প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে অন্য দেশের ছবি দেখতে অনেক সময়ই মনে হয়েছে, ছবিটা তো আমাদের পরিচালকরাও বানাতে পারতেন। অর্থাৎ, যে বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট ছবিটি তৈরি, সেই বিষয়টা পুরোদস্তুর আমাদের দেশেও মজুত। পুরোদস্তুর যদি নাও হয়, অন্তত ৭০ শতাংশ তো মজুত বটেই। তেমনই আরেকটি ছবির দেখা মিলল ২৩তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের প্রথম দিনে। চিলের পরিচালক মার্সেলা সেইডের ছবি ‘লস পেরোস’(কুকুরের দল)।

মার্কিন সাহায্যে অভ্যুত্থান করে গত শতকের সাতের দশকের গোড়ায় সে দেশে ক্ষমতায় এসেছিলো জেনারেল পিনোশের স্বৈরতান্ত্রিক সামরিক সরকার। সেই সরকারের জমানায় ভুরি ভুরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছিল। বহু মানুষ নিখোঁজ হয়ে যান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিশাল সংখ্যক ‘লেফট উইং এক্সট্রিমিস্ট’-রা। সামরিক সরকারের পতনের পর সেই জমানার মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে বেশি কিছু তদন্ত হয়, কেউ কেউ শাস্তি পান। মূল কুশীলবরা অবশ্য শাস্তি পাননি(যেমনটা হয়ে থাকে)।

আরও পড়ুন: কী কী ছবি দেখবেন ২৩তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে: খবর অনলাইনের বাছাই

সেই দেশের ইতিহাসের ওই পর্বটি নিয়ে সাম্প্রতিক কালে নিয়মিত সিনেমা তৈরি হচ্ছে চিলেতে। পরিচালকরা সময়টা ফিরে দেখছেন। সেই জমানার সংঘটিত হওয়া পাপগুলো খুঁড়ে দেখার চেষ্টা করছেন। লস পেরোস তেমনই একটি ছবি। তবে এই ছবির মজা হল, এখানে সেই সময়ের কোনো গল্প বলা হয়নি। পিনোশের জমানার অত্যাচারের শিকার কোনো ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর গল্পও এটা নয়। বরং পরিচালক সময়টা দেখেছেন, সমাজের সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থানকারী শাসক শ্রেণির একটি পরিবারের গল্পের মধ্যে দিয়ে।

বুর্জোয়া পরিবারের মেয়ে মারিয়ানা(বয়স ৪২), তাঁর বাবা এবং স্বামীর পুরুষতন্ত্রের শিকার। তাঁর বাবা, তাঁর মত না নিয়েই পরিবারের বিশাল অরণ্য সম্পদ হোটেল কোম্পানিকে বেচে দিতে চান। তাঁর স্বামী, স্ত্রীকে নিজের আজ্ঞাবহ বলে মনে করেন। অবশ্য ওই শ্রেণির যাবতীয় অভ্যাস নিয়েই বয়ে চলেছে মারিয়ানার জীবন। সন্তান ধারণের জন্য আইভিএফ চিকিৎসা চলার মাঝেও তাঁর মন পড়ে রয়েছে প্রিয় কুকুরটির কাছে। সেই কুকুর পাশের বাড়ির সম্পত্তি নষ্ট করলেও, সে তাকে শেকলে বাঁধতে নারাজ। এমন জীবনের মধ্যেই মারিয়ানা প্রেমে পড়ে তাঁর ঘোড়ায় চড়ার শিক্ষক, ৬০ বছর বয়সি জুয়ানের। জুয়ান তাঁর ফেলে আসা জীবনে চিলের সেনাবাহিনীর কর্নেল ছিলেন। কাহিনি চলতে চলতেই জানা যায়, পিনোশে জমানায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধে জুয়ানের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে পুলিশ। জুয়ানের কারাবাস নিশ্চিত। কিন্তু কী সেই অপরাধ? জানার জন্য বেপরোয়া হয়ে ওঠে মারিয়ানা। জুয়ান বলতে চায় না। মারিয়ানা, তদন্তকারী পুলিশের কাছ থেকে খবর বের করে। তার জন্য পুলিশ অফিসারের শারীরিক চাহিদার কাছে আত্মসমর্পণও করে। আর এসবের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ্যে আসে(কিছুটা অস্পষ্ট রেখেছেন পরিচালক) অসংখ্য মানুষের মৃত্যুতে কীভাবে জড়িয়ে ছিল মারিয়ানার বাবা। এর সঙ্গে টুকরো টুকরো দৃশ্যে পরিচালক দেখিয়েছেন, জুয়ানের প্রতি জনগণের ঘৃণার রূপ। তা কখনও সমবেত বিক্ষোভ তো কখনও জুয়ানের গাড়িতে বিস্ফোরণ। দেখিয়েছেন নথি নষ্ট করলেও গণস্মৃতি নষ্ট হয় না।

চিলের ইতিহাসের সঙ্গে ভারতের অনেক তফাৎ। সেখানকার আলেন্দে সরকারের মতো এখানকার ‘লেফট উইং এক্সট্রিমিস্ট’রা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারেননি। তার আগেই রাষ্ট্র তাঁদের গুঁড়িয়ে দিয়েছে, যাতে সাহায্য করেছে সেই আন্দোলনের কিছু ভুল রণকৌশল। কিন্তু গণহত্যা? লিখিত, অলিখিত ইতিহাসে তাঁর বহু নজির ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে। বরাহনগর-কাশীপুর গণহত্যা, সেগুলিরই একটি। সেই জমানার পর রাজ্যের শাসক পাল্টেছে দু’বার। বারবার তদন্ত কমিশনও হয়েছে। কিন্তু কিছু এগোয়নি। কেন? সরকারগুলোর সঙ্গে গণহত্যাকারীদের সম্পর্ক কেমন থাকলে তদন্ত থেমে যাওয়া সম্ভব? গণহত্যার সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষ ভাবে জড়িতরা বা তাঁদের উত্তরসূরিরা কীভাবে দেখেন সেই ঘটনাগুলো? তা নিয়ে একটি চমৎকার সিনেমা তৈরি হতে পারত না কি এই বাংলায়? কীসের ভয়ে বা আশায় এখানকার ‘প্রগতিশীল’ চিত্র পরিচালকরা বিষয়টা ছুঁয়ে দেখেন না, জানতে ইচ্ছা হয় বৈকি। অনীক দত্ত ‘মেঘনাদ বধ রহস্য’ বানিয়েছেন। কিন্তু সে তো সফট টার্গেটকে আক্রমণ করে। আত্মসমর্পণকারী মধ্যবিত্তর দাঁতনখ যে থাকে না, সে তো আমরা জানিই।

(আগামী ১৪ নভেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় রবীন্দ্র সদনে এবং ১৬ নভেম্বর সকাল ১০টায় নবীনায় ছবিটি প্রদর্শিত হবে। উৎসাহীরা দেখতে পারেন। যদিও যাওয়ার আগে একবার চলচ্চিত্র উৎসবের ওয়েবসাইটে যাচাই করে নেবেন, কারণ উৎসবে শিডিউল মাঝেমধ্যেই পাল্টায়।)

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here