিতা রিসোর্ট’। ঘড়িতে সাড়ে বারোটা, ম্যানেজার অমরেন্দ্রবাবু একটি অটোর ব্যবস্থা করে দিলেন। সারথি হারুনভাই। প্রথম গন্তব্য রিসোর্ট থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে ধারাগিরি জলপ্রপাত। রাস্তা চওড়ার কাজ চলছে। দিঘা ও বুরুডি গ্রাম ফেলে পথ এগিয়েছে ধারার দিকে। আধ ঘণ্টা চলার পরে অটো থামল। এ বার হাঁটা পথ। রুখাশুখা লালমাটির পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া। পথে আদিবাসী খোকাদের বায়না লজেন্স খাওয়ার। চড়া রোদ ক্রমে মুখ লু্কোলো ঘন বনের জঙ্গলে। অশোক-কেন্দু-শাল-মহুয়ার ছায়ায় ছায়ায় পথ মিশেছে নুড়ি থেকে পাথরে। পাথর থেকে বোল্ডারে। চলতে হাঁপ বাড়ে। দলমা পাহাড় ঘেরা অরণ্যে হাতি নেমে আসে খাবারের সন্ধানে। মহুয়ার মৌতাতে ভালুক ঘোরে আশেপাশে। রোমাঞ্চকর পরিবেশ, তবে হাঁটুর মজবুতি দরকার। শীতে শীর্ণকায়া হলেও ধারাপ্রপাতটি বর্ষায় মন হরণ করে নেয়। ধারাটির কাছে আছে কালীমায়ের বিগ্রহহীন পাথর ঘেরা মন্দির। হারুণভাই সামনে এগিয়ে যাওয়া দলের দিকে তাকিয়ে বলে দিয়েছিল এক সঙ্গে যেতে। কিন্তু পথের চড়াই-উতরাইয়ের স্বভাবে কে যে কার পিছনে বোঝা মুশকিল। শেষ প্রান্তে একজন করে চলা। যাওয়া-আসা নিয়ে প্রায় আড়াই কিলোমিটার পথ ফেলে অটোয় বসা।

phuldungri, ghatshila
ফুলডুংরি।

অটো বাঁক নিল বাম দিকে। তিন কিলোমিটার দূরত্বে বুরুডি ড্যাম। পাহাড়ি ঝোরার জল ধরে তৈরি হয়েছে সরোবর। চাষের কাজে যাচ্ছে জল। বিস্তীর্ণ উপত্যকা, চারপাশ পাহাড় ঘেরা। নীলচে সবুজ শান্ত জলে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি ভাসে। চড়া রোদের সঙ্গে হিমেল বায়ুর মিতালি-তিন কন্যা হারিয়ে যায় অতীতে। সারথি ডাক দেয়, দিদিরা যাবেন তো, আরও বাকি আছে। তিন চাকা বাঁক নিল ডান দিকে, একটু গড়িয়ে থেমে গেল ফুলডুংরির পাদদেশে। আহা, বড়ো মন ছুঁয়ে যাওয়া নাম, ফুলডুংরি। শাল-মহুয়ায় মোড়া এক আরণ্যক পরিবেশ। প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া, স্বপ্নিল উপনিবেশে মনের কথাগুলি কয়ে নেওয়ার শুভ মুহূর্তকে মনে হয় অস্বীকার করা যায় না। ছায়ামাখা পথ টিলা ঘিরে উঠেছে। সঙ্গী করেছে আকাশছোঁয়া বনানীকে। একবারে চুড়োয় দোলপূর্ণিমার পর থেকে সাঁওতাল আদিবাসীদের ‘বাহা’ উৎসব শুরু হয়। (চলবে) 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here