Aurora-Borealis
নন্দিতা আচার্য চক্রবর্তী

ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের দ্বিতীয় দিন। তার ওপর আবার রোববার। সারা কলকাতা ভেঙে পড়েছে নন্দন চত্বরে। রবীন্দ্রসদন, নন্দন, শিশির মঞ্চ… সর্বত্রই লম্বা লাইন একেবেঁকে কোথায় যে শেষ হচ্ছে, তা খুঁজে পাওয়া ভার। স্টোভের ওপর বড়ো বড়ো কেটলি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে চা-ওলা। বিকেল গড়িয়ে সন্ধে। পুরোনো সেই বাঁশিওলা মন-কেমন-করা সুর ভাসিয়ে দিচ্ছে, চা-কফির গন্ধ মাখা নন্দনের বাতাসে। রঙিন আলোয় সবই বড়ো মোহময় হয়ে উঠেছে।

‘স্টোরিস অফ লাভ দ্যাট কান্ট বিলঙ টু দিস ওয়ার্ল্ড’ ইতালির ছবি। ডিরেক্টর ফ্রান্সেসা কমেন্সিনি। এ এক ভালোবাসার অবসেসনের গল্প। এক মাঝবয়সি নারী পাগলের মতো প্রেমে পড়ে এক অধ্যাপকের। সে-ও বয়স্ক। তবু তার আভিজাত্য, তার পুরুষোচিত আচরণ এবং তার যৌনতা নারীটিকে প্রেমে উন্মাদ করে তোলে। অথচ ষাটোর্ধ্ব নায়ক পুরুষটির মনের ভেতর ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে প্লেবয় ইমেজ। এক নারী থেকে আর এক নারীতে বয়ে যায় তার প্রেমের ছলাকলা এবং যৌনতা। এ দিকে তীব্র ভালোবাসায় আঘাত পেয়ে নারী হয়ে উঠেছে নারীমুখী। সেখানেই সে আশ্রয় খুঁজেছে। আর তা করতে গিয়ে অজান্তেই ডুব দিয়েছে সমকামিতায়। সদাচঞ্চল নায়ক পুরুষ, অর্ধেকেরও কম বয়সি একটি মেয়েকে বিয়ে করে থিতু হতে চায়। কিন্তু সেখানে যেন কোথায় এক ফাঁকি থেকে যায়। ক্লান্ত পুরুষ ফিরতে চায় তার মাঝবয়সি সেই প্রেমিকার কাছে, যে একদিন জীবনের চেয়েও প্রেমকে বেশি মূল্য দিয়েছিল! কিন্তু দেখা যায়, সমস্ত অবসেসন কাটিয়ে মেয়েটি ফিরিয়ে দেয় তার প্রেমকে।

ফ্রান্সের ছবি, ‘অ্যা জেন্টেল ক্রিয়েচার’। পরিচালক সেরগেই লজনিসসা। অনামী এক নারী তার জেলবন্দি স্বামীর জন্য একটি পার্সেল পাঠায়। কিন্তু সেটি ফিরে আসে।  অসহায় মেয়েটি প্রকৃত কারণ এবং তার সমাধানের জন্য দোরে দোরে ঘুরে বেড়ায়।  এই ঘটনাকে ঘিরে গল্প এগোয়। আমরা দেখতে পাই কমিউনিস্ট আন্দোলনের হাস্যকর অন্তঃসারশূন্যতা, সঙ্গে মেয়েদের এবং সাধারণ মানুষের নিদারুণ অসহায়তা। তবে ছবিটি দেখতে গিয়ে বার বার মনে হয়েছে, ১৪৩ মিনিটের ফিল্মটি, ইচ্ছে করলে  আরও অনেক বেশি কমপ্যাক্ট হতে পারত। অকারণ যেন কিছুটা টেনে বড়ো করা হয়েছে।

