শনিবারের নন্দন। ছবি:রাজীব বসু

mousumiমৌসুমী বিলকিস

আসল উৎসবের প্রথম দিন আসলে সেদিন, যেদিন থেকে স্ক্রিনিং শুরু হয়। উদ্বোধন অনুষ্ঠান ফিল্মপ্রেমীদের ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না ঠিক। তাই ১২ নভেম্বর কীরকম যেন গড়িয়ে গড়িয়ে চললো সব। সকালের দিকে লোকজন ছিলো খুবই কম। আর এটিএম ফাঁকা, কে কতক্ষণ ব্যাঙ্ক বা এটিএমে লাইন দিয়েছে, হাতে টাকা নেই গল্প চললো সারাক্ষণ। কেউ কেউ আবার নোট বাতিলের রাজনৈতিক বিশ্লেষণেও মেতে উঠলেন। মাঝে মাঝে অবশ্যই কোন কোন ফিল্ম দেখা যেতে পারে, কোন থিয়েটারে স্ক্রিনিং আছে ফিল্মগুলির ইত্যাদি নিয়েও চললো বিস্তর আলোচনা। যাঁদের হাতে নেই ফিল্ম স্কিডিউল তাঁরা অন্যদের জিজ্ঞেস করে ঠিক করে নিলেন পরবর্তী কোন স্ক্রিনিং-এ ঢুঁ মারবেন।

kff-22-logo রক্সিতে ফেস্টিভ্যালের সিগনেচার ভিডিও ছাড়াই শুরু হল নাইট টেলস এর স্ক্রিনিং (পরের ছবিতেও সেখানে বাজেনি সিগনেচার ভিডিও)। পরিচালক মানুয়েলা বুরলো মোরেনো’র কোনো ফিল্মই আগে দেখিনি। তাই তুলনামূলক আলোচনায় যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু শিরোনামে যে একটা রোমাঞ্চকর কিছুর ইঙ্গিত ছিলো তা মোটেও পাওয়া গেলো না ফিল্মে। বিরতিহীন সংলাপ, রেডিও জকির কথাবার্তা অথবা মিউজিক বাজানো চলতেই থাকলো সারাক্ষণ। শুধুই রাতের শব্দ শোনার ধৈর্য নেই যেন। নিঃশব্দের স্পন্দন একটি বারের জন্যও শোনালো না ফিল্মটি। তবে হ্যাঁ, বেশ কিছু চরিত্রের গল্পগুলি অবশ্যই ছুঁয়ে যায় আমাদের। একেবারে শুরুতে গাড়ির ভেতর লুসিয়া ও ইভানের চুমুর ক্ষণিক মুহূর্তটি কেবল খানিক স্বস্তি দিয়ে সংলাপের স্রোত শুরু হয়। সম্ভবত এটাই পরিচালকের স্টাইল। কথোপকথনেই তিনি হয়তো ধরতে চেয়েছেন চরিত্রগুলির সত্তা। সংলাপের মধ্য দিয়েই চরিত্রগুলির যে সব অনুভূতির হদিশ আমরা পাই তাতে বোঝা যায় এক নিস্পৃহ দূরত্ব থেকে তিনি বজায় রাখতে চেয়েছেন লিঙ্গ সাম্য। প্রথম দম্পতির গল্পে ইভান যেমন অভিযোগ জানিয়েছে লুসিয়া তাকে মোটেও ভালোবাসে না। কারণ লুসিয়া তার বিরুদ্ধে কখনো কোনো অভিযোগ জানায় না বা রেগেও যায় না তার ওপর। এটাকে তার অত্যন্ত নিরামিষ এক জীবন বলে মনে হয়। এই বাদানুবাদে লুসিয়া সত্যিই রেগে যায়। একই অনুভূতি হয় রাতের ট্যাক্সি ড্রাইভার পেদ্রোর বউ মারিয়ার। সে নিস্তরঙ্গ জীবনে অসম্ভব অসহায় বোধ থেকে ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বেশ কিছু নানারকম পেশার নানারকম চরিত্র কোনো না কোনো ঘটনায় একে অন্যকে ওভারল্যাপ করে। এক গল্প থেকে আর এক গল্পে যাওয়ার স্টাইল (সুইচ ওভার শট) একটা সময় একঘেয়ে হয়ে ওঠে। একঘেয়ে হয়ে ওঠে দৃশ্যগুলির মাঝে মাঝে ব্যবহার করা একই ধরণের টপ ভিউ শটগুলিও। এক শরীরজীবিনী নারী পূর্ব পরিচিত এক খদ্দেরের সঙ্গে কিছুক্ষণের কথোপকথনের পর ঘর বাঁধতে চলে যাবে সেটাও যেন বাস্তব নয় ঠিক। তবে আমার পছন্দের সঙ্গে অন্য দর্শকদের পছন্দ না মেলাটাই স্বাভাবিক। এ তো গেল স্ক্রিনের গল্প। ফিল্ম শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই এক বয়স্ক ভদ্রলোক এসে ঢুকলেন। বসলেন আমার পাশের সিটেই। বসতে বসতেই তাঁর জিজ্ঞাসা, দশটাতেই কি শুরু হয়েছে? তারপর মোবাইল বের করে ফোন করা শুরু হল। পিছনের সিট থেকে একজন সঙ্গে সঙ্গে রিঅ্যাক্ট করলেন, দাদা, বাইরে। তাঁরও পাল্টা রিঅ্যাকশন, কথা শুনতে পেয়েছেন কী? আর এক ভদ্রলোক কিছুক্ষণ ফিল্ম দেখার পরেই বেরিয়ে যেতে গিয়ে উঁচু নিচু সিঁড়িতে হোঁচট খেলেন। লোকজন পড়েই গেলেন ভেবে আতঙ্কে সমবেত শব্দ করে তাঁকে আলো দেখিয়ে দিলেন।

