mousumiমৌসুমী বিলকিস

সেভেন্টি সিক্স মিনিটস অ্যান্ড ফিফটিন সেকেন্ডস উইথ আব্বাস কিয়ারোস্তামি তথ্যচিত্রটি সদ্য প্রয়াত ইরানি পরিচালকের কাজের, প্যাশনের বিশেষ কিছু মুহূর্ত ধরেছে খুবই অন্তর্গত ভঙ্গিতে। তথাকথিত তথ্যচিত্রের মতো করে নয়, এক শিল্পীর দৃষ্টিতে আর এক শিল্পীকে দেখা। হ্যাঁ, তথ্যচিত্রটির পরিচালক সইফল্লাহ্‌ সামাদিয়ান নিজেও ফটোগ্রাফার, সিনেমাটোগ্রাফার, পরিচালক এবং আর্ট ডিরেক্টর। তিনি কিয়ারোস্তামির সঙ্গেও যেমন কাজ করেছেন তেমনি মার্টিন করসেসের সঙ্গেও। তাই তাঁর কাজের যে আর্টিস্টিক অ্যাপ্রোচ যার স্বাক্ষর তাঁর স্টিল ফোটোগ্রাফির ফ্রেমময় ছড়িয়ে আছে তা এই ফিল্মটিরও অবয়ব জুড়ে বর্তমান। প্রথমেই দেখি বরফে ঢাকা প্রকৃতির মধ্যে আব্বাস কিয়ারোস্তামি দুটো স্টিল ক্যামেরা নিয়ে একের পর এক ছবি তুলে চলেছেন। কখনো বরফ গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে গাছ, কখনো বরফের ওপর হেঁটে যাওয়া এক শেয়াল, কখনো বরফের ওপর পড়ে থাকা গাড়ির চাকার দাগওয়ালা বৈচিত্রময় রাস্তা ধরা পড়ছে কিয়ারোস্তামির ক্যামেরায়। আর সামাদিয়ান, তথ্যচিত্রকার, ধরে রাখছেন সেই অতীব মনোহর দৃশ্য ও অ্যাকশনটি। কিয়ারোস্তামির এক সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম তিনি গাড়ি চালাতে চালাতে গাড়ির কাঁচের মধ্য দিয়ে যে ফ্রেম দেখেন তা তাঁর কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ফিল্মেও এই দেখাগুলি উঠে আসে। তাঁর এই কম্পোজিশন এবং ফ্রেমিং তথ্যচিত্রটিতেও ধরা পড়ে। প্রথম দৃশ্যেও যেমন গাড়ির ভেতর থেকে প্রকৃতিকে দেখা হচ্ছে তেমন আর একটি সিকোয়েন্সে বৃষ্টির মধ্যে ওয়াইপার নিষ্ক্রিয় রেখে বৃষ্টি ভেজা কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখছেন লোকজন, ঘরবাড়ি, প্রকৃতি। তুলছেন স্টিল ফটোগ্রাফ। পুরো সিকোয়েন্সটি উন্মোচন করছে এক ইম্প্রেশনিস্ট মায়া।একই রকম রঙিন ছাতা মাথায় হেঁটে যাচ্ছে দুই স্কুল বালিকা। গাড়ির গতি কমাতে বলে তিনি ছবি তুলছেন। গাড়ি স্লো হয়ে যাওয়াতে ভয় পেয়েছে দুই বালিকা। তিনি লক্ষ্য করছেন তাও। দুই বালিকা মূল রাস্তা ছেড়ে যে মেঠো পথে হেঁটে যাচ্ছে সেই পথও মুগ্ধ করছে তাঁকে। সবকিছু দেখে তাঁর সেই মুগ্ধতা তথ্যচিত্রটিতে উঠে এসেছে অনেক, অনেক বার। আলিরেজা রাইসিয়ানের দ্য ডেজার্টেড স্টেশন ফিল্মের জন্য লোকেশন দেখতে গিয়ে তিনি বলছেন ‘লুচ এইসেন’ (দেখো এবং উপভোগ কর)। এক পরিত্যক্ত প্রাচীন দুর্গের ঠিক মাঝখানে একটি গাছকে স্নান করাচ্ছে ঈষৎ হলুদাভ আলো। আর তিনি মুগ্ধ হতে হতে দেখছেন, বলছেন, ‘লুচ এইসেন’। মাঝে মাঝে উন্মোচিত হচ্ছে তাঁর মজা করার অভ্যেসটিও। জানলার কাঁচ ভাঙা, লণ্ডভণ্ড চেয়ারওয়ালা এক পরিত্যক্ত ট্রেনের প্যাসেজ দিয়ে কাঁচের টুকরোর