নন্দিতা আচার্য চক্রবর্তী

মহা উৎসাহে হই হই করে শুরু হয়ে গেল তেইশতম চলচ্চিত্র উৎসব। দেশ বিদেশের এক গুচ্ছ রঙ্গিন ঝলমলে ছবি।  নামী পরিচালকদের সঙ্গে রয়েছেন বহু অনামি  পরিচালকও। বিদেশি ছবির সঙ্গে এসেছে বাংলা এবং নানা আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত কিছু সিনেমা। এ ছাড়া থাকছে শর্ট ও ডকুমেন্টারি ফিল্ম।  এই বিভাগে অনেক নতুন পরিচালক তাঁদের কাজ দেখানোর সুযোগ পান। এই লেখায় অবশ্য তিনটে পূর্ণ দৈর্ঘের বিদেশি সিনেমার  কথা বলব।

এবারের ফিল্ম ফেস্টের হাইলাইটেড ডিরেক্টর, গ্রেট ব্রিটেনের মাইকেল উইন্টারবটম।  নন্দন ওয়ানে দেখানো হল তাঁর ছবি, ‘এভরিডে’ । সাতানব্বই মিনিটের ছবি। একটা গানের দলকে নিয়ে গল্প। সবই প্রায় অল্প বয়সি ছেলেমেয়ে। একটা চার্টার্ড বাসে করে ঘুরে ঘুরে তারা ব্রিটেনের বিভিন্ন জায়গায় প্রোগ্রাম করছে। সেই সুত্রে দর্শকের ঘোরা হয়ে যায় অক্সফোর্ড , ম্যানচেস্টার ইত্যাদি বিভিন্ন জায়গায়। চোখে লেগে থাকে সে জায়গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং নগর সভ্যতা। ছবিতে বারে বারে ব্যবহার হয়েছে গান। শুনতে ভালই লেগেছে। দুটি ছেলেমেয়ের মধ্যে হালকা প্রেম এবং শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও উপভোগ করবে দর্শক। তবে মাঝে মাঝে প্রায় অনর্গল চলা হাই ভলিউম এর রিদিম, স্নায়ুর ওপর হালকা চাপ দেয়।

আরও পড়ুন:লস পেরোস: বরাহনগর-কাশীপুরের গণহত্যা নিয়ে এমন ছবি কবে বানাবেন বঙ্গের পরিচালকরা

বেলজিয়ামের ছবি, ‘নিকো,১৯৮৮ ‘ ।   ছবির ডিরেক্টর সুসান্না নিচ্চারেল। এখানেও এক গায়িকার জীবন, বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে টুকরো টুকরো কোলাজ তৈরি করে দেখানো হয়েছে। মাঝবয়সি গায়িকা কখনো  মনে করছে তার দূরে থাকা সন্তানের শৈশব কাল। কখনো কনসার্ট করতে যাবার সময় দীর্ঘ পথের কোন একজায়গায়  সে আবিষ্কার করছে তার যুবক পুত্রকে। বাস্তবেও মা ছেলে এক প্রোগ্রামে পারফর্ম করে। মায়ের সঙ্গে ভায়োলিন সঙ্গতকারী মেয়েটিকে ভাল লাগে তার। কোন এক অজানা কারণে যুবক ছেলেটি হাতের শিরা কেটে আত্মহত্যাও করতে যায়। দর্শকদের স্বস্তি দিয়ে অবশ্য সব ভালর মধ্যে দিয়ে ফিল্মটি সমাপ্ত হয়। মন্দ লাগেনা বেলজিয়ামের এই ছবিটি।

সব শেষে আসি সুইডেনের ছবি ‘স্কোয়ার’ এর কথায়। পরিচালক রুবেন অস্টান্ড। সিনেমাটি  দু ঘণ্টা বাইশ মিনিটের দীর্ঘ এক গল্প। এ গল্প ক্রিস্টিয়ানের। তার অয়ালেট এবং ফোন চুরি হয়ে যায়। এক পিকপকেটার তাকে প্ল্যান দেয় । শেষ পর্যন্ত সে উদ্ধার করতে পারে হারানো জিনিস।  অহং এবং বুদ্ধি মত্তার মধ্যে চিরকালীন সেই দ্বন্দ্ব – ছোট ছোট ঘটনার মধ্যে দিয়ে এখানে বার বার প্রকাশিত হয়েছে।

সুইডিশ কিউরেটর ক্রিস্টিয়ান আবেগ এবং অবদমিত আদর্শের মিশেলে এক জ্যান্ত চরিত্র। ঘটনা এগিয়েছে তাকে ঘিরে। কখনো অয়ালেট উদ্ধারের পর সে উদার হাতে রাস্তায় বসে থাকা ভিখিরিকে ভিক্ষা দিচ্ছে, অথবা অবহেলিত জরাজীর্ণ কোন ভিক্ষুককে তুলে এনে দায়িত্ব দিচ্ছে তার শপিং করা একাধিক ব্যাগ সামলানোর। আবার কখনো তাকে দেখছি সদ্য পরিচিত কোন নারীর সঙ্গে শারীরিক ঘনিষ্ঠতায়।

এই সিনেমায় বার বার এসেছে হাস্যকৌতুক। সে তার চুরি যাওয়া জিনিস খোঁজার অভিযানই হোক অথবা তীব্র যৌনতার পর কনডম নিয়ে টানাটানি – দর্শককে চমকে দিয়ে নির্মল হাসিতে ভাসিয়ে দিয়েছে। সমস্ত ছবিটির অলি গলিতে দাপিয়ে বেরিয়েছে কমেডি এবং স্যাটায়ার। পরিচালক এখানেই থেমে থাকেননি; মানুষের অবচেতনে কামড়ে থাকা আদর্শকে অদ্ভুত মেধায় উদ্ভাসিত করেছেন। তাই শেষ পর্যন্ত ক্রিস্টিয়ান তার অনৈতিক কৃতকর্মের জন্য সোশাল মিডিয়াতে ক্ষমা চায় – স্বীকারোক্তির ভিডিও পোস্ট করে। এ ছবি আবেগ, কমেডি, মেধা এবং মুনশিয়ানার মিশেলে সত্যিই এক অন্য উত্তরণ ঘটিয়েছে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here