‘অরোরা বরেয়ালিজ’ ছবিটির পরিচালক মারতা মেজারস। হাঙ্গেরির সিনেমা। সময় কাল ১০৪ মিনিট। গল্পের শুরু অসুস্থ এক অতি বৃদ্ধাকে নিয়ে। খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে তার মেয়ে এবং যুবক নাতি। আইসিইউ-র বেডে শায়িত মা, সামনে উদ্বিগ্ন মেয়ে ও নাতি। খুঁজে পাওয়া কিছু তথ্য নিয়ে মেয়ে বিভ্রান্ত। বৃদ্ধার চোখের পাতায় তার প্রথম প্রেম এবং মিলনের স্বর্গীয় স্মৃতি। মেয়ে জানে তার বায়োলজিক্যাল ফাদার আর আর আদরে আহ্লাদে বড়ো করে তোলা পিতা – দুই ভিন্ন ব্যক্তি। কিন্তু এই জানার পরেও যে আরও অনেক অজানা তথ্যের জগৎ রয়েছে, তা প্রকাশিত হতে থাকে মায়ের হসপিটালে থাকা এবং সুস্থ হয়ে ফেরার সময়কালটিতে।

আরও পড়ুন : মেধা, স্যাটায়ার, বিনোদনে চলচ্চিত্র উৎসবের প্রথম দিনে নজর কাড়ল ‘দ্য স্কোয়ার’ 

এ গল্প সাম্রাজ্যবাদ, রাজনৈতিক নিপীড়ন, প্রেম এবং অভূতপূর্ব এক ভালোবাসার রূপকথার গল্প। প্রায় কিশোরী মেয়েটি প্রেমিকের সঙ্গে লুকিয়ে বর্ডার পেরোনোর সময়, গুলিতে মৃত্যু হয় প্রেমিকের। এর পর চলে মেয়েটির ওপর নৃশংস ধর্ষণ। কোনো ক্রমে পালিয়ে, এডিথ নামে এক অচেনা মেয়ের হাত ধরে সে ফিরে পায় নির্ভেজাল ভালোবাসা এবং সে দেশের নাগরিকত্বের লাইসেন্স। বান্ধবী এবং সে, একই সঙ্গেও প্রেগন্যান্ট হয়। কিন্তু এ সন্তানের বাবা কি সেই রাক্ষসদের কেউ? এডিথ বোঝায়, এই নিষ্পাপ শিশু তার নিজেরও আত্মার অংশ। এডিথের প্রেমিক যুদ্ধরত দেশটির সৈনিক। সময়কাল ১৯৫৩। যুদ্ধ এবং রাজনীতির ধোঁয়াশায় আচমকা নিখোঁজ হওয়া প্রেমিককে খুঁজতে যায় সে। তার সন্তানের দায়িত্ব তুলে দেয় মেয়েটির হাতে। পুলিশ এসে ফেরত চায় সেই সন্তানকে। মেয়েটি কাঁপা হাতে নিজের সন্তানকে তুলে দেয় তাদের হাতে, সঙ্গে দেয় ছোট্টো এক টেডি। কারণ সে এডিথকে কথা দিয়েছে, জীবন দিয়েও তাদের মেয়েকে রক্ষা করবে। তার পর জীবনভর মানুষ করে গিয়েছে এডিথের মেয়েকে আর অনুশোচনায় দগ্ধে দগ্ধে চুপি চুপি খুঁজে গিয়েছে নিজের মেয়েকে। শেষ পর্যন্ত তার মেয়ে-জামাই খুঁজে বার করে মঙ্গোলিয়ান মুখের আদলের, টেডি হাতে সেই মেয়েটির ছবি। ধর্ষকদের মধ্যে অগ্রণী ছিল এই মঙ্গোলীয় মুখ। বৃদ্ধা শান্তিতে চোখ বোজে।

এ গল্প আমাদের ভেতরের সমস্ত কোমল অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে। সব মিলিয়ে এ সিনেমার গল্প এবং আনুষঙ্গিক সমস্ত কিছু; শুধু রূপকথা নয়, হয়ে উঠেছে এক ক্লাসিক কবিতা।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here