chitrakote falls
চিত্রকোট জলপ্রপাত।

শীতে বেড়ানোর আদর্শ জায়গা সাগরপাড়ের বিশাখাপত্তনম। গরমের আর্দ্র আবহাওয়া নেই। বর্ষার বৃষ্টি নেই। বর্ষাশেষের নিম্নচাপের ভয় নেই। অতএব শীতেই চলুন বিশাখাপত্তনম, সেখান থেকে চলুন পাহাড়ি ভূমে, আরাকুতে, তার পর ঢুকে পড়ুন ছত্তীসগঢ়ের অন্দরে।

বিশাখাপত্তনম-টায়ডা-আরাকু-জগদলপুর

ভারতের সব বড়ো শহরের সঙ্গেই বিশাখাপত্তনম ট্রেন ও বিমানপথে যুক্ত। হাওড়া থেকে ১৩ থেকে ১৬ ঘণ্টা সময় লাগে বিশাখাপত্তনম পৌঁছোতে। টানা যাত্রার টিকিট না পেলে ভুবনেশ্বর ব্রেক জার্নি করে আসতে পারেন। ধৌলি, জন শতাব্দী বা পুরী শতাব্দী ধরে ভুবনেশ্বর আসুন। পরের দিন ভোর সাড়ে ৫টার প্রশান্তি এক্সপ্রেস বা সাড়ে ৭টার ইণ্টারসিটি ধরে দুপুরের মধ্যে বিশাখাপত্তনম পৌঁছে যান। চেন্নাই থেকেও বিশাখাপত্তনম আসতে মোটামুটি একই সময় লাগে। দিল্লি থেকে সরাসরি ট্রেনে বিশাখাপত্তনম আসতে ৩৩ থেকে ৩৮ ঘণ্টা সময় লাগে। মুম্বই থেকে বিশাখাপত্তনম আসার দু’টি দৈনিক ট্রেন আছে। ২৮-২৯ ঘণ্টা সময় লাগে।

rushikonda beach
ঋষিকোন্ডা সৈকত।

প্রথম, দ্বিতীয়, ও তৃতীয় দিন – রাত্রিবাস বিশাখাপত্তনম।

বিশাখাপত্তনমে কী দেখবেন

বিশাখাপত্তনমে পৌঁছোনোর দিনটি প্রথম দিন ধরে চার রাত এখানে কাটান। প্রথম দিন ঘোরাঘুরির জন্য কতটা কাজে লাগাতে পারবেন তা নির্ভর করছে আপনি কখন বিশাখাপত্তনম পৌঁছোবেন তার ওপর।

আরও পড়ুন শীতের ভ্রমণ ৬ / আরও হিমাচল

(১) সৈকত শহর বিশাখাপত্তনম পূর্বঘাট পর্বতমালায় ঘেরা। সিটি সেন্টার থেকে তিন কিমি দূরে রামকৃষ্ণ বিচ। শহরের সব চেয়ে আকর্ষণীয়। এখানে রয়েছে বাঙালির গড়া কালীমন্দির, পিছনে রামকৃষ্ণ মিশন, নবরত্ন মন্দির, আইএনএস কুরুসুরা সাবমেরিন মিউজিয়াম, মছলিঘর, চোল-পল্লবদের নানা প্রত্নসামগ্রী সংবলিত বিশাখা মিউজিয়াম, ভুদা পার্ক। এই পথের শেষে বিশাখাপত্তনম বন্দর আর ডলফিন নোজ

(২) এখান থেকে কৈলাসগিরি পাহাড়ের দিকে যেতে পড়বে লাওসন বে বিচ

kailasgiri
কৈলাসগিরি।

(৩) বিচ রোড ধরে উত্তরে আপ্পুঘর রেখে পথ উঠেছে ৩০৪ মিটার উঁচু কৈলাসগিরিতে। রয়েছে অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, কেয়ারি করা বাগান, টয় ট্রেন, শিব-দুর্গার মূর্তি এবং রোপওয়ে। রোপওয়ে চেপে প্রাকৃতিক শোভা দেখতে দেখতে চলে আসুন ভুদা পার্কে।

(৪) আরও উত্তরে চলুন বিশাখাপত্তনমের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বালুকাবেলা ঋষিকোন্ডা বিচ

(৫) শহর থেকে ১৬ কিমি উত্তরপুবে সিমাচলম। সবুজ পাহাড়ের মাঝে ১১ শতকের নৃসিংহ দেবতার মন্দির।

(৬) রামকৃষ্ণ বিচ থেকে উত্তরে ২৮ কিমি দূরে সাগরপাড়ে ১৭ শতকের পর্তুগিজ শহর ভিমুনিপত্তনম। আদর করে লোকে বলে ভিমিলি। রয়েছে দুর্গ, সৌধ, প্রাচীন লাইটহাউস।

thotlakonda
থোতলাকোন্ডা।

(৭) ভিমিলির পথেই রামকৃষ্ণ বিচ থেকে ১৬ কিমি দূরে বভিকোন্ডা ও থোতলাকোন্ডায় পাহাড়ি টিলায় আবিষ্কৃত হয়েছে বৌদ্ধ বিহার, মহাচৈত্য, নানা স্তূপ।

(৮) রামকৃষ্ণ বিচ থেকে দক্ষিণে ৩২ কিমি দূরে অল্প চেনা সৈকত ইয়ারাডা

চতুর্থ দিন – রাত্রিবাস টায়ডা।

বিশাখাপত্তনম থেকে সকাল ৬.৫০-এর কিরন্ডুল প্যাসেঞ্জার বোরাগুহালু পৌঁছে দেয় পৌনে ১০টায়। বোরা গুহা ও দু’ কিমি দূরের কাটিকি ফলস্‌ দেখে চলে আসুন ১৩ কিমি দূরের টায়ডায়। অনন্তগিরি পাহাড় শ্রেণির কোলে টায়ডা। এখানে সেই দিনটা কাটিয়ে ঘুরে আসুন ১২ কিমি দূরের অনন্তগিরি ফলস্‌ ও ১৫ কিমি দূরের টাটিগুড়া ফলস্‌

borra caves
বোরা গুহা।

পঞ্চম ও ষষ্ঠ দিন – রাত্রিবাস আরাকু।

পঞ্চম দিন বোরাগুহালু স্টেশন থেকে পৌনে ১০টার কিরন্ডুল প্যাসেঞ্জার ধরে এক ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যান আরাকু।

আরাকুতে কী দেখবেন

chaparai
চাপারাই।

পূর্বঘাট পাহাড়শ্রেণির কোলে ৩১০০ ফুট উচ্চতায় আরাকু। আরাকু ঢোকার মুখেই পড়ে আদিবাসী মিউজিয়াম। দু’ কিমি দূরে পদ্মপুরম হর্টিকালচার। দেখে নিন ১২ কিমি দূরের পাহাড়-নদী-সবুজের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে সাপারাই। দেখে আসুন ১২ কিমি দূরের চাপারাই ফলস

আরাকু অবস্থানকালে দ্বিতীয় দিন গাড়িতে চলুন ২৮ কিমি দূরের পাডুয়া। জঙ্গল, পাহাড় আর লেকে ঘেরা পাডুয়া এ অঞ্চলের এক নবতম পর্যটন কেন্দ্র। আরও ৫৪ কিমি এগিয়ে চলুন লীলা মজুমদারের সাহিত্যে অমর হয়ে থাকা ডুডুমা জলপ্রপাত দেখতে। দু’টি জায়গারই অবস্থান ওড়িশায়।

আরও পড়ুন শীতের ভ্রমণ ৫ / বরফ দেখতে হিমাচল

সপ্তম, অষ্টম ও নবম দিন – রাত্রিবাস জগদলপুর।

আরাকু থেকে জগদলপুর চলুন পৌনে ১০টার কিরন্ডুল প্যাসেঞ্জারে। জগদলপুর পৌঁছে দেবে বিকেল ৪.২০ মিনিটে।