ওপর হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে গিয়ে কেবিনের দিকে ঘুরে বলছেন, টিকিট প্লিজ। কখনো বা সহকর্মী এক মেয়ের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে হাতে হাতে তালি দেওয়ার খেলায় মেতে উঠছেন। যে লোকখেলা আমরা প্রত্যেকেই খেলেছি ছোটবেলায়। অর্থাৎ তাঁর শৈশব সত্তাটিও ধরা পড়ছে তথ্যচিত্রটিতে। শুধু তাই নয়, বৃষ্টির মধ্যে মাসুদ কিমিয়াই-এর ফ্রাইডেজ সোলজারস ফিল্মের শুট করতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজেই শুট করছেন, ক্যামেরার লেন্সে লেগে থাকছে বৃষ্টির ফোঁটা। আর তথ্যচিত্রের ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে পরিচালক তথা সিনেমাটোগ্রাফারকে বলছেন, তুমি তো পুরো ভিজে গেলে। শুট শেষ হয়ে গেলে মাসুদ কিমিয়াই যখন দূর থেকে সত্যিকারের সৈন্যদের ধন্যবাদ জানাচ্ছেন তিনি বলছেন, ওদের কাছে গিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে আসতে। এই নম্রতা বোধহয় একজন পরিচালকের গুণ হওয়া উচিত। শেখা উচিত তাঁর কাছ থেকে। তিনি কী অদ্ভুত উপায়ে, কী সাধারণ ভঙ্গিতে বুঝিয়ে দিচ্ছেন একটি ইন্সটলেশন ‘ট্রিজ উইদাউট লিভস’ তিনি চাইছেন ঠিক কিভাবে। গ্লসি প্লাস্টিক বোর্ডের ওপর কিছু মার্লবোরো সিগারেট সম দূরত্বে স্থাপন করে বোর্ডের ওপর প্রতিফলন ও সিগারেটগুলি লেন্সে ধরছেন। ঠিক তার পরেই দেখা যাচ্ছে বিশালাকার বিম গাছের টেক্সচার দিয়ে মুড়ে দেওয়া হচ্ছে আর সেগুলোকে স্থাপন করা হচ্ছে এমনভাবে যেন শালপ্রাংশু গাছের জঙ্গল। ঠিক তার পরেই আসছে বেশ কিছু তরুণী ও তরুণদের নিয়ে তাঁর ওয়ার্কশপ। এত তরুণী আমাদের ফিল্মস্কুলগুলিতেও বোধহয় থাকে না। অন্তত আমার ফিল্মস্কুলে পরিচালনা বিভাগে আমি ও এক মনিপুরী তরুণী ইবালাকারিয়া নংগ্রুম ছাড়া কেউ ছিলাম না এবং পরে সে ফিল্মস্কুল ছেড়ে নিজের জায়গায় ফিরে যায়। সে যাই হোক, ওয়ার্কশপে তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন স্ক্রিপ্টের অতিরিক্ত ভার ত্যাগ করার। চারশো শব্দের সংলাপ কেটেছেঁটে দেড়শোতে নামিয়ে এনেছেন তিনি বলছেন। বলছেন মিনিমালিস্টিক অ্যাপ্রোচের কথা যা তাঁর ফিল্মগুলিতে সবসময় পাই আমরা। কখনো বা তিনি তাঁর অভিনেত্রীর বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে যেতে তাঁকে ফোন করে তাঁর সঙ্গে দেখা করে যাচ্ছেন। সার্টিফায়েড কপি’র অভিনেত্রী জুলিয়েত্তে বিনোচের জন্য কিনছেন নিউজ পেপার যাতে জুলিয়েত্তের ছবি বেরিয়েছে। আসলে পুরো ফিল্মটি নিয়েই লিখে ফেলতে ইচ্ছে করছে। ফিল্মের প্রথম দিকে হাঁসেদের পায়ের শব্দ পারফেক্ট করতে কতকিছুই যে চেষ্টা করছেন আর ভিডিওর সঙ্গে জুড়ে জুড়ে দেখছেন। কখনো চালের ওপর, কখনো ঘরের মধ্যে খানিকটা ভেজা বালির ওপর থাবা দিয়ে বা জিনসের শার্ট আন্দোলিত করে কাঙ্ক্ষিত শব্দটি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। প্যাশন, শিল্পবোধ আর ধৈর্য একসঙ্গে না থাকলে বোধহয় তাঁর মতো স্বতঃস্ফূর্ত পরিচালক হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। তথ্যচিত্রটি কখনো সাক্ষাৎকার বা ভয়েসওভারের তোয়াক্কা করেনি। আর সেজন্যই বোধহয় এত সুন্দর হয়ে উঠতে পেরেছে। স্মর্তব্য যে মৃত্যুদিনে (৪ জুলাই,২০১৬ ) তাঁর বয়স ছিলো ছিয়াত্তর বছর পনেরো দিন। ফিল্মের নামটি বোধহয় সেকথা মনে রেখেই দেওয়া হয়েছে। আর অনেক লম্বা সময় জুড়ে শুট করা ফুটেজ থেকে তৈরি হয়েছে তথ্যচিত্রটি।

another-time

নাহিদ হাসানজাদেহ্‌ পেশায় ধাত্রী হলেও ফিল্ম বানানো তাঁর প্যাশন। অ্যানাদার টাইম তাঁর প্রথম ফিচার ফিল্ম(এ বছরের কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে মহিলা পরিচালক বিভাগে সেরা ছবির খেতাব পেল এই ছবিটি)। পেশার সূত্রেই তিনি খুব ঘনিষ্ঠভাবে জানেন ইরানের মেয়েদের মাতৃত্ব বিষয়ক সমস্যা ও সংকটগুলি। উপরন্তু ফিল্মটিতে তিনি উন্মোচিত করেছেন বয়ঃসন্ধির নিষিদ্ধ মাতৃত্ব যা ইরানীয় আইনেও অপরাধ বলেই গণ্য। যার ফলে তাঁর বিষয় শুনেই প্রথম প্রযোজক ফিল্মটি তৈরিতে রাজি হননি। ফিল্মে সোমায়েহ্‌ জন্ম দিচ্ছে নিষিদ্ধ শিশুর। হাসপাতালে শিশুর জন্ম দিয়েই শুরু হচ্ছে প্রথম দৃশ্য। সত্যিকারের শিশু জন্মের দৃশ্য। হয়তো পেশার কারণেই পরিচালকের পক্ষে এ দৃশ্যটি অ্যারেঞ্জ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি সাংবাদিক বৈঠকে জানিয়েছেন ইরানে কিভাবে ফিল্মের বিষয় সেন্সর করা হয়। হয় পরিচালক নিজেই সেন্সর করেন অথবা সরকারিভাবে ফিল্মের স্ক্রিপ্ট খুঁটিয়ে দেখে পছন্দ হলে তবেই দৃশ্যায়ন করার অনুমতি দেওয়া হয়। জাফর পানাহি বা তরুণ পরিচালক কেওয়ান কারিমির ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তির কথা জেনেছে সবাই। নাহিদ হাসানজাদেহ্‌ কিন্তু বলছেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তিনি তাঁর বিষয় থেকে সরে আসতে পারবেন না। যা মনে হয় তাঁর সে বিষয় নিয়েই ফিল্ম করবেন। ফলত যা হয়, ইরানেই মুক্তি পায়নি এ ফিল্ম। পাবে বলেও আশা করা যায় না। সোমায়েহ্‌ এক দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। তার ওপর তার বাবা (ঘাধির)সবে এক বছর জেল খেটে বাড়ি ফিরেছে। রাসায়নিক কারখানায় কাজ করলেও দীর্ঘদিন মাইনে না পেয়ে প্রতিবাদ করেছিলো সে। সেই তার অপরাধ। বাবা ও মেয়ের ভোগান্তি কী একীভূত করে দিচ্ছেন পরিচালক? বাবা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অমানবিকতার শিকার। আর মেয়ে সামাজিক। বাবা যখন জেলে থাকে তখন যে প্রতিবেশীরা খোঁজ পর্যন্ত নেয় না পরিবারটির জীবন চলছে কিভাবে তারাই