Photo Shape Editor: https://www.tuxpi.com/photo-effects/shape-tool

ঢাকা থেকে ফারুক ভূঁইয়া রবিন

একুশ মানেই গর্ব। একুশ মানে মাথা নত না করা। একুশ মানেই ভাষার জন্য ত্যাগ স্বীকার করা বাঙালি জাতির বিশুদ্ধ অহংকার। আর ভাষার মাসে একুশের চেতনাকে ধারণ করে ভাষা শহিদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধার মূর্ত প্রকাশ অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বইপ্রেমী প্রতিটি বাঙালির অপেক্ষার প্রহর ফুরায় ফেব্রুয়ারি এলেই, শুরু হয় মাসব্যাপী বইমেলা। লেখক-পাঠক-প্রকাশকের মিলনমেলায় পরিণত হয় বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।

বাংলাদেশে বইমেলার প্রচলনের কথা জানতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ষাটের দশকের শেষ দিকে। কথাসাহিত্যিক ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সর্দার জয়েনউদ্দীনের হাত ধরেই বাংলাদেশে বইমেলার গোড়াপত্তন। তবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বইমেলার ভিত রচনার জন্য আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয় একটি নাম — চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৭২ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তধারা প্রকাশনীর স্বত্ত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে চাটাই বিছিয়ে বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন। আর সেখানেই ১৯৮৪ সালে বইমেলার আনুষ্ঠানিক রূপ দেয় বাংলা একাডেমি, যার নামকরণ হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। ৮০-র দশকে সামরিক শাসনে বাংলাদেশ যখন অবরুদ্ধ, তখন এই বইমেলা হয়ে উঠেছিল মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক-চর্চার প্রাণকেন্দ্র।

এর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সময়ের পরিক্রমায় বইমেলা হয়ে ওঠে বাংলাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক অঙ্গ। আর মাসব্যাপী বইমেলা বিশ্বে সত্যিই নজিরবিহীন। দীর্ঘ একটা সময় বইমেলা সীমাবদ্ধ ছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণেই। তবে বিগত কয়েক বছর ধরে ব্যাপ্তি বেড়ে বইমেলা হচ্ছে একাডেমির সামনে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও।

Ekushe Boi Mela_01

এ বারের বইমেলায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক বাংলা একাডেমির গৌরব ও ঐতিহ্যের ৬০ বছর। তাই এ বার বইমেলায় থিম রাখা হয়েছে বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী। এ ছাড়া বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী স্মারক হিসেবে এ বার ৪০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন নির্মাণ করা হয় ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউজের আদলে।

গত বারের তুলনায় অমর একুশে গ্রন্থমেলার পরিসর এ বার বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। গত বার যেখানে বইমেলার ব্যাপ্তি ছিল আড়াই লাখ বর্গফুট, এ বার সেখানে বইমেলার জায়গা ৪ লাখ ৭৮ হাজার বর্গফুট। লেখক-পাঠকরা যাতে বিড়ম্বনা এড়িয়ে স্বস্তি নিয়ে বই দেখতে পারেন এবং কিনতে পারেন, সে দিক বিবেচনা করেই বাড়ানো হয়েছে মেলার পরিধি।

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে রয়েছে বাংলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, মুক্তধারা প্রকাশনী, উন্নয়ন সংস্থা, গণমাধ্যম-সহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ৮২টি প্রতিষ্ঠানের ১১১টি স্টল। বর্ধমান হাউজের দক্ষিণ পাশে লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে রয়েছে ৯২টি লিটন ম্যাগাজিনের স্টল। বইমেলার এ কর্নারটি তরুণ লেখকদের আড্ডাস্থলও বটে।

Ekushe Boi Mela_006

আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রয়েছে ৩২০টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ৫৪০টি ইউনিট। এখানে বাংলা একাডেমি-সহ ১৪টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৬ হাজার বর্গফুট আয়তনের ১৫টি প্যাভিলিয়ন। বিশাল উদ্যানে চোখ রাখলে দেখা যাবে শুধু বই আর বই। আর গাছগাছালির তলায় মনোরম পরিবেশে সাজানো স্টলগুলোতে রয়েছে নান্দনিকতার ছাপ। বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশকে সাজানো হয়েছে ১৫টি চত্বরে। চত্বরগুলো নামকরণ করা হয়েছে ভাষাশহিদ আবুল বরকত, আবদুস সালাম, শফিউর রহমান, রফিকউদ্দীন আহমদ, আবদুল জব্বার, শহিদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, আলতাফ মাহমুদ, সিরাজুদ্দীন হোসেন, ডা. আলীম চৌধুরী, সেলিনা পারভীন, শিশুসাহিত্যিক সাজেদুল করিম, হাবীবুর রহমান, ফয়েজ আহমদ এবং রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই-এর নামে।

বইমেলা শুধু পরিসরে বাড়ার মধ্যেই আটকে নেই। পাল্লা দিয়ে প্রতি বছরই বাড়ছে বইয়ের সংখ্যা, প্রকাশকের সংখ্যা, বই বিক্রির সংখ্যা। বাড়ছে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র-শনিবার কিংবা বিশেষ দিনগুলোতে যা রূপ নেয় বাঁধভাঙা জনস্রোতে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও যে ছাপা বইয়ের চাহিদায় মোটেও ভাটা পড়েনি, তার উজ্জ্বল প্রমাণ একুশে বইমেলা। বইমেলাকে ঘিরে মানুষের আবেগ, মনোযোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে, বেড়ে চলেছে বইমেলাকে ঘিরে জনসমাগম। ছুটির দিন বাদে প্রতি দিন বইমেলা খোলা থাকছে বিকেল ৩টে থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আর ছুটির দিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। ২১ ফেব্রুয়ারি মহান ভাষা দিবসে মেলা চলবে সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।

প্রতি বছরই সাধারণত হাজার তিনেক নতুন বই বইমেলায় এসে থাকে। তবে এ বার মেলার প্রথম ১৫ দিনেই নতুন বইয়ের সংখ্যা ১৭শো ছাড়িয়ে গেছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে প্রতি দিনই নতুন নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচিত হচ্ছে। মেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বই ৩০ শতাংশ কমিশনে বিক্রি হয়। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করে।

মাসব্যাপী অমর একুশে বইমেলা কেবল বই বিক্রিবাট্টা কিংবা বাণিজ্যিক লাভালাভের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বইপ্রেমী বাঙালির সাংস্কৃতিক উৎসবও বটে। আর সেখানে সাংস্কৃতিক আমেজ না থাকলে কী হয়! তাই তো বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের মঞ্চে প্রতি দিনই বিকেলে আয়োজিত হচ্ছে আলোচনাসভা। যেখানে বিদগ্ধজনেরা কথা বলেন ভাষা-সাহিত্য, বাংলা ও বাঙালির অর্জন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রাম, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন-সহ জাতীয়-আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে। আর সেই একই মঞ্চে সন্ধ্যা নামলেই দর্শকরা উপভোগ করেন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এ ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চে প্রতি দিনই মঞ্চস্থ হয় নাটক।

এরই মধ্যে ৩ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব। যেখানে অংশ নেন স্লোভাকিয়া, মরক্কো, সুইডেন, তাইওয়ান, যুক্তরাজ্য, ভারত এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রজন্মের কবিরা।

বইমেলাকে ঘিরে মানুষের আবেগ ও উৎসব আমেজের কারণে লেখক-সাহিত্যিকদের অনেকেই একে বাঙালির বই-পার্বণ বলে থাকেন। আর এই বইমেলাই অপশক্তির বিরুদ্ধে বাঙালির সদা জাগ্রত চেতনায় মূর্ত প্রতীক। আমাদের চিন্তন ও মনন উদ্ভাসিত হওয়ার উপলক্ষ। নতুন ও তরুণ লেখকদের সামনে নিজেদের সৃজনশীলতা তুলে ধরার অপার সুযোগ হল বইমেলা।

Ekushe Boi Mela_11

ভাষা আন্দোলনের চেতনার প্রবাহমান স্রোত একুশে বইমেলা বাংলাদেশের প্রজ্ঞা ও প্রগতিশীল চেতনার বাতিঘর। এখান থেকেই জন্ম নেয় আঁধারের বিরুদ্ধে আলোর লড়াইয়ের প্রেরণা। তাই এই বইমেলাকে মৌলবাদীদের নিশানাও হতে হয়েছে। গত বছরই বইমেলার প্রবেশমুখ টিএসসি মোড়ে মৌলবাদীদের হামলায় নিহত হন বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়। এর আগে ২০০৪ সালে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর মৌলবাদীদের হামলার শিকার হন প্রগতিশীল লেখক হুমায়ুন আজাদ। তাই এ বার বইমেলাকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। বইমেলায় প্রবেশমুখ ও আশেপাশে মোতায়েন আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য, মেলায় প্রবেশের প্রতিটি পয়েন্টে রয়েছে চেকপোস্ট, মেলার ভেতরে ও আশেপাশের এলাকায় বসানো হয়েছে দুই শতাধিক ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা।

তবে যতই হুমকি আসুক, বইমেলায় প্রতি বছরই রোজ মানুষের ঢল নামবে। আর এ জনস্রোতের কাছেই হার মানবে আঁধারের সব অপশক্তি। বইমেলা বাংলাদেশের মানুষের আলোকবর্তিকা, এখানে জড়িয়ে আছে বাঙালির জাতীয় আবেগ। এখান থেকেই আলোর স্ফুরণ ছড়িয়ে পড়বে বইপ্রেমী প্রতিটি মানুষের মনে। আর সব ধরনের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে বইমেলা হয়ে থাকবে বাঙালির প্রাণের মেলা। বিভিন্ন বয়সের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হওয়া বইমেলা সমাজকে দেবে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মন্ত্র।



মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here