জগদলপুরে কী দেখবেন

(১) বাস স্ট্যান্ডের কাছে কাকতীয় রাজাদের প্রাসাদ

(২) প্রাসাদদ্বারে রাজপরিবারের কুলদেবী দন্তেশ্বরী মাতার মন্দির। সিংহবাহিনী দুর্গাই এখানে দন্তেশ্বরী

tirathgarh falls
তিরথগঢ় জলপ্রপাত।

(৩) পাশেই ভুবনেশ্বরী দেবীর মন্দির

(৪) শহরে গঙ্গামুণ্ডা লেক, দলপতি সাগর লেক

(৫) ৬ কিমি দূরে সাতধার, সাতধারায় ভাগ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে ইন্দ্রাবতী নদী।

(৬) জগদলপুর থেকে চিত্রকোটের পথে ৪ কিমি গিয়ে ডাইনে আরও ৪ কিমি গেলে চিত্রধারা জলপ্রপাত

(৭) ৩৮ কিমি দূরের ভারতের নায়াগ্রা ইন্দ্রাবতী নদীর জলপ্রপাত চিত্রকোট। বর্ষায় আধ কিমি জায়গা জুড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইন্দ্রাবতী।

kanger valley national park
কাঙ্গেরঘাটি ন্যাশনাল পার্ক।

(৮) ৩৯ কিমি দক্ষিণ পশ্চিমে কাঙ্গেরঘাটি ন্যাশনাল পার্ক

(৯) পার্কের প্রবেশদ্বারের বিপরীতে গ্রামমুখী পথে ৪ কিমি যেতে তিরথগঢ় জলপ্রপাত। অত্যাশ্চার্য স্ট্যালাগমাইট ও স্ট্যালাকটাইটের দণ্ডত্রিভুবনেশ্বর মহাদেব ও লক্ষ্মীনারায়ণের মন্দির। অদূরে নজরমিনার

(১০) তিরথগঢ় থেকে এক কিমি দক্ষিণে বোরা গুহার মিনি সংস্করণ কুটুমসর গুহা। কপিকলের সাহায্যে ৩৫ মিটার গভীরে নেমে দেখে নেওয়া যায় চুনাপাথরের দণ্ডরূপী শিবলিঙ্গ

(১১) কুটুমসরের ১৭ কিমি দূরে কৈলাস গুহা

দশম দিন – ঘরে ফেরা।

জগদলপুর থেকে হাওড়া আসার সরাসরি ট্রেন কোরাপুট-হাওড়া এক্সপ্রেস। ট্রেনটি ভোর ৪.১৫ মিনিটে জগদলপুর ছেড়ে হাওড়া এসে পৌঁছোয় সকাল সোয়া ছ’টায়। দিল্লি, মুম্বই ও চেন্নাই যাওয়ার সরাসরি ট্রেন নেই জগদলপুর থেকে। দিল্লি যেতে হলে ত্রিসাপ্তাহিক (সোম, বুধ ও শুক্র) দুর্গ এক্সপ্রেসে রায়পুর এসে ট্রেন বদল করতে হবে। কিংবা কোরাপুট-হাওড়া এক্সপ্রেসে ঝাড়সুগুদা এসে সেখান থেকে ট্রেন বদল করা যেতে পারে।

tyda jungle bells
টায়ডা জাঙ্গল বেলস্‌।

কোথায় থাকবেন

বিশাখাপত্তনম, টায়ডা ও আরাকুতে অন্ধ্র পর্যটনের হোটেল আছে। অনলাইন বুকিং করুন www.aptdc.gov.in অথবা যোগাযোগ করতে পারেন অন্ধ্র পর্যটনের কলকাতা অফিসে – ৪/১ সিকিম হাউস, মিডলটন স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০৭১। টেলি/ফ্যাক্স- ০৩৩ ২২৮১৩৬৭৯, মোবাইল ৯৪৩৩০৪৪৫৮৪।

জগদলপুরে ছত্তিসগঢ় পর্যটনের কোনো হোটেল না থাকলেও, ৩৮ কিমি দূরে চিত্রকোটে রয়েছে দনদমি লাক্সারি রিসর্ট। অনলাইন বুকিং cgtourism.choice.gov.in

টায়ডা ছাড়া সব জায়গাতেই বেসরকারি হোটেল রয়েছে। make my trip, goibibo, yatra.com, triviago.in ইত্যাদির মতো ওয়েবসাইটগুলিতে সন্ধান পাবেন।

train journey to araku
ট্রেনে আরাকু।

কী ভাবে ঘুরবেন

(১) বিশাখাপত্তনম থেকে রুটের বাসে বা অটোয় চলে যেতে পারেন রামকৃষ্ণ বিচ, ডক লাগোয়া থ্রি হিলক্স, সিমাচলম-সহ বিভিন্ন দ্রষ্টব্য স্থানে। তবে অনেক জায়গায় পাহাড় শিরে যায় না বাস বা অটো। পায়ে হেঁটে ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। সে ক্ষেত্রে গাড়ি ভাড়া করে নেওয়াই সুবিধা।

(২) অন্ধ্র পর্যটন কন্ডাক্টেড ট্যুরে বিশাখাপত্তনমের দ্রষ্টব্য দেখিয়ে আনে। বিশদ তথ্যের জন্য যোগাযোগ Central Reservation Office, 46/A RTC Complex, Visakhapatnam 16, ph 0891-2788820, 9848813584. IRO Office 0891-2788821, 9848813585, Airport Counter – 0891-2788828, 9705173400 ।

road to araku
আরাকুর পথে।

(৩)  টায়ডা সড়কপথে বিশাখাপত্তনম থেকে ৭৫ কিমি। ট্রেনে না গিয়ে বিশাখাপত্তনম থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করে চলে আসুন টায়ডা। ওই গাড়িতেই দেখে নিন বোরা গুহা সহ বিভিন্ন দ্রষ্টব্য। পরের দিন ওই গাড়িতেই ৩৮ কিমি দূরের আরাকু গিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিন।

(৪) আরাকুর দ্রষ্টব্য স্থানীয় গাড়ি ভাড়া করে দেখে নিন।

(৫) স্থানীয় গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে নিন জগদলপুর।

মনে রাখবেন

(১) সিমাচলমের মন্দির দুপুর ২টো থেকে ৩টে পর্যন্ত বন্ধ থাকে।

(২) ইয়ারাডা সৈকত নৌবাহিনীর এলাকাভুক্ত। সৈকতে যাওয়ার জন্য প্রবেশমূল্য লাগে। প্লাস্টিক, খাবারের মোড়ক, জলের বোতল ফেলা দণ্ডনীয় অপরাধ।

yarada beach
ইয়ারাডা সৈকত।

(৩) আরাকুর আদিবাসী মিউজিয়াম এবং পদ্মপুরম হর্টিকালচার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা, মাঝে ১২টা থেকে ১টা বন্ধ।

(৪) বস্তারের আদিবাসী হাট বিখ্যাত। আদিবাসী জীবনধারার সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়। তাদের হাতে তৈরি শিল্পসম্ভারের নিদর্শন দেখা যায়। জগদলপুরের আশেপাশের গ্রামগুলিতে সপ্তাহের বিভিন্ন দিনে হাট বসে। হাতে সময় থাকলে এ রকম এক-আধটা হাট ঘুরতে ভালো লাগবে।

(৫) মাওবাদী অধ্যুষিত হওয়ায় জগদলপুরে যে হোটেলে থাকবেন সেখানে বস্তার অঞ্চলের রাস্তাঘাট সম্পর্কে খোঁজখবর করে নেবেন।

(৬) আরাকু এবং ছত্তীসগঢ়ে ভালোই ঠান্ডা থাকবে। যথেষ্ট শীতবস্ত্র সঙ্গে রাখবেন। গুহা দেখার জন্য টর্চ রাখবেন।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here