DJAM
মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

টোনি গ্যাটলিফ পরিচালিত ছবি ‘ডিজ্যাম’ দেখার সুযোগ হল কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ষষ্ঠ দিনে। চমৎকার একটি ছবি। যদি কোনও রঙ দিতে বলা হয় এ ছবির, তাহলে তা হবে গোধূলির রঙ। যদি বলা হয় গন্ধ দিয়ে বোঝাতে, তাহলে বলব জুঁই ফুল। মিউজিক্যাল রোড মুভিতে গ্যাটলিফের মুন্সিয়ানার সঙ্গে পরিচয় আড়াই দশক পুরনো ‘ল্যাচো ড্রম’ ছবিতে। জিপসিযাপনের ওপর তৈরি সিনেমা। পরিচালকের সাম্প্রতিক ছবি ডিজ্যাম গ্রিসের পটভূমিকায় বেড়ে ওঠা এক তরুণীকে নিয়ে। তাঁর নামেই ছবির নাম- ডিজ্যাম। সুরে আর স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে যারা, তারা ডিজ্যামের আজন্ম শত্রু।
ছটফটে, জেদি, খামখেয়ালি, সুরপাগল এক মেয়ে। কাকা(মৃত মা-র প্রেমিককে অনায়াসে ‘আঙ্কল’ বলে ডাকতে পারে ডিজ্যাম)-র কথায় বেড়িয়ে পড়ল রাস্তায়। গন্তব্য ইস্তানবুল। কাঁধের ব্যাগে সঙ্গী হল তাঁর প্রাণভোমরা বাগলামাস (গ্রিক বাদ্যযন্ত্র)। সুর সোহাগি, আর অমন আলাপি মেয়ে যে না-দেখা,না-চেনা মানুষকেও আপন করে নেয় বড় সহজে। চলার পথে যাকেই দেখে, দুটো গল্পগাছা করে নেয়, গান শুনিয়ে দেয় ডিজ্যাম। তুরস্কের রেস্তোরাঁয় বেলি ড্যান্স করে তাক লাগিয়ে দেয় সব্বাইকে। এভাবে আলাপ জমে যায় ফ্রান্স থেকে আসা সদ্য কৈশোর পেরনো এভ্রিলের সঙ্গে। সিরিয়ার উদ্বাস্তুদের জন্য কাজ করবে বলে নতুন দেশে আসা এভ্রিলের। এরই মধ্যে দিন গুজরানের টাকা পয়সা, পাসপোর্ট সব খুইয়ে দিশেহারা অবস্থা তাঁর। যথারীতি সহায় সেই ডিজ্যাম। সারা ইস্তানবুল দাপিয়ে বেড়িয়ে যখন ঘরে ফেরার পালা তাঁর, এবারেও এভ্রিল তাঁর সাথে সাথে।

চূড়ান্ত আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে পড়া একটা দেশের এক মধ্যবিত্ত ছাপোষা রেস্তোরাঁ মালিক ডিজ্যামের মায়ের প্রেমিক কাকুরগোস। বিপদে পড়েছেন, জলে পড়েছেন। কতটা? ঠিক যতটা জলে পড়লে নিজের জাহাজের অংশ মেরামতির জন্য এক তরুণীকে অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়া যায়, ততটা। হয়তো বা তার চেয়েও অনেক বেশি। দেউলিয়া হয়ে পথে বসার অপেক্ষা। কিন্তু গ্যাটলিফের পরিচালনার হাত পরিণত এবং সুক্ষ বলেই গ্রিসের আর্থ সামাজিক চরিত্রের ভয়বহতা থেকেছে এ ছবির নেপথ্যে। ছবির চলনকে কখনো ডমিনেট করেনি তা। সিরিয়ার ছবিটাও উঠে এসেছে একই ভাবে। লেসবস-এর নির্জন সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে ঘুরতে এভ্রিল চলে আসে এমন এক জায়গায়, যেখানে বালির ওপর স্তূপ হয়ে পড়ে আছে হাজার হাজার লাইফ জ্যাকেট। আর কোনো প্রসঙ্গ নেই। কিন্তু শুধু কয়েক সেকেন্ডের ওই দৃশ্যে আপনার গায়ে কাঁটা দেবেই। বছর তিনেকের আয়লানের নিথর শরীরটা মনে পড়বেই। কানের কাছে ফিসফিসিয়ে একজোড়া ঠোঁট আপনাকে মনে করিয়ে দেবে, কারা যেন ভালো নেই, একদম ভালো নেই।
কাকুরগোসের সঙ্গে ডিজ্যামের ভারি মিষ্টি সম্পর্ক। কখনও রাগ হলে ভেঙ্গাচ্ছে, খুনশুটি করে ‘বুড়ো’ বলে ডাকছে। আবার কখনও মায়ের প্রেমিকের কাছে মায়ের গল্প শুনতে শুনতে চোখ ভিজিয়ে ফেলছে মেয়েটা। কাকুরগোসের জাহাজ সারাইয়ের কাজ শেষ। এবার কাজের খোঁজে ওদের পাড়ি দিতে হবে অন্য কোনও দেশে। আর বাকি যা কিছু ছিল, সব নিয়ে গেছে ঋণ-হাঙ্গররা। ক্ষোভ হয় ডিজ্যামের। বন্দুক হাতে তুলে দুনিয়ার কাছে সময়কে চিহ্নিত করে। তারপর আশ্রয় নেয় সুরের কাছে। একা নয়, সে আশ্রয় সমবেত সর্বহারার। যারা সব হারিয়েও বেঁচে থাকার অহংকারে অহংকারী। যারা বন্দরে বন্দরে ছড়িয়ে যেতে পারে মাটির গান নিয়ে। নতুন পৃথিবীর ভরসা নিয়ে ভেসে যায় ডিজ্যামদের জাহাজ।

1 মন্তব্য

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here