flসৃজিতা সরকার

ভেবেছিলাম পুজোর সময় ছুটি নিয়ে কলকাতা যাব, তা সে না পেলাম ছুটি, না হল কলকাতা যাওয়া। বেঙ্গালুরুর হোয়াইটফিল্ডের বাসিন্দা আমি। অনেকদিন থেকেই শুনছিলাম হোয়াইটফিল্ডের আউটার রিং রোডের পার্কে জমিয়ে দুর্গাপুজো হয়। সেই হোয়াইটফিল্ডের দেবীর দর্শন পেতে খুবই আগ্রহী ছিলাম। তাই দূর থেকে পার্কের গায়ে টুনির রঙচঙে আলো দেখে আপ্লুত হয়ে উঠলাম। কলকাতা থেকে দেড় হাজার কিমি দূরে, সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন রাজ্যে এভাবে দুর্গাপুজো উদ্‌যাপন হবে, তা আমি সত্যি কল্পনা করতে পারিনি।

পার্কের গেটের ওপর প্রান্তে বিশাল প্যান্ডেল। নিপুণ তার কারুকার্য আর অপূর্ব সাজসজ্জা, তবে শুধুই কাপড়ের কুঁচির কাজ। কলকাতার মতন বাঁশের কঞ্চির, কড়ির বা নিত্য প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস দিয়ে নয়। প্যান্ডেলের মধ্যে বিশাল বেদী, তার ওপর যথাযথ ভঙ্গিমায় মা দুর্গা। সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিক। পার্কের চারিদিক ঘিরে নাগরদোলা আর খাবারের রকমারি স্টল। শুধু নাগরদোলা আছে বললে ভুল হবে, আছে বাচ্চাদের জন্য আরও অনেক রাইড, ঠিক যেন আমাদের নিকো পার্কের মতন। এবং এই রাইডস ঘিরে ভিড় করে আছে প্রচুর উৎসুক কচি-কাঁচা আর তাদের বাবা-মায়েরা। রাইডস-এর উল্টো দিকে গোল করে ঘিরে রয়েছে প্রচুর খাবারের স্টল। পাঁপড় থেকে শুরু করে ফিশ-ফ্রাই, চিকেন কাটলেট, রোল, এমনকি আমাদের ট্রেডমার্ক বিরিয়ানি আর চাঁপ-এর গন্ধও ভেসে এল নাকে, আছে রসগোল্লা, সন্দেশ আর শোনপাপড়িও। ঘুরতে ঘুরতে গলা শুকিয়ে গেলে তার ব্যবস্থাও আছে। আখের রস, ফলের রস আর টক-মিষ্টি গোলা। এবং যেহেতু কোনো মেলা-ই ঠিক মেলা হয় না যতক্ষণ না সেখানে ‘বুড়ির পাকাচুল’ আর পপকর্ন থাকে, তাই তারও অভাব এখানে নেই।

bang-durga-2
দুর্গাপুজো উপলক্ষে মেলা বসেছে হোয়াইট ফিল্ডের পার্কে।

পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম একেবারে বেদির সামনে। পুজোর সামগ্রী সাজানো। দেখলাম সাদা ফুল, জবা বা অপরাজিতা ফুল, কোনোটাই নেই। সবই বড়ো বড়ো গাঁদা ফুল আর তার মালা। পুজোর বাসনও সব স্টিলের, কাঁসা বাঁ পিতলের নয়। দেখলাম দুই বাঙালি কর্তা পুজোর বাজার করে ফিরলেন।  দু’ জন বাঙালি পুরোহিত পুজোর কাজে ব্যস্ত। তাঁদের সাহায্য করছেন দুই কন্নড় মহিলা। আবার এক তামিল মহিলাকে দেখলাম আলপনা দিতে ব্যস্ত। অবাক হলাম। এই কিছু দিন আগেই তো কাবেরী নদীর জল ভাগাভাগি নিয়ে তামিল ও কন্নড়ভাষীদের মধ্যে লাঠালাঠি চলছিল, তবে কি মা দুর্গার আগমনে সব রেষারেষির অবসান হল?

bang-durga-1
ঠাকুর দেখার লাইন। হোয়াইট ফিল্ডের দুর্গাপুজোয়।

পার্কের মাঝখানে প্রায় শ’ দুয়েক চেয়ার পাতা। পাশে বড়ো বড়ো সাউন্ড-বক্স, জেনারেটর, সব রয়েছে। বোঝাই গেল বিরাট জলসার আয়োজন। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, রাত করেই শুরু হবে জলসা, চলবে ভোর পর্যন্ত।

বেঙ্গালুরু এসেও কলকাতার পার্ক সার্কাসের পুজোর অনুভূতি। মন চাইছিল না, এখান থেকে চলে যেতে। মাইকে তখন গান হচ্ছে তামিল ভাষায়। পরবর্তী গান অরিজিৎ সিংহের ‘রঙ দে তু মোহে গেরুয়া’।

উঠব উঠব করছি, ওমা! এবার মাইকের গান ‘শেষ কোথায়, শেষ কোথায়, কী আছে শেষে পথের?’ তামিল, হিন্দি, বাংলা – সব গানই বেজে চলেছে এক সঙ্গে। সত্যি জানি না, এর শেষ কোথায়। শুধু মনে হল, ‘সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থনীরে/আজি ভারতের মহামানবের সাগরতীরে’।        

 

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন