দ্য ইমেজ বুক
নন্দিতা আচার্য

চিরাচরিত ধ্যান ধারণার বাইরে গিয়েই তাঁর পথ চলা। অদ্ভুত, অন্যরকম সে ভাষা। ছো‌টো ছোটো ক্লিপিং… অবচেতনে তৈরি করে দিচ্ছে ছবি। দর্শকের পলক পড়ে না। একটি বিষয়, একটি বিমূর্ত ভাবনায় ডুব দিতে না দিতেই, চলে আসে আর এক বিমূর্ততা, আর একটি কবিতা।

ইমেজের টুকরো… ক্লাসিক হলিউডি ক্লিপস্, পেইন্টিং, রাজনৈতিক ভয়েজ ওভার, সংবাদ শিরোনাম, বাস্তব জীবনের ফুটেজ, বিশ্বজুড়ে চলা ট্র্যাজেডি; এ সমস্তই অলক্ষ্যে কখন যেন ভাষা হয়ে উঠেছে তাঁর সিনেমায়।

এ যেন এক হিংসায় মোড়া শতবর্ষের নকশি কাঁথা। নানা রঙের সুতোর বুননে সে ঝলমল করছে, হৃদয়কে অস্থির করছে। ছবি ও আবহের গতি  ও গতিহীনতার দ্বান্দ্বিকতায় দর্শকের বড়ো অসুবিধা হয়। যে অসুবিধা গোদারের ভারী প্রিয়। সাম্রাজ্যবাদী হিংসা-অন্যায়, নিজেদের স্বার্থের চোখ দিয়ে পাশ্চাত্য কীভাবে শতবর্ষ জুড়ে দুনিয়াকে দেখে এসেছে, গোদার এ ছবিতে তা দেখিয়েছেন নির্মোহ ভাবে। শেষে চেয়েছেন বিপ্লব।

মুহূর্ত ক্ষণেকের একটি ছবি… আরব দুনিয়ার কোন ধনী পুরুষের পায়ে ভূলুণ্ঠিত হয়ে মুখ ঘষছে কোন সুবেশা তরুণী। হ্যাঁ, আজকের দুনিয়ায়ও অর্থ ও ক্ষমতার কাছে বিকিয়ে যাচ্ছে নারী; হয়ে উঠছে উপভোগের  সামগ্রী। এখানে ওই কয়েকসেকেন্ডের ছবিটিই হয়ে উঠেছে সিনেমার ভাষা, চিরাচরিত মেল ডমিনেশনের একটি দৃশ্য চিত্র।

গোটা ছবিটিতে পরিচালক নিজে শ্যুট করেছেন সামান্যই। অধিকাংশটাই গত শতকের শ্রেষ্ঠ সেলুলয়েড-সৃষ্টির ক্লিপিংস দিয়ে নির্মিত। সে দিক থেকে ‘ইমেজ বুক’ প্রয়াত প্রথিতযশা পরিচালকদের প্রতি গোদারের নিজস্ব মূল্যায়নও যেন। কাউকে শ্রদ্ধা, কাউকে খিস্তি।

প্রকৃতি এখানে ধরা দিয়েছে সমুদ্র ও আকাশের গভীর নীলিমায়, তাতে ছড়িয়ে গেছে সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয়ের সোনালি হলুদ রঙ। এই নীল এবং সোনালি হলুদেই তো – মিশে থাকে প্রেম ও স্বপ্ন। যা হল জগত জীবনের  মূল চালিকা শক্তি! গোদার এই ভাবেই বাস্তব জীবন থেকে দর্শন এবং সেখান থেকে এক কবিতার জগতে নিয়ে যান তার দর্শককে। সমান্তরাল ভাবে তাঁর চলচ্চিত্রে তৈরি হতে থাকে অন্য এক ভাষা। সেখানে তথাকথিত চরিত্র না থেকেও তৈরি হয় চরিত্র। কখন যেন বিমূর্ততার মধ্যে মূর্ত হয়ে ওঠে পরিচিত বাস্তব জগত এবং  জীবন। দর্শক বুঁদ হয়ে থাকে সেই লিরিক্যাল মাজিকে… যার রেশ রয়ে যায় দীর্ঘ সময় ধরে!