জুলজি
 জুলজি

শিশির মঞ্চে যে কটা তথ্যচিত্র বা শর্ট ফিল্ম দেখলাম তার অনেকগুলোই অত্যন্ত অপরিণত। কোনোটার সাউন্ড একেবারে নন প্রোফেশনাল, কোনোটার ক্যামেরা-সাউন্ড-স্টোরি সবকিছুই। রুশিয়ার ফিল্ম জুলজি শেষমেশ স্বস্তি দিলো। এক নারীর অস্বাভাবিকত্বকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষদের কাছে চিকিৎসা ব্যবস্থার আসল রূপ, অফিসে সাধারণ এমপ্লয়িদের অবস্থান যেমন এসেছে তার পাশাপাশি উন্মোচিত করা হয়েছে অত্যন্ত অন্যায়, কুসংস্কারাছন্ন, সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবেশটিকেও। এমনকি এ নারী প্রথম যার প্রেমে পড়েছে সেও তার অস্বাভাবিক লেজের বিষয়ে বায়াসড্‌। নিজের মাও আগলে রেখে, গুরুজনপনা দেখিয়ে তাকে যেন বড় হতে দেবে না কোনোদিন। শেষমেশ এ নারী নিজের অবস্থানে বিরক্ত হয়ে লেজটি উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। যৌবন উত্তীর্ণ, ভয়ঙ্কর একাকী এক মেয়ে এ ফিল্মের মুখ্য চরিত্র।

 

সাংবাদিক বৈঠকে আদুর গোপালকৃষ্ণণ। ছবি: রাজীব বসু
সাংবাদিক বৈঠকে আদুর গোপালকৃষ্ণণ।   ছবি: রাজীব বসু

স্ক্রিনিং এর মাঝে মাঝেই চললো নানান আলাপ আলোচনা ও আড্ডা। আদুর গোপালকৃষ্ণান তাঁর ফিল্মপুন্নয়ম নিয়ে এবং ফিল্ম বিষয়ক আরো নানান কথা বললেন। চিনের অতিথিদের সঙ্গে চললো চিনা ফিল্ম বিষয়ক কথোপকথন। ওদিকে তাঁবুর মধ্যে জমে উঠলো সিনেমায় সঙ্গীত বিষয়ক আড্ডা। ইন্দ্রনীল সেনের উপস্থাপনায় অনুপ ঘোষাল, শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুন্ধতী হোম চৌধুরী প্রমুখরা তখন জমিয়ে দিয়েছেন আসর। এদিকে রবীন্দ্র সদনে শুরু হয়ে গেছে শঙ্কর মুদি। আর আমি দৌড়চ্ছি এক এটিএম থেকে আর এক এটিএমে। এ বিষয়ে একটা হেস্তনেস্ত না হলে পরদিন থেকে ঘর থেকে বেরোনো আর খাদ্য জোগাড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।

১৩ নভেম্বর দেখা যেতে পারেআইজেনস্টাইন ইন গুয়ানাজুয়াতো, ইটস অনলি দ্য এন্ড অফ দ্য ওয়ার্ল্ড, আ গুড ওয়াইফ, দ্য আননোন গার্ল, আই ড্যানিয়েল ব্লেক, কোর্ট, থ্রি ওয়ার্ল্ডস, হ্যামলেট, দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস, দ্য স্টোরি অফ দ্য লাস্ট ক্রিসানথেমামস, প্লে দ্য ডেভিল, দ্য কমিউন, অ্যান ইজরায়েলি লাভ স্টোরি, তাঞ্জিল, সয় নেরো। 

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন