a scene from human, space, time and human
'হিউম্যান, স্পেস, টাইম অ্যান্ড হিউম্যান'-এর একটি দৃশ্য। সৌজন্যে স্ক্রিন ডেলি।
মৌসুমি বিলকিস

সভ্যতা আসলে কার হাত ধরে চলে? অবশ্যই ক্ষমতার।

আর ক্ষমতার হাতে থাকে মারণ অস্ত্র। সন্ত্রাস বয়ে আনে সে। মানুষের গোপন অনুভূতি দুমড়ে মুচড়ে পড়ে থাকে। ক্ষমতা কেড়ে নিতে চায় সব কিছু। কেড়ে নেয় খাদ্য ও বস্ত্রের মতো মৌলিক অধিকার। কেড়ে নেয় অন্তর্গত গোপন অনুভূতি।

যৌনতার মতো ব্যক্তিগত বিষয়ও ক্ষমতার হাতে ভয়ঙ্কর ভাবে পর্যুদস্ত হয়। সভ্যতার শিকার হয় মেয়েরা।

কিম কি দুক দেখান সভ্যতা আসলে একটা লুপে পড়ে গিয়েছে। তাঁর ফিল্মের নামও সেই সত্যটি অনুসরণ করে – হিউম্যান, স্পেস, টাইম অ্যান্ড হিউম্যান তাই হিউম্যান দিয়ে শুরু হয়ে হিউম্যানেই ফিরে আসে। তাঁর স্প্রিং, সামার, ফল, উইন্টার… অ্যান্ড স্প্রিং-এও ফিরে ফিরে আসা দেখা গিয়েছে।

ফিল্মের ‘হিউম্যান’ অধ্যায়ে দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সময়ের এক যুদ্ধজাহাজে এক দল মানুষ প্রমোদভ্রমণে বেরিয়েছে। সেই দলে আছে মধুচন্দ্রিমায় আসা নবদম্পতি ইভ ও তাকাশি। আড্যাম ও তার সেনেটর বাবা। গ্যাংস্টার ও তার সাঙ্গোপাঙ্গ। আরও এক তরুণ দম্পতি। একদল জুয়াড়ি ও কয়েক জন মেয়ে যৌনকর্মী। জাহাজের নাবিক ও তার সহকারীরা। এবং এক রহস্যময় বৃদ্ধ।

‘হিউম্যান’ ফাস্ট অ্যাক্ট। এখানেই জাহাজের ডেকে সবার সঙ্গে আলাপ হয়ে যায় দর্শকের। জাহাজের মাথায় লাগানো বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র দেখিয়ে তাকাশিকে ইভ বলে কত রক্তই না লেগে আছে তাতে। তখনও তারা জানে না সেই রক্তাক্ত ইতিহাসই পুনরাবৃত্ত হতে চলেছে, আর তার শিকার হতে চলেছে তারা।

সেনেটর হয়ে উঠছে ডিক্টেটর। গ্যাংস্টার তার ডান হাত। সবাই প্রশ্ন তোলে, সেনেটর কেন ভালো কেবিন পাবে? কেন ভালো ভালো খাবার তাকে দেওয়া হবে? একটা গণউত্থানের সম্ভাবনা অচিরেই বিনাশ করে গ্যাংস্টারের অস্ত্র আর সেনেটরের মানুষ ঠকানোর কূট বুদ্ধি।অ্যাডাম তখনও হারায়নি মুল্যবোধ। কিন্তু ইভ গণধর্ষিত হয়।

পুরো ঘটনার সাক্ষী থেকে যায় রহস্যময় বৃদ্ধ।

another scene from human, space, time and human
‘হিউম্যান, স্পেস, টাইম অ্যান্ড হিউম্যান’-এর আরেকটি দৃশ্য। ছবি সৌজন্যে কুইনল্যান.ইট।

দ্বিতীয় অধ্যায় ‘স্পেস’। প্রমোদতরণীটি ভাসতে থাকে শূন্যে, মেঘের ভেতর। প্রমোদভ্রমণে আসা লোকজন হতচকিত হয়ে পড়ে।

প্রথমেই সেনেটর বুঝে যায় খাবারের সংকট হতে যাচ্ছে। তাই অবশিষ্ট খাবার কবজা করে তারা। জাহাজকর্মীরা আপত্তি করলে তাদের ওপরেও দমনপীড়ন নীতি নেয় সেনেটর। যাত্রীদের খাবার রেশন করে। সবাই পায় একটা করে ভাতের গোল্লা।

এমনকি গ্যাংস্টারের সঙ্গীরাও ভাতের গোল্লা পায়। সেনেটর ঠিক করে তিন দিন পর পর এক বার খাবার পাবে যাত্রীরা। খাবার নিয়ে যাত্রীরা বিদ্রোহ করলে হত্যা করতেও পিছপা হয় না সেনেটর। আগ্নেয়াস্ত্রের ভয়ে বিদ্রোহ ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।

ক্ষুধার্ত মানুষগুলি নেতিয়ে পড়ে।

খাবারের বিনিময়ে গ্যাংস্টার যৌনতা কেনে যৌনকর্মীদের কাছে। কী ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য! ক্ষুধার্ত মেয়েরা খিদের জ্বালায় দ্রুত খাবার খাচ্ছে, যেন নিমেষে শেষ করে ফেলবে সব। আর গ্যাংস্টার তাদের ধর্ষণ করছে।

এই অধ্যায়েই ইভ বুঝতে পারে সে মা হতে যাচ্ছে। নোংরা লোকগুলোর বীজজাত সন্তান তার ঘৃণা উৎপাদন করে। আত্মহত্যা করতে চায় সে। কিন্তু সেই রহস্যময় বৃদ্ধ তাকে প্রতিহত করে। ইভের সন্তানই একমাত্র ভবিষ্যৎ। সেই সন্তানের খাবার জোগাতে প্রস্তুতি নেয় বৃদ্ধ। জাহাজের ডেক থেকে সংগ্রহ করা ধুলোবালি, খাবারের উচ্ছিষ্ট দিয়ে মাটি তৈরি করে গাছ লাগায়। বাল্‌বের  উত্তাপে ডিম ফুটিয়ে মুরগি পোষে। এক দিন গাছ দেবে ফল। মুরগিগুলো ডিম পাড়বে। খাবে ইভের সন্তান।

ইভ ভাবে গর্ভস্থ সন্তান তাকাশিরও হতে পারে। আত্মহত্যা থেকে নিরস্ত হয় সে।

এই অধ্যায়েই দর্শক বিমূঢ় হয়ে দেখে রহস্যময় বৃদ্ধ মৃতদেহ টুকরো টুকরো করে গাছের জন্য মাটি তৈরি করছে। মৃতের মাংস রেখে দিচ্ছে ইভ ও অ্যাডামের জন্য।

বৃদ্ধ জানে ঘটনাক্রম। সে জানে জাহাজটি সময়ের কোন অবস্থানে আছে।

‘টাইম’ অধ্যায়ে গণহত্যার স্মৃতি ফিরে আসে। ফিল্মের প্রথমেই জাহাজের মাথায় লাগানো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র যে ইঙ্গিত দিয়েছিল। অসংখ্য ক্ষত নিয়ে জাহাজ জুড়ে পড়ে থাকে মৃতদেহগুলি।

বৃদ্ধ মৃতদেহগুলিতে গাছের বীজ রোপণ করে।প্রত্যেকটি বিজের সঙ্গে রেখে দেয় এক চামচ মাটি।

বৃদ্ধ একদিন উধাও হয়ে যায়। অ্যাডাম ও ইভ দেখে ডেকের ওপর বৃদ্ধের রক্তাক্ত পায়ের ছাপ।

ইভের সন্তান জন্ম নেয়। মৃতদেহে রোপিত গাছগুলি বড়ো হয়। এখন জাহাজে মানুষ বলতে সে ও তার সন্তান।

সভ্যতা পুনরাবৃত্ত হয় শেষতম অধ্যায় ‘হিউম্যান’-এ।

খাদ্য আগে না যৌনতা? একাধিক বার সে প্রশ্ন বা উত্তর ফিল্মে দেখি। ক্ষুধার্ত অ্যাডাম খাদ্যের চাহিদা মিটলেই ইভকে ধর্ষণ করে দ্বিতীয় বার।