ফরনেসিস

 

ফরনেসিস… পরিচালক অরিলিয়া মেঙ্গিন। ইন্ট্রোডিউস করার সময় তিনি জানালেন, এটি তার প্রথম  প্রডাকশন। ফ্রান্সের একটা ছোট্ট দ্বীপ, রিইউনিয়ন থেকে তিনি এসেছেন। সেই আইল্যান্ডের প্রথম মহিলা পরিচালক তিনি। মেয়ে হয়ে তিনি মেয়েদের কথাই বলেছেন এখানে।

আমাদের এক্সপেক্টেশন বেড়ে যায় অনেকখানি। শুরু হয় সিনেমা। পাঙ্কদের মত সাজগোজ করা একটি মেয়ে গাড়ি চালিয়ে কোথাও যাচ্ছে। তার একটি হাত সযত্নে স্পর্শ করে আছে, পাশের সিটে থাকা এক কন্টেনারকে। ফ্রিডা বলে কাকে যেন সে খুঁজছে। কে এই ফ্রিডা? সারা মুভি জুড়ে যার জন্য আকুল হয়ে ঘুরেছে সিনেমার এই প্রধান নারী চরিত্রটি?

পরিচালক এখানে রহস্যময় উলফ ম্যাজিকের শিরদাঁড়ায় গেঁথে গেছেন ঘটনা, চরিত্র, আবেগ। অন্তরালে থাকা

সেই উলফ মানবীকে দর্শক দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু নায়িকা তার নাগাল পাচ্ছে না। সে উদ্ভ্রান্তের মত ছুটে  বেড়াচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। সে সময় পর্দা জুড়ে তীব্র লাল হলুদ রঙের সমাহার। নায়িকার শরীরে ফুটে উঠছে অভ্র মেশানো কয়লা রঙের বিচিত্র সব নকশা। তার মানসিক, শারীরিক আকাঙ্খা জুড়ে … সেই উল্ফ  মানবী। পেছনে তীব্র মিউজিক। নায়িকা ফ্যানটাসাইজ করে ফ্রিডাকে। দর্শক অপেক্ষা করে… কখন মেয়েটিকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দেখা যাবে, কখন ফ্রান্সের সেই নির্জন আইল্যান্ডের কিছু নৈসর্গিক মুহূর্ত উপস্থিত হবে। ক্ষণেকের জন্য নিশ্চুপে থাকা এক জঙ্গল প্রকাশিত হয়েই, মিলিয়ে যায় তা। আবার পর্দা জুড়ে স্নায়ুর উপর চাপ দেওয়া তীব্র রঙ, উল্ফ মানবীর অস্বাভাবিক উপস্থিতি, নায়িকার সেলফ অর্গাজম … দর্শককে ইরিটেড করে চলে।  কোথাও তারা গল্প খুঁজে পায়না। নারীর নিজস্ব গোপন অনুভুতি, স্বাধীনতা … এসবের  মানে কি শুধুই নারীর সঙ্গে নারীর গভীর যৌনতা? শেষ কথা তবে কী?

নাহ… এ ছবি কোথাও উত্তরণ ঘটাতে পারল না। দর্শকের প্রাপ্তি হল… ক্লান্তি এবং বিরক্তি।

হ্যাপি প্রিন্স

ইটালির ছবি, হ্যাপি প্রিন্স। ডিরেক্টর রুপেট এভেরেট।

হ্যাপি প্রিন্সের গল্প কে না জানে? না, এ সেই হ্যাপি প্রিন্স নয়। এ হল ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের বিখ্যাত লেখক অস্কার ওয়াইল্ডের গল্প। তাঁর মেধাবী জীবন, সফলতা, লেখক হিসেবে তাঁর আকাশ ছোঁয়া জনপ্রিয়তা … অন্যদিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক যাপিত জীবন।

ছবির শুরুতে দেখি লাল মখমলে মোড়া দুটি দেব শিশু। এরা হল ওয়াইল্ডের দুই পুত্র সন্তান। তিনি তাদের গল্প বলছেন। কবিতার মুগ্ধতায় তা স্পর্শ করে যায় দর্শকের আবেগকে। ধীরে ধীরে আমরা পরিচিত হতে থাকি তাঁর অন্য জীবন, তাঁর পুরুষ সঙ্গের নিভৃতির সঙ্গে। সে উদ্দাম জীবনে এসেছে যৌনতা, হোম   সেক্সচুয়ালিটি। বিখ্যাত এই মানুষটির এক সময় জেল পর্যন্ত হয়। দু’বছরের দুর্বিসহ সেই জেল জীবন। মুক্তির  পরও যন্ত্রণার শেষ নেই। মানুষ প্রকাশ্যে থুতু দিয়ে যায় এই পুরুষটিকে। নামি দামি বন্ধুরা, যারা ছিলেন তাঁর মনন ও সৃষ্টির সঙ্গী … তাঁরা বেশির ভাগই তাঁকে পরিত্যাগ করেন। একেই কী বলে ভয়ংকর নিয়তি!  তিনি ফ্রান্সে চলে যান… আবারও এক প্রকার নির্বাসনে।

তাঁর পরিবার… স্ত্রী, পুত্র, বারে বারে তাদের সঙ্গের সুখস্মৃতি ওয়াইল্ডকে তাড়া করে বেড়ায়। ছেলেদের বাস্তব উপস্থিতির অভাব,  অস্কারের হৃদয়কে হাহাকারে ভরিয়ে দেয়। যদিও নতুন পুরুষসঙ্গ এবং মেলামেশার মধ্যে তিনি থেকেই যান। ফুল বিক্রি করতে আসা প্রায় কিশোর গরীব অশিক্ষিত একটি ছেলের সঙ্গে ক্ষণিকের সম্পর্কে জড়িয়ে যান। স্মৃতি চারণায় উঠে আসে বিখ্যাত অস্কার ওয়াইল্ডের জীবন। ছেলেটি অবশ্য এসব  কিছুই জানেনা, কিছুই তার ঠিকমত বোধগম্য হয় না। ছেলেটির বালক ভাইকে দেখে তিনি স্নেহসিক্ত হয়ে ওঠেন। নিজের দুই পুত্রের কথা মনে পড়ে। ওদেরকে গল্প শোনাতে চান… আবার সেই জাদুর মায়া ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে হয় তাঁর মনে।

সারা ছবি জুড়ে রয়েছে চিত্রশিল্পীর সৌন্দর্যে স্ট্যাটিক দৃশ্যাবলী। ঘটনার ঘনঘটায় জড়ানো ক্ষণজন্মা পুরুষের বিচ্ছিন্নতা, হতাশা, জটিলটা। যে পুরুষটি বার বার আকুল হয়েছেন, স্ত্রী সন্তানের সঙ্গে পুনর্মিলনের জন্য। হ্যালুসিনেশনের মধ্যে দিয়ে কত বার যে ফিরে এসেছে তাঁর সুখস্মৃতি, তাঁর তীব্র সন্তান স্নেহ! ঘটনার পর  ঘটনা; ফুটে উঠেছে কাব্যময়তা, তাঁর সৃষ্টির স্বর্গীয় পরশ। দর্শককে যা রোমাঞ্চিত করেছে।

হ্যাপি প্রিন্সের মতই সর্বস্ব খুইয়ে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। ক্রমবর্ধমান হতাশা, স্বাস্থ্য সমস্যা… মাত্র ছেচল্লিশ বছর  বয়সেই তাঁর অন্তিম ক্ষণটিকে চিহ্নিত করে দিল। আত্মীয় বন্ধুহীন, জৌলুসহীন এমন একটা দিনে মৃত্যু এসে স্পর্শ করল ক্ষণজন্মা পুরুষটিকে। নিয়তির নির্ধারণকে প্রত্যক্ষ করতে গিয়ে কেঁপে ওঠে দর্শকের হৃদয়, ভিজে ওঠে তাদের চোখ। এ ছবি বাস্তবিকই অন্তরকে মথিত করে তোলে। এ ছবিতে সত্যিই পরিচালক রুপেট এভারেট… ভাবনার গভীরে নিয়ে গিয়ে অবগাহন করান দর্শক মন কে!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here