বয়স প্রায় সত্তর ছুঁইছুঁই! তাও তাঁর উদ্দীপনা হার মানাবে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের তরুণ তুর্কিকে। রেট্রো বিভাগে একগুচ্ছ ছবি আর নিজস্ব মতামত নিয়ে এ হেন অস্ট্রেলিয়ার ফিলিপ নয়েস এ বার হাজির কলকাতায়। ২৪তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। কেরিয়ারের ৫০ বছর পূর্তি আর উৎসব উদযাপনের মধ্যে তিনি কথা বললেন খবর অনলাইন-এর প্রতিনিধির সঙ্গে। দেখতে দিলেন নিজের স্টোরিবুকের পাতাও!

আরও পডুন: উৎসবের তৃতীয় দিন: নীচের মানুষদের বেআইনি ভালবাসার আশ্চর্য কাব্য শপলিফটার্স

কলকাতা কেমন লাগছে?

নয়েস: সিডাকটিভ, খুবই সিডাকটিভ এই শহর! আমি যে ভারতে এই প্রথম এলাম, তা তো নয়। দিল্লি গিয়েছি, মুম্বই গিয়েছি। কিন্তু কলকাতার দেখছি একটা একেবারে আলাদা চার্ম আর বিউটি আছে। রীতিমতো জেন্টল এই শহর!

এই শহর তো সত্যজিৎ রায়ের…

নয়েস: (কথা শেষ করতে না দিয়ে) নিশ্চয়ই! বিশেষ করে সত্যজিতের টানেই তো কলকাতায় এলাম! ওঁর ছবি দেখে বড়ো হয়েছি, ওঁকেই আমি নিজের ছবি করার অনুপ্রেরণা বলি। ওঁর ছবিতে যে আটপৌরে নান্দনিকতা আছে, সেটা যেমন শেখার, তেমনই মুগ্ধও করে! আর যদি অনুপ্রেরণা বলেন, তা হল ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া, একটা স্ক্রিনের মতো চারপাশটা দেখা! সার্কাসও কিন্তু আমার ছবি বানানোর নেপথ্যে একটা ভূমিকা পালন করেছে। আমি তো বলি, সিনেমা আসলে সার্কাস ছাড়া আর কিছুই নয়। পরিচালক হল রিংমাস্টার!

এখনকার বাংলা ছবি দেখেন?

নয়েস: না!

philip noyce
ছবি: নিজস্ব

ভারতীয় ছবি?

নয়েস: ব্যান্ডিট ক্যুইন দেখে ভালো লেগেছিল। তবে সেই শেখর কাপুর আর নেই। আগের ফর্মে দেখতে চাই, সেই ডায়ানমিক শেখরকে। ওঁর সঙ্গে আলাপও আছে। পরে যখনই দেখা হোক, প্রথম কথা এটাই বলব!

সবাই বলেন, আপনি না কি ভীষণ বাণিজ্যমনস্ক! সব সময় ছবি বিক্রির উপরে জোর দেন…

নয়েস: একদম! কেন দেবো না বলুন তো? একটা ছবি তৈরি হল, কিন্তু কেউ দেখল না, পয়সা আর পরিশ্রম দুটোই জলে গেল- কোনো মানে হয় কি? তাই আমি ছবির বিপণনে জোর দিই। ট্রেলার খুব ইমপর্ট্যান্ট একটা ছবির প্রতি আগ্রহ তৈরি করার, ৫টা করে ট্রেলার বানাই! আর জোর দিই মিউজিকে!

মিউজিক?

নয়েস: হ্যাঁ! মিউজিক চেঞ্জ করলে কিন্তু ছবি বদলে যায়। তা হলে একটা কথা বলি শুনুন! একবার আমার একটা ছবি কান চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা পায়নি। কারণ দর্শানো হয়েছিল, মিউজিক না কি আবেদন তৈরি করতে পারছে না। আমি তখন কম্পোজারের সঙ্গে কথা বলে পুরো সাউন্ডস্কোর বদলে দিলাম। আবার পাঠালাম মনোনয়নে। তার পর ছবি দেখে ওদের আর প্রশংসা ধরে না!

philip noyce
ছবি: নিজস্ব

আপনি যেমন হলিউডে কাজ করেন, তেমনই অস্ট্রেলিয়ার ছবিও বানান- দ্বিতীয়টা কি দেশপ্রীতি?

নয়েস: বলতে পারেন! তা ছাড়া আমি যখন ছবি করা শুরু করি, তখন অস্ট্রেলিয়ায় কোনো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ছিল না। এখন হয়েছে। তাও যদি বছরে ৬০০টা ছবি তৈরি হয়, ৪০০টারই সঙ্গে কোনো না কোনো ভাবে জড়িয়ে থাকে হলিউড। ওগুলো তখন হলিউডের ছবিরই তকমা পায়। ব্যাপারটা ভালো লাগে না, যদিও আমি নিজেও হলিউডে ছবি বানাই! কিন্তু কী করব! মার্কিন ছবি করি পেট ভরানোর, অস্ট্রেলিয়ার ছবি মন!

হলিউডের অভিনেতাদের নিশ্চয়ই অনেক বায়নাক্কাও থাকে?

নয়েস: তা আর বলতে! অ্যাঞ্জেলিনা জোলির কথাই বলি! আমার একটা ছবিতে এক দৃশ্যে জোলির হোয়াইট হাউজে মারপিট করে ঢোকার কথা ছিল। হোয়াইট হাউজের গেটকিপার হিসেবে আমি একজন নারী-প্রহরী রেখেছিলাম চিত্রনাট্যে। কিন্তু জোলি স্ক্রিপ্ট দেখেই আমায় কানে কানে বললেন- ছবিতে স্ট্রং উওম্যান কেবল আমিই থাকব, অন্য কেউ নয়! সেই দাবিতে দরকার মতো চিত্রনাট্য বদলাতে হল!

আপনি তো বললেন, পরিচালক রিংমাস্টার! এই ব্যাপারগুলো তা হলে আয়ত্তে থাকে না?

নয়েস: সবটা কী আর সবার হাতে থাকে! তবে আমি একটা কাজ করি। ছবি শুরুর আগে অভিনেতাদের নিয়ে একটা ওয়ার্কশপ করি। সেখানে তাদের শরীরচর্চা করাই। আর পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস তৈরি করাই। একজনকে চোখ বুজে থাকতে বলি, অন্যজনকে বলি ওর সঙ্গে যা খুশি করো! এতে পোশাকি ব্যাপারটা ভেঙে গিয়ে সবাই পরিবারের মতো হয়ে যায়, নিজেদের মতো চরিত্রটায় ঢুকে পড়ে। আমায় কিছু নির্দেশ করতে হয় না। আর সত্যি বলতে কী, আমি পরিচালক হিসেবে হুকুম করা পছন্দ করিও না। আমার ছবি তৈরির টেকনিক এটাই!

philip noyce
ছবি: নিজস্ব

যাঁরা ছবি বানাতে চান, তাঁরা কোন টেকনিকে চললে ভালো হয় বলে মনে হয় আপনার?

নয়েস: যে কেউ ছবি বানাতে পারে, শুধু একটা ক্যামেরাওয়ালা ফোন থাকা দরকার! আসল ব্যাপার যখন রেকর্ডিং, তখন একটা রেকর্ডিং ডিভাইস থাকলেই তো হল! বাকিটা যে যাঁর নিজের মতো করে এগোবেন!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here