wrivu

শ্রয়ণ সেন:
কফি হাউসের আড্ডা শুধু মান্না দের কালজয়ী গানেরই সাক্ষী নয়, সাক্ষী আরও অনেক কিছুরই। শহরের বুদ্ধিজীবীদের মিলনক্ষেত্র রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক চর্চার জায়গা এই কফি হাউসই সাক্ষী শহরের গর্বের বইমেলার।
১৯৭৪-এ কলেজ স্ট্রিট বই পাড়ার এক দল তরুণ প্রকাশকের আড্ডায় উঠে আসে বইমেলার প্রস্তাব। তাঁদের চর্চার বিষয় ছিল, কী ভাবে প্রকাশনা ব্যবসাকে আরও জোরদার করা যায়, বইপ্রেমীদের বাংলা বইয়ের আরও কাছে টানা যায়। শুধু বই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে আয়োজিত বিশ্বের সব চেয়ে বড় মেলার প্রসঙ্গ উঠে এল। এই প্রস্তাবে সমর্থন যেমন ছিল, বিরোধিতাও ছিল। তরুণরা যতই বইমেলার প্রস্তাবে রাজি ছিলেন, প্রবীণরা তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বই কখনওই মেলায় বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়। কিন্তু কোনও কিছুতেই তরুণদের টলানো গেল না। শুরু হয়ে গেল বইমেলার প্রস্তুতি। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ১৯৭৫-এ প্রকাশকদের নিয়ে গঠিত হল ‘পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ড’। প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হলেন সুশীল মুখার্জি, জয়ন্ত মনকতলা হলেন প্রথম সাধারণ সম্পাদক।
এল সেই দিন। ৫ মার্চ, ১৯৭৬। ৫৬টি স্টল আর ৩৪ জন প্রকাশককে নিয়ে কলকাতা বইমেলার পথ চলা শুরু। ৫০ পয়সা প্রবেশমূল্য নিয়ে বিড়লা তারামণ্ডলের উল্টো দিকে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল–এর লাগোয়া মাঠে আয়োজিত প্রথম বইমেলা উদ্বোধন করেন তৎকালীন রাজ্যপাল এ এল ডায়াস ও শিক্ষামন্ত্রী মৃত্যুঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতায় বইমেলা আয়োজন করার পাশাপাশি গিল্ড এ বছরই বিশ্ব বইমেলা আর ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলাতেও অংশগ্রহণ করে। ধীরে ধীরে আরও বড় হতে শুরু করে বইমেলা। সাহিত্যসভা, সেমিনার-সহ আরও নানা অনুষ্ঠান জায়গা করে নিল বইমেলার সূচিতে। বিদেশের কোনও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের আদলে তৈরি হওয়া শুরু হল বইমেলার প্রবেশদ্বার আর গিল্ড অফিস তৈরি হত দেশের কোনও ঐতিহাসিক স্থাপত্যের আদলে। ১৯৮৩ সালে মেলা সরে এল আরও বড় জায়গায়, রবীন্দ্র সদনের বিপরীতে এখন যেখানে ‘মোহরকুঞ্জ’, সেখানে। সে বছরই শহরের প্রাণের মেলা পেল এক গর্বের স্বীকৃতি। মেলার উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থার (আইপিএ) সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি কথা বললেন গিল্ড সদস্য অশোক ঘোষের সঙ্গে। কলকাতা বইমেলার মাথায় উঠল ‘আন্তর্জাতিক’ তকমা। বইমেলা জায়গা করে নিল আইপিএ-র ক্যালেন্ডারে। আনন্দের মুহূর্তেও আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর প্রধান সম্পাদক অশোক সরকারের মৃত্যুতে নেমে আসে শোকের ছায়া। বক্তৃতার মধ্যে হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন তিনি।
আরও নতুন নতুন প্রকাশনাসংস্থা আসতে শুরু করায় পুরনো জায়গায় আর কোনও ভাবেই বইমেলা করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই ১৯৮৮-তে বইমেলা পেল নতুন এক জায়গা। পার্ক স্ট্রিট আর আউটরাম রোড সন্নিহিত এলাকায় ময়দানের একটি পরিত্যক্ত জমিতেই শুরু হল বইমেলা। ভবিষ্যতে গিল্ড এই জায়গাটিকে নিজের খরচেই ভালো করে গড়ে তোলে।
১৯৯১-তে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার আদলে কলকাতা বইমেলাতেও চালু হল ফোকাল থিম। প্রথম বার ফোকাল থিম ছিল অসম। পরবর্তী বছরগুলিতে ফোকাল থিম হিসেবে যথাক্রমে ওডিশা, ত্রিপুরা, বিহার আর পশ্চিমবঙ্গকেও তুলে ধরা হয়েছিল মেলায়। ফোকাল থিমের উদ্দেশ্য ছিল, যে বছর যে রাজ্য ফোকাল থিম সে বছর সেই রাজ্যের সংস্কৃতিকে তুলে ধরা।

১৯৯৭-তে বিদেশি রাষ্ট্রকে প্রথম বার ফোকাল থিম করা হয় কলকাতা বইমেলায়। কলকাতা বইমেলা যেন প্রথম বার প্রকৃত ‘আন্তর্জাতিক’ চেহারা নিল। সে বার উদ্বোধনমঞ্চকে আলোকিত করেছিলেন বিখ্যাত ফরাসি সাহিত্যিক জাঁক দেরিদা। সব চেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনার সাক্ষীও এই বছরের মেলা। ষষ্ঠ দিনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে যায় মেলায়। আগুনের গ্রাসে পুড়ে ছাই এক লক্ষের ওপর বই। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় এক জনের। তবে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে, হতাশা কাটিয়ে উঠে মাত্র তিন দিনেই ফের নতুন করে শুরু হয় মেলা। পরবর্তী বছরগুলিতে মেলার ফোকাল থিম হয় গ্রেট ব্রিটেন, বাংলাদেশ, ব্রাজিল, হল্যান্ড, কিউবা, চিলি, স্পেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, স্কটল্যান্ড, মেক্সিকো, ইতালি, পেরু, বোলিভিয়া আর এ বছর এল কোস্তা রিকা। ১৯৯৯-এ বইমেলার অতিথি হয়ে এলেন ‘সিটি অফ জয়’ খ্যাত ডোমিনিক ল্যাপিয়ের আর ২০০৫-এ বইমেলাকে আলোকিত করলেন জার্মান সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাস। এ বারই ময়দানে বইমেলা করার বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেন পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত। সুভাষবাবু দাবি করেন, যথেচ্ছ খোঁড়াখুঁড়ি, মাঠের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুতের তার নিয়ে যাওয়া, খাবারের স্টলে রান্নাবান্না আর মানুষের পায়ের ধুলোর জন্য দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।
মামলা জিতলেন সুভাষবাবু। ময়দানে সব ধরনের মেলা বন্ধ করার নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। কিন্তু তৎকালীন রাজ্য সরকারের এক বছরের রেহাইয়ের আর্জি মেনে হাইকোর্ট ২০০৬-এ ময়দানে বইমেলা করার অনুমতি দেয়। উল্লেখ্য ২৫ লক্ষ মানুষের উপস্থিতি আর ২২ কোটি টাকার ওপর বই বিক্রিতে আগের সব রেকর্ড ছাপিয়ে যায় এ বারের মেলা। বইমেলা ময়দানেই থাকুক এই দাবিতে সই সংগ্রহ অভিযান হয়। কিন্তু ২০০৬-এই শেষ বারের জন্য মেলা দেখল শহরের গড়ের মাঠ। ২০০৭-এ বইমেলার প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে তখনই পরিবেশবিদদের করা জনস্বার্থ মামলায় (পিল) মেলা শুরু হওয়ার আগের দিন কলকাতা হাইকোর্ট রায় দিল কোনও ভাবেই বইমেলা ময়দানে আর করা যাবে না। বিকল্প জায়গা হিসেবে পার্ক সার্কাস ময়দানকে ভেবে রাখা হলেও কোর্টের রায় তার বিরুদ্ধেও গেল। স্থায়ী জায়গার অভাবে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ২০০৭ আর ২০০৮-এর বইমেলা। কিন্তু জায়গা কম থাকায় অন্য বারের তুলনায় বই বিক্রি অনেক কম হয়েছিল।
দীর্ঘ টালবাহানার পর বইমেলা পেল তার স্থায়ী জায়গা। ২০০৯-এ সায়েন্স সিটির কাছে মিলনমেলার মাঠে উদ্বোধন হল তেত্রিশতম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার। প্রথম বার প্রকাশিত হল বইমেলার থিম সং, ‘ওই ডাকছে বই’। বইয়ের ডাকে নতুন জায়গাকে আপন করে নিলেন মানুষজন। ২০০৯-এর মিলনমেলার মাঠ আর এখনকার মাঠের মধ্যে বিস্তর ফারাক। সে বারের অপ্রস্তুত মাঠ এখন একেবারে সর্বাঙ্গসুন্দর রূপে হাজির। তৈরি হয়েছে চারটি স্থায়ী ইনডোর হল, স্থায়ী গিল্ড অফিস। স্থায়ী টয়লেট আর স্থায়ী ফুড কোর্টও হয়েছে মেলায়। বইমেলার পালকে নতুন সংযোজন কলকাতা সাহিত্যসভা বা ‘কলকাতা লিটারেচার ফেস্টিভাল’। জয়পুর লিটেরারি মিট আর এডিনবরা লিটারেচার ফেস্টিভাল-এর আদলে তিন দিনের এই ‘মিট’ শুরু হয় ২০১৪-এর বইমেলায়।
অনলাইন শপিং-এর যুগেও মানুষের মধ্যে কলকাতা বইমেলার প্রতি আবেগ আর ভালোবাসা এখনও আগের মতোই অটুট। ১৯৭৪-এ মাত্র কয়েক জন তরুণের মস্তিষ্কপ্রসূত এই মেলা আগামী দিনে বিশ্বের দরবারে আরও প্রতিপত্তি ছড়াবে এই আশা করাই যায়।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here