গাছগুলি বড়ো হয়ে জঙ্গল হয়ে ওঠে। গাছের নীচে পড়ে থাকে মৃতদের কঙ্কাল। মুরগিগুলো সংখ্যায় বাড়ে।

সতেরো বছর পর ইভ ও তার ছেলে প্রচুর খাবার দাবার সাজিয়ে খাচ্ছে। ছেলের হাতে পিস্তল। মুরগির দিকে তাক করে গুলি ছোড়ে। ইভের তৎপরতায় মুরগিটা বাঁচে। কিন্তু সেই অস্ত্র, সেই গায়ের জোর, সেই হিংস্র যৌনতায় ফিরে যায় সভ্যতা। পেট ভরতেই ইভের সন্তান যৌনতা চায়। তার হাত ঘুরে বেড়ায় ইভের উরুতে। ইভ ছুটে চলে। কোথায় থামবে, ক্ষমতার হাত থেকে রেহায় পাবে কিনা জানা নেই তার মতো দুর্বলের।

ফিল্মের শেষে পৃথিবীর ছবি না দেখালেও চলত। ততক্ষণে দর্শক বুঝেই গিয়েছে রূপক কাহিনির মর্মার্থ।

পরিচালক তাঁর শেষের দিকের ফিল্মগুলিতে দেখিয়েছেন ভয়াবহ হিংস্রতা। এই ফিল্মও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু তা হয়ে উঠেছে আধুনিক এপিক। চলচ্চিত্র এপিক।

a scene from the sweet requiem
‘দ্য সুইট রেক্যুয়েম’ একটি দৃশ্য। ছবি সৌজন্যে হলিউড রিপোর্টার।

রিতু সারিন ও তেনজিং সোনাম-এর পরিচালনায় দ্য সুইট রেক্যুয়েম তিব্বতি এক তরুণীর গল্প বলে।

তিব্বতি তরুণী ডোয়া উত্তর দিল্লির তিব্বতি উদ্বাস্তু কলোনিতে থাকে। শহরের এক বিউটি পার্লারে কাজ করে। নাচের ক্লাসে নাচতে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়। ডোয়ার এই আপাত শান্ত জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর ক্ষত।

চিন-অধিকৃত তিব্বত থেকে বালিকা-বেলায় সে বাবার হাত ধরে এক দল তিব্বতির সঙ্গে দিল্লি শহরের উদ্দেশে পাড়ি দেয়। বরফে আবৃত যাত্রাপথে চিনা সৈন্যের গুলিতে অন্যদের সঙ্গে তার বাবাও মারা পড়ে। জীবিত সহযাত্রীদের সাহায্যে সে এসে পৌঁছোয় দিল্লি।

এই দলটির গাইড গোম্প দলটিকে বিপদের পাহাড়ি পথে ছেড়ে পালিয়ে যায়। কেন না তাকে বাড়ি ফিরতে হবে। তার মেয়ের অসুখ। দলটিকে ছেড়ে যাওয়ার আগে ছোট্ট ডোয়ার হাতে গুঁজে দেয় তার বাবার দেওয়া এক দামি পুঁতির মালা যা এখনও ডোয়া গলায় পরে থাকে।

এই গোম্প-ই এক দিন দিল্লির তিব্বতি কলোনিতে থাকতে আসে। চিনা কমিউনিস্ট পার্টির বিরোধিতা করে সে পার্টির চক্ষুশূল হয়। গোয়েন্দা লাগে তার পিছনে। লুকিয়েও নিস্তার পায় না। তার ওপর চরম রাগ থাকলেও তাকে সাহায্য করার জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডোয়া।

ডোয়ার বর্তমান জীবনের সঙ্গে সঙ্গে অতীতের ফ্ল্যাশব্যাক চলতে থাকে। বর্তমান কাহিনি লিনিয়ার হলেও অতীত নয় লিনিয়ার।

তিব্বতি স্থানান্তরিত মানুষের এই বিপন্ন কাহিনি পরিচালকদ্বয় দেখিয়েছেন চরম রিয়ালিস্টিক ভঙ্গিতে।

তিব্বত ভারত সীমান্তের বরফে ঢাকা উঁচু উঁচু পর্বতের অসাধারণ সৌন্দর্যের গায়ে জন্মভূমি, পরিবার ছেড়ে পালিয়ে আসতে চাওয়া তিব্বতি জনগণের রক্ত, ঘাম।

অসম্ভব রাজনৈতিক ও ব্যক্তিমানুষের যন্ত্রণায় ঋদ্ধ ফিল্মটি।

a scene from jonaki
‘জোনাকি’-র একটি দৃশ্যে। ছবি সৌজন্যে ম্যাজিক আওয়ার ফিল্মস।

আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত তাঁর প্রথম ফিল্মেই (আসা যাওয়ার মাঝে) তৈরি করে নিয়েছেন নিজস্ব দর্শক পরিসর। জোনাকি-র শো-এ সে কথা প্রমাণিত হল। দর্শক হলের মেঝেতে বসে, বসার জায়গা না পেয়ে ভিড় করে দাঁড়িয়ে ফিল্ম দেখলেন। হ্যাঁ, কিছুক্ষণ পর কেউ কেউ বেরিয়েও গেলেন ঠিকই।

কিন্তু এখানেই পরিচালকের মাস্তানি।

‘আপনারা দেখুন বা না দেখুন আমার ফিল্ম আমি বানিয়েছি’, পরিচালক বোধহয় এ কথাই বলতে চান। এ কথা বুঝিয়ে দেওয়াটা সহজ নয় মোটেও। গ্যাংস্টার মানসিকতা লাগে। লাগে হাতিয়ার, আগ্নেয়াস্ত্র। আদিত্য’র মাস্তানির হাতিয়ার একটা আস্ত চলচ্চিত্র যার ভেতর জ্বলে ধিকিধিকি আগুন। তুষের আগুন, যা দর্শকের অন্দরে মৃদু উত্তাপ রেখে যায়।

পরিচালক জোনাকি-র প্রত্যেকটি দৃশ্যাংশ পরম যত্নে কম্পোজ করেন। প্রত্যেকটি ফ্রেম কম্পোজিশন যেন এক একটি পেন্টিং, যে পেন্টিংগুলো ধীর লয়ে ভেসে চলে, যেন ‘ধরণীতলে ভাঙেনি ঘুমঘোর’।

কোনো কোনো দৃশ্যাংশে ক্যামেরা স্থির হয়ে থাকে। যেন সে মোটেও নড়তে চায় না। শুধু চরিত্ররা গতিশীল থেকে দৃশ্যটিকে গতি দেয়। যেন চরিত্রের অ্যাকশনটিই গুরুত্বপূর্ণ। ইয়াসুজিরো অজুর ভঙ্গি মনে পড়ে যায়।

কখন কখনো খুবই ধীর গতিতে ক্যামেরা ট্র্যাক ইন করে।

স্মৃতি, স্বপ্ন, শব্দ, বাদ্য, শিল্প ভাবনা, লাইট – সব কিছুই এক বিষণ্ণতার হাত ধরে চলে। অতীত, বর্তমান, স্মৃতি, সত্ত্বা, স্বপ্ন একাকার হয়ে যায়।

এক একটি ফিল্মে এল এক রকম ভঙ্গি নির্মাণ করা যে কোনো পরিচালকের কাছে স্পর্ধার। আদিত্য সেই স্পর্ধা দেখিয়েছেন। তাঁর তৃতীয় ফিল্ম বিষয়ে তাই দর্শক-প্রত্যাশা বাড়বেই।

সংলাপ বিষয়ে আরেকটু সতর্ক হওয়াই বোধহয় ভালো। বাংলা কথ্য ভাষার একটা নিজস্ব চলন আছে, নিজস্ব বাঁধুনি আছে, শব্দ নির্বাচনের আন্তরিকতা আছে। সেটা কিন্তু কোথাও কোথাও প্রতিহত হয়েছে মনে হল। দু’একটা সংলাপের বাক্য গঠন একেবারে অনুবাদের মতো শোনাল।

মাফ করবেন আদিত্য, সংলাপ বিষয়ে খুশি হতে পারলাম না।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here