আবার মেয়েকে নিয়ে নানারকম সংকট তৈরি করে। বাবা বন্দি করে রাখে মেয়েকে। কিন্তু মা ফেলে দিতে পারে না সোমায়েহ্‌র মাতৃত্বের অনুভূতি। তাই অনিচ্ছা সত্বেও নানারকম সমস্যার মধ্যেও অসুস্থ মেয়ের চিকিৎসা শুরু করে গোপনে। সোমায়েহ্‌র বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। তার শিশুটিকে দিয়ে আসা হয় এক শিশুহীন দম্পতির কাছে। আর বাবা তার পৌরুষের অধিকারে অসুস্থ মেয়েকে শারীরিক আঘাত করতেও পিছপা হয় না। কেবল মেয়েকে গোপনে দেখতে আসা ডাক্তারের যখন সে মুখোমুখি হয়ে যায় আর ডাক্তার কৌশল করে তাকে সরিয়ে নিয়ে যায় অন্তত সাময়িকভাবে মা ও মেয়েকে রক্ষা করতে, আর বলে যে তাকে কেন পরিবারের সবাই এত ভয় পায়। তার নমনীয় হওয়া উচিত। তার পরেই সে বাড়ি ফিরে প্রথম বার মেয়েকে সস্নেহে স্পর্শ করে। কিন্তু তাও ক্ষণিকের জন্য। বাবা আপ্রাণ চেষ্টা করে পিছনের পুরুষটির কথা জানতে। শিশুটির ওপর অসম্ভব বিতৃষ্ণা থাকলেও ক্রমে স্নেহ জেগে ওঠে তার। হিসু করে বাচ্চাটি কাঁদলে সে ন্যাকড়া পাল্টে দেয়। চরিত্রটি ফ্ল্যাট নয়। তার আছে নানান শেড। শেষ পর্যন্ত মরিয়া হয়ে শারীরিক নির্যাতন করেই সে মেয়ের কাছে জেনে নেয় নেপথ্যের পুরুষটিকে। আর মেয়ের বোকামিতে হতাশ হয়ে পড়ে। এ যেন তার নিজেরই দুর্ভাগ্যের একটা দিক। জেলবন্দি তাকে দেখতে গিয়েই তো মেয়ে এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে। সে ছেলে তো ফিরে গেছে কানাডায়। শুধু একটাই সান্ত্বনা ছেলেটি আবার ফিরে আসতে পারে, কারণ সে ইরানকে ভালোবাসে। শেষ দৃশ্যে বাচ্চা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ মেয়ে বাবার সাইকেলের পিছনে বসে বাড়ি ফিরে আসছে। সামনে কোনো আশা নেই, অথবা আছে। ছেলেটি ফিরে আসতেও পারে। কিন্তু এভাবে চলতে চলতেই সোমায়েহ্‌’র জীবন কেটে যাবে কিনা কেউ জানে না। ফিল্মটির বেশিরভাগ দৃশ্য ইন্ডোর। যেন মেয়েদের জীবনের শ্বাসরূদ্ধকর পরিবেশটিকেই প্রতিফলিত করছে। আর গ্রে-হোয়াইট ঘেঁষা রং সিনেমাটোগ্রাফিকে দিয়েছে বিশেষ রকম বৈশিষ্ট্য যা বিষয়ের সঙ্গে চমৎকার মানিয়ে যায়। প্রথম দিকে এক জায়গায় ব্যাক গ্রাউন্ডে আধো অন্ধকারের মধ্যে ছুটে যাচ্ছে একটি ট্রেন, ধোঁয়া উড়ছে গ্রে গাছপালাগুলোর সামনে বাড়িগুলোর পিছন থেকে, ফোর গ্রাউন্ড রাইট অফ দ্য ফ্রেম ঘেঁষে একটা তীব্র আলো এসে পড়ছে। অসম্ভব সুন্দর। কিন্তু এই বানিয়ে তোলা সৌন্দর্যের দরকার ছিলো বলে মনে হয় না। মোহসেন মখমলবাফ,কিয়ারোস্তামি, জাফর পানাহি, দারিউস মেহেরজুই প্রমুখ ইরানি নব তরঙ্গের পরিচালকরা সবসময় মিনিমালিস্টিক ফিল্মের ওপর জোর দিয়েছেন। ইরানের তরুণ পরিচালকরা তাঁদের সার্থক উত্তরসূরি। এ ফিল্মটিও তার অংশীদার।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন