মধুমন্তী চট্টোপাধ্যায়

বরিস এবং জেনিয়া এমন এক দম্পতি, যাদের প্রেমহীনতা খুব শিগগির পেতে চলেছে প্রাতিষ্ঠানিক পরিণতি। বিবাহবিচ্ছেদ আর ক’টা দিনের অপেক্ষা। পছন্দের যাপনসঙ্গী পেয়েছেন দু’জনেই। মস্কোবাসী এই দম্পতির মাঝে আছে ১২ বছরের অ্যালেক্স। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর কার কাছে থাকবে সে? তাকে নিয়ে টানাটানি হয় না। ‘প্রাক্তন’ হওয়ার অপেক্ষায় অধীর বরিস এবং জেনিয়া দু’জনেই শুরু করতে চায় আনকোরা একটা জীবন। পুরোনো জীবনের কোনো অন্ধকার সেখানে থাকবে না। দিন দিন একলা হতে থাকা অ্যালেক্স জেনে গিয়েছে, সে-ও অন্ধকারের অংশ। বাবা-মায়ের ভালোবাসার ফসল কোনো দিনই ছিল না সে। জেনিয়া অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ায় এক রকম ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়েই এক সঙ্গে থাকতে হয়েছিল তাঁদের। এবং ইচ্ছের বিরুদ্ধেই কাটিয়ে দেওয়া বারোটা বছর। ভালোবাসা নেই, মান-অভিমান নেই, গা ঘেঁষে ঘেঁষে থাকার মাঝে আদর, আবদার, আহ্লাদ, মন-কষাকষি কিছুই নেই, আছে শুধু সন্তানের ‘দায়িত্ব’ নেওয়া নিয়ে নিয়মিত অশান্তিটুকু।
২৩তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের দ্বিতীয় দিনে দেখা ছবি ‘লাভলেস’। পরিচালক আন্দ্রেই জিগভিয়ানৎসেভ। হ্যাঁ, সেই জিগভিয়ানৎসেভ, বছর তিনেক আগে যার পরিচালিত ছবি ‘লেভিয়াথান’ সাড়া ফেলেছিল গোটা দুনিয়ায়। ২০১৮-র অস্কার মঞ্চে সেরা বিদেশি ভাষার ছবির লড়াইয়ে রাশিয়া থেকে বাছাই করা হয়েছে ‘লাভলেস’কে।
বিচ্ছেদ নিয়ে খুশি দু’জনেই। বরিসের শুধু ভয় কর্মক্ষেত্র নিয়ে। ধর্মভীরু, গোঁড়া বস জানতে পারলে যদি প্রোমোশন আটকে যায়! জোর করে সম্পর্ক নামের একটা অন্তঃসারশূন্য বোঝা বয়ে বেড়ানো এ বার শেষ হবে। তাই জেনিয়ার মনটাও অনেক হালকা। গুমরে মরছে শুধু এক কিশোর। কী গভীর অনিশ্চয়তায় দাঁড়িয়ে ১২ বছরের একটা জীবন। মাথার ওপর এখনও ছাদ আছে, কিন্তু আশ্রয় নেই, জেনে গিয়েছে অ্যালেক্স।


এ ছবি বড্ড সত্যি কথা বলে। পর্দায় যে সব দেখতে আমাদের ভয় করে, হাড় হিম করা সেই সব সত্যি সত্যি ছবির কথা। ছবি জুড়ে থাকে মস্কোর ঠান্ডায় জমে যাওয়া এক নদী। তার দু’পারে পাতা ঝরে যাওয়া ধূসর গাছের সারি। এ সবের মাঝে আরও বেশি ঠান্ডা হতে থাকা বেরঙিন কয়েকটা বেঁচে থাকা।
অ্যালেক্স এক দিন আর বাড়ি ফিরল না। পরের দিনও না। তার পরের দিনও না। ১২ বছরের ছেলেটা যে আর স্কুল থেকে ফেরেনি, সে যে তার পাশের ঘরের বিছানায় শুয়ে অনবরত কেঁদে চলছে না আর, সেটা বুঝতেই জিনিয়ার সময় লেগেছে ২ দিন। তা-ও স্কুল থেকে ফোন আসার পর। বরিস তখনও উদাসীন। কোনো আত্মীয়ের বাড়ি চলে যায়নি তো ছেলেটা? পুলিশ জানতে চাইলে উত্তর মেলেনি। পড়শিরা কেউ আসেনি তো খবর নিতে! অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা তো অ্যালেক্সের নেই। আছে কি সত্যি? কারোর কি আছে? এ ছবির প্রেক্ষাপটে থাকা সমাজের চেহারাটা ঠিক কেমন? সে সমাজে কেউ কি রাগ করে, অভিমান করে, কষ্ট পেয়ে অন্য কারোর কাছে চলে যেতে পারে? সোশ্যাল মিডিয়ায় মুখ ডুবিয়ে বেঁচে থাকা এই সমাজের ছবিটা আমাদেরও খুব চেনা নয় কি? তা তো হবেই। বিশ্বায়নের যুগে সমাজে-সমাজে তো উনিশ-বিশের তফাত। বাকিটা তো সেই একই – ছবি আপলোডিং, ওপর ওপর ভালো থাকার বিবরণ দিয়ে পোস্ট, তাতে কম করে ৩৩ জনকে ট্যাগ করা। যেন কত কত বেঁধে বেঁধে আছি আমরা, কত কাছাকাছি, কত ভালোবেসে!

ছবির শেষ পর্যন্ত অ্যালেক্স ফেরেনি। ইউক্রেন সমস্যা নিয়ে টালমাটাল দেশ। এক গুচ্ছ হত্যার খবর নিয়ে ভরপুর সন্ধের শিরোনাম। এর মাঝেই জিনিয়া আর তার প্রাক্তন বেছে নিয়েছে নিজেদের পছন্দের জীবন। প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফেরার পথে জিনিয়ার চোখ পড়ে যায় ল্যাম্পপোস্টের গায়ে। ছাপার অক্ষরে অ্যালেক্স হারানোর খবরটা তখন আরও মলিন। মস্কোর হিমেল হাওয়া তখন বয়ে বেড়াচ্ছে ভালোবাসাহীনতার একটা গল্প।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here