টরন্টোয় ‘ভায়োলেন্স এগেনস্ট উইমেন’-এর সক্রিয় কর্মী রুবিনা চৌধুরী। বর্ণবাদ নিয়ে ধারাবাহিক লিখছেন খবরঅনলাইনে।

আমার  খয়েরি চামড়ায় একটু সাদা অংশের প্রতুলতা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রথম পা রাখলাম কালোদের মাঝে। যুক্তরাষ্ট্রের চাইতে কানাডায় কালো বর্ণের মানুষের উৎপত্তি ভিন্ন, তবে চালচলন মিশ্রিত। কানাডার কালো বর্ণের সমাজকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়; কালো বর্ণের কানাডিয়ান বা আফ্রিকান কানাডিয়ান, যারা আফ্রিকান আমেরিকানদের গোত্রেরই, অতীতে ব্রিটিশ এবং ফরাসিরা যাদের দাসত্বের উদ্দেশ্যে উত্তর আমেরিকার ভূখণ্ডে এনেছিল আফ্রিকা মহাদেশ থেকে, এদের সাথেই আছে আফ্রো ক্যারিবিয়ান এবং মূল আফ্রিকা থেকে সরাসরি অভিবাসী বা উদ্বাস্তু হয়ে এ দেশে বসবাস করছে।

কর্মসন্ধান এবং কর্মসংস্থানের পালায় প্রথম অভিজ্ঞতা, কালো বর্ণের নারী। যাদের শারীরিক শক্তিমত্তা বাঙালিদের কাছে ঈর্ষণীয়। অক্লান্ত পরিশ্রম এবং তার সাথে নাচে গানে মেতে ওঠা কখনও কখনও আমার ক্লান্ত দেহে শক্তি ফিরিয়ে দেয়। মনে ক্লান্তি জমা হলেই শত কষ্টের মাঝেও আনন্দের বৃষ্টি নামিয়ে তরতাজা করে তোলে। অবসন্ন মন আর পরিশ্রান্ত দেহের বিষণ্ণতা দূরে রেখে প্রফুল্ল থাকতে হয়। নিজের অলক্ষ্যেই পাঠ নিতে শুরু করেছিলাম। অস্বীকার করার উপায় নেই যে মন খারাপের জাতিগত বদ অভ্যাস যেন বাঙালির পিছু ছাড়ে না।

আরও একটি দিক দেখে অবাক হয়েছি। শরীরের বিশালতার কারণে যেমন খাওয়াদাওয়া খুব পছন্দের বিষয়, তেমনি খাওয়াতেও খুব পছন্দ করে ওরা। কালোদের অনুষ্ঠান বলতেই বাহারি খাবারের প্রাচুর্যতা। এমন নয় যে এর জন্য ব্যাংক-ভরা অর্থ থাকতে হবে ওদের। ক্যালোরির আধিক্য বা মুটিয়ে যাওয়ার কোনও তোয়াক্কা নেই ওদের। পেট আর মন ভরে খাও, পড়াশোনা আর কাজ করো, এই ওদের মধ্যবিত্ত জীবনের হালচাল। যুক্তরাষ্ট্রে তো মিশেল ওবামা ওদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে গোত্রের স্থূলাঙ্গতা, চেষ্টা করেছে খাদ্যাভ্যাস বদলের। ওদের কথা শুনে এটুকু বুঝেছি, ওরা মনে করে জিরো ক্যালোরি খাবার খেয়ে জিরো সাইজের কাপড়ে নিজেকে ধরে রাখা শুধু মডেলকন্যা আর অভিনেত্রীদের জন্য। কৌতুকপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিষয়টি তুলে ধরে। বলা বাহুল্য, এই কারণে উত্তর আমেরিকায় সাদা বর্ণের চাইতে কালো বর্ণের খাবারের স্বাদ লোভনীয়। গত তিন বছরে বিষয়টি খেয়াল করেছি, কালোদের উৎসবে সাদাদের আনন্দ করে খাওয়ার তৃপ্তিতে। আফ্রো ক্যারিবিয়ানদের খাবার তো সকলের প্রিয়, বিশেষ করে ওদের জার্ক মাংস এবং ভারতীয় আদলে আফ্রিকান খাবার। ঔপনিবেশিকতার কারণেই বিভিন্ন সময়ে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে আফ্রিকা, ভারত উপমহাদেশ, মধ্যপ্রাচ্য, চিন, পর্তুগিজ, হিস্পানিক, উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী-সহ বিভিন্ন গোত্রের মানুষ পাড়ি জমিয়েছিল জীবিকার খোঁজে, অথবা ঔপনিবেশিকতার কারণে স্থানান্তরিত হয়েছিল। অনেকের নামে মনে মনে যখন ধরে নিই সে উপমহাদেশীয়, তখন কথায় কথায় জানা হয়ে যায় তারা ক্যারিবিয়ান। বিশেষ করে সিং, খান, প্যাটেল পদবিগুলোতে আগে অবাক হতাম। বেশির ভাগ বৈবাহিকসূত্রে সঙ্কর, চেহারা ভারতীয় আদল থাকলেও গাত্রবর্ণে কালোর আধিক্যে আজকাল বুঝে নিই। যেমন নানা দেশ থেকে নানা জাতি উপনীত হয়েছে সেখানে, তেমন খাবারেও মিশেছে পাঁচমিশেলি ভাব। যাকে শুধু খাদ্য মনে হয় না; অদ্ভুত এক নৈকট্যের আবেদন রাখে, আস্বাদে অঞ্চলভেদে নিজের দেশের অনুভূতির তৃপ্তি পায়। সেই জন্য পৃথিবীময় ক্যারিবিয়ান খাবারের এত চাহিদা। খাদ্য এবং পোশাকও সংস্কৃতির অঙ্গ, তাই বৈচিত্রতায় উন্নত হয়। সেই কারণে ক্যারিবিয়ান খাবারের জনপ্রিয়তার আচ্ছন্নতায় ঢাকা পড়েছে মূল আফ্রিকানদের খাবার, ইথিওপিয়ান কয়েকটি রেস্তোরাঁ চোখে পড়লেও তেমন একটা মিশতে পারেনি মূলধারার সংস্কৃতিতে। কিন্তু ওদর একত্রিতভাবে দেখা যায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে।

অত্যন্ত অমায়িক, কর্মঠ আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের নারীরা সাংস্কৃতিক ভাবেই অবদমিত, ঠিক দক্ষিণ এশীয় নারীদের মতোই। কিন্তু পার্থক্য একটাই। আফ্রিকানদের নিজেদের অভ্যস্ত খোলস থেকে বের করে আনতে কম বেগ পেতে হয় ভারতীয়দের তুলনায়, তাদের মানসিক গ্রহণ-ক্ষমতার কারণে, যার ভিত্তি তাদের সাংস্কৃতিক উম্মুক্ততা। উপমহাদেশীয় নারীসমাজই তাদের অবদমন অবস্থাকে অহঙ্কারে অগ্রাধিকার দেয়। বাহ্যিক আধুনিকতার আভরণে লালন করে লক্ষ বছরের গল্পভিত্তিক দমননীতিতে। ধর্মের তারতম্যে সেই গভীরতম সমস্যার সামাজিক অবস্থার সামান্যতম তারতম্য ঘটেনি। (চলবে)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here