wife arrested for murder charge

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলপাইগুড়ি: নাবালক শিশুদু’টি সোমবার রাতেই বুঝতে পেরেছিল বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। বাড়িভর্তি পুলিশ, প্রতিবেশীদের ভিড় দেখে কিছুটা সিঁটিয়ে ছিল তারা। তবে তাদের ভবিষ্যৎ কতটা অসহায় তখনও হয়তো বুঝে উঠতে পারেনি শিশুদু’টি। তাদের নির্মম ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে চা বাগানের আনাচেকানাচে। কারণ নৃশংস ভাবে খুন হয়েছে শিশুদু’টির বাবা। আর সেই খুনের দায়ে আজ জেলবন্দি তাদের মা।

জলপাইগুড়ির বানারহাটের আমবাড়ি চা বাগান। ওই বাগানেরই যুবক বিমল সরকার এবং তরুণী সুমি নাগ। প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল দু’জনের মধ্যে। ২০০৭ সালে তারা বিয়ে করে। থাকত বাগানের আবাসনে। দু’টি পুত্রসন্তানও আছে।

কিন্তু দু’জনের ভালোবাসার মধ্যে কখন যেন ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছিল অবিশ্বাস আর ঘৃণা। বিমলের ধারণা হয়েছিল, অন্য কারওর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে স্ত্রী সুমি। এই নিয়ে অশান্তি চরমসীমায় উঠেছিল সংসারে। বিমলের দিদি লক্ষ্মী সরকার জানিয়েছেন, ভাই একাধিকবার স্ত্রীর বিবাহবহির্ভুত সম্পর্ক নিয়ে সমস্যার কথা জানিয়েছিল তাঁদের। এই সন্দেহের জেরে স্ত্রীকে প্রায়ই মারধর করত বিমল। সোমবার রাতেও সেই ঘটনা ঘটে। সেই সময় লোহার রড এবং পাথর দিয়ে স্বামীকে পালটা আঘাত করে সুমি। রক্তাক্ত হয় বিমল। খবর পেয়ে তার দাদারা এসে রক্তাক্ত বিমলকে বানারহাট হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে তার মৃত্যু হয়েছে, জানিয়ে দেন চিকিৎসক। রাতেই বাড়ি থেকে সুমিকে আটক করে বানারহাট থানার পুলিশ। উদ্ধার হয় রক্তমাখা রড ও পাথর। বিমলের দাদা নীলকমল সরকারের অভিযোগের ভিত্তিতে সুমিকে খুনের অভিযোগ গ্রেফতার করে মঙ্গলবার জলপাইগুড়ি আদালতে পাঠায় পুলিশ। বিচারকের নির্দেশে তার চোদ্দো দিনের জেল হেফাজত হয়েছে, জানিয়েছেন আদালতের সরকারি আইনজীবী প্রদীপ চ্যাটার্জি।

স্বামীকে খুনের কথা অস্বীকার করেনি সুমিও। কিন্তু সে জানিয়েছে, স্বামীকে পালটা আঘাত না করলে খুন হয়ে যেত সে নিজেই। বাঁচত না শিশুগুলিও। সুমি বাগানের স্থায়ী শ্রমিক। কিন্তু স্বামী বিমল সে রকম বাঁধাধরা কোনো কাজ করত না। বরং স্ত্রীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে মদ খাওয়া এবং জুয়া খেলাই নেশা হয়ে উঠেছিল তার। তার মধ্যে স্ত্রীকে নিয়ে সন্দেহ। সব মিলিয়ে মানসিক অশান্তিতে ভুগত বিমল। যার বহিঃপ্রকাশ হত স্ত্রীর ওপর অত্যাচারে। সুমির অভিযোগ, একাধিক বার রড দিয়ে মাথায় মেরে এবং গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছে বিমল। অশান্তির জেরে এক বার নিজের বাড়িতেই আগুন লাগিয়ে  দিয়েছিল স্বামী। তার নির্যাতনের হাত থেকে বাদ যেত না দুই শিশুও। সুমিকে বাগে আনতে এর আগে বড়ো ছেলের গায়ে পেট্রোল ঢেলে দিয়েছিল সে। তার বদ মেজাজির কারণে প্রতিবেশীরাও সাংসারিক অশান্তি মেটাতে এগিয়ে আসতে ভয় পেত।

সুমির অভিযোগ, ননদ বা ভাসুর আজ তার চরিত্র নিয়ে মিথ্যা রটনা করছেন, কিন্তু তারা সব ঘটনা জানলেও একবারও এগিয়ে আসেননি সাহায্য করতে। এমনকি তারা বিমলকে পৈতৃক সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত করেছিলেন, অভিযোগ সুমির।

সোমবার সকালে স্ত্রীকে এক দফা মারধর করার পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় বিমল। রাতে ফের নেশা করে বেসামাল অবস্থায় বাড়ি ফেরে। শুরু হয় বচসা। ছেলেদের মারধর করতে শুরু করে সে। তখন স্বামীর হাত থেকে বাঁচাতে ছেলেদের একটি ঘরে ঢুকিয়ে তালা মেরে দেয় সুমি। এ বার সুমির ওপর নেমে আসে খাঁড়া। সুমির অভিযোগ, দড়ি দিয়ে তাকে বেধে মেরে ফেলার চেষ্টা করে স্বামী। তখন হাতের কাছে থাকা পাথর দিয়ে স্বামীকে আঘাত করে সে। তার পর লোহার রড দিয়ে মারে। তখন জ্ঞান হারায় বিমল। গোলমালের আঁচ পেয়ে ততক্ষণে বাড়িতে প্রতিবেশীদের ভিড় জমে গিয়েছে। পালানোর চেষ্টাও করেনি সুমি। শুধু পুলিশ যখন তাকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছিল তখন সুমি তার বৃদ্ধা মা মিনতিদেবীকে শুধু একটা কথাই বলেছিল, ছেলেদু’টোকে দেখো।

একদম ছোটো ছেলেটি এখনও তেমন  কিছু বুঝতে না পারলেও বছর দশেকের বড়ো ছেলেটি গতকাল থেকে ঘটনাপ্রবাহ দেখতে দেখতে খানিকটা যেন ‘বড়ো’ হয়ে উঠেছে। আজ সন্ধ্যায় নেমে আসা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বাবার মুখাগ্নি করতে করতে তার শুন্যতাভরা দৃষ্টি বুঝিয়ে দিচ্ছিল তার ভবিষ্যৎ অসহায়তার কথা। বাবা নেই, খুনের অপবাদ নিয়ে মা জেলবন্দি। কিন্তু কার্যত অনাথ হয়ে আসল শাস্তি পাবে নাবালক শিশুদু’টি। কিন্তু কেন? কার দোষে? প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে সবুজ চা বাগানের ইতিউতি!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here