Kolkata-film-festival--Awardees-edited
নন্দিতা আচার্য চক্রবর্তী

সারা কলকাতা অসময়ের বৃষ্টিতে ভিজে কাহিল। এ রকম একটা দিনে শেষ হল দু হাজার সতেরোর কলকাতা ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। হাঁচি কাশি এবং কাদাজল মেখে সিনেমাপ্রেমী মানুষ ছুটছে নন্দন-রবীন্দ্র সদন চত্বরে। বিশ্রী আবহাওয়ার মধ্যেও সেখানে ভিড়ের কমতি নেই।

মহা উৎসাহে হইহই করে শুরু হয়েছিল  তেইশতম চলচ্চিত্র উৎসব। দেশ বিদেশের গুচ্ছ গুচ্ছ রঙ্গিন ঝলমলে ছবি। নামি পরিচালকদের সঙ্গে রয়েছেন বহু অনামি পরিচালকও। বিদেশি ছবির সঙ্গে এসেছে বাংলা ও নানা আঞ্চলিক ভাষায় নির্মিত কিছু সিনেমা।

এবার সারা পৃথিবী থেকে ২৬৭ টি ছবি এসেছিল। তার থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে ১২৭ টিকে। প্রতিযোগিতায় ছিল ১৬ টি শর্ট ফিল্ম, ৭ টি তথ্যচিত্র। এবারে উৎসবে হাইলাইটেড ছিল গ্রেট ব্রিটেন । সমসাময়িক ব্রিটিশ চলচ্চিত্র পরিচালক মাইকেল উইন্টারবটম-এর ছবির  রেট্রস্পেকটিভ দেখানো হয়েছে।

আসলে ফিল্ম তো জীবনেরই ছায়া। একদিকে যেমন সে কমপ্লিট আর্ট, অন্যদিকে সে জগত ও জীবনে ঘটে যাওয়া যাবতীয় দৃশ্যের প্রতিফলন। সেখানে কোথাও রয়েছে রাজনীতি, যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশ ও মানুষের চরম অবমাননা, বিস্ফোরক প্রেম, সম্পর্কের জটিলতা, অ্যাকশন-রহস্য-মিথ, সুরের মায়াজাল  এবং সর্বোপরি প্রকৃতির অপূর্ব সব ল্যান্ডস্কেপ।

spoor

তাই পোল্যান্ডের ছবি স্পুর( ডিরেক্টর আজিনেস্কা ওলান্দ)- এ দেখি এক বৃদ্ধা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকাকে ; সমস্ত শক্তি জড়ো করে সে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে বন্য প্রাণ সংরক্ষণে। অপূর্ব দৃশ্যায়ন , সঙ্গে সফল অভিনয়ের মাধ্যমে বৃদ্ধার প্রাণান্ত চেষ্টাকে  ফুটিয়ে তোলা – দর্শককে মুগ্ধ করে। তাই বোধহয় এই ছবি বার্লিনে রৌপ্য ভালুক জয়ী।

ভাল লাগার ছবি তুরস্কের ‘ক্লেয়ার অবস্কেয়ার’ ( ডিরেক্টর ইয়ে ইম উতসাদু)। তুরস্কের মুসলিম সমাজ; সেখানে দুই স্ট্যাটাসের দুই নারী। তাদের যাপিত জীবন এবং চিরাচরিত সেই পুরুষতন্ত্রের অবদমন – পলকহীন  দৃষ্টিতে দর্শককে বসিয়ে রাখে। গল্প বলার ধরন এবং ছবির গতিময়তা – এ নিয়ে কোন কথাই হবেনা। আর বলি নরওয়ের সিনেমা ‘ডিসআপিয়ারেন্সের’ (ডিরেক্টর বউদারউইন কুলে) কথা। আহা কি রূপ দেখলাম! তুষারে মোড়া দূরবর্তী এই দেশটি এমনিতেই আমাদের কাছে রহস্যময়। সেখানে এক মা, যুবতী মেয়ে এবং তার কিশোর সৎ ভাইয়ের   গল্প। এখানেও সেই সম্পর্কের সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম জাল বিস্তার। আর রয়েছে সুর সৃষ্টির আচ্ছন্নতা। সুরের মায়ায় ডুবে যায় চরাচর বিস্তৃত রূপকথাময় প্রকৃতি। দর্শকও  অবগাহন করে সেখানে।

DJAM

সুরের কথাই যখন বলা, তখন ফ্রান্সের ছবি ‘ডিজাম’ (ডিরেক্টর টনি গাতলিফ)  এর  কথা বলতেই হয়। পটভূমি ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতির বিপন্ন গ্রিস। সঙ্গে তুরস্ক এবং তুরস্ক-গ্রিসের সীমান্ত।  জীবনের গল্প বলার সঙ্গে পরিচালক ছড়িয়ে দিয়েছে সুর। একের পর এক গান, সঙ্গে মিউজিক।  কী আশ্চর্য, সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশের লোকগান, কিন্তু তা যেন আমাদের দেশের অপূর্ব কোন বাউল-সুফি-ভাটিয়ালির সুর।

বিখ্যাত ভাস্কর র‍্যদা কে নিয়ে ফ্রান্সের ছবি ‘র‍্যদা ’( ডিরেক্টর জাকুয়াস ডলান ), আশা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশার দড়ি ছুঁতে পারল না।  তবে প্রথম দিনে সুইডেনের ছবি  ‘স্কোয়ার’, ( ডিরেক্টর রুবেন অস্টান্ড ), দর্শককে কিছু দিতে পেরেছে। কমেডি এবং অহং ও বুদ্ধিমত্তার ভেতর চিরকালীন সেই দ্বন্দ্ব – টুকরো টুকরো ঘটনার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তবে এ ফিল্মটি নিয়ে যতটা হুইস্পারিং হয়েছে, বাস্তবে  ততটা পরিপূর্ণ আনন্দময় হয়নি।

এবার পুরস্কৃত ছবি ফ্রান্সের ‘লস পেরস’ , ডিরেক্টর মারসেলা সইদ। ৪২ বছরের এক মহিলা এবং তার হর্স রাইডিং ট্রেনার।  উঁচু শ্রেণির বাসিন্দা এই মহিলা একই সঙ্গে, স্বামী, বাবা, পুরুষবন্ধু – সকলের মনোযোগ পেতে চায়। এ এক জটিল ভালবাসা ও দ্বন্দ্বের গল্প।

বৃষ্টি ভেজা  দিন। আলোয় আলোয় ভরা নন্দন চত্বর কিছুটা ম্রিয়মান। থিম সঙের পাশে পুরনো বাঁশিওলার মন কেমন করা পরিচিত সুর শোনা গেল না। মেধা, স্যাটায়ার ও বিনোদনের চলচ্চিত্র উৎসব… শেষ হল এবারের মত।

সিনেমা বোদ্ধা এবং সিনেমা পাগল মানুষের সাথে ভিড় করেছিলেন বহু হুজুগে মানুষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়ে হলে ঢুকেই তারা ঘুমিয়ে পড়ে অথবা  অন্ধকারের মধ্যে অন্যকে ধমক দিয়ে চুপ করায়; তাদের গ্ল্যামারহীন সাধারণ জীবনের হতাশার কিছুটা মুক্তি ঘটিয়ে নেয় বোধহয়। সিট নিয়ে লড়াই, লুকোচুরি করে আগে হলে ঢুকে যাওয়া, ভিড়ে ঠাসা অন্ধকার হলে সিঁড়ির ওপর ঠাসাঠাসি করা পরস্পর অচেনা দর্শক,  নির্ভেজাল মজার টুকরো টুকরো কমেন্ট … এ সমস্ত নিয়েই জীবন্ত হয়ে ওঠে ফিল্ম উৎসব। ত্রুটি বিচ্যুতি, ভাললাগা, নতুন বন্ধুত্ব, নতুন প্রেম্, বহুদিনের ভুলে যাওয়া বন্ধুর সাথে দেখা হওয়া – পর্দার পেছনে চলতে থাকে আরেক চ্চলচিত্র, আর এক উৎসব!

প্রচ্ছদ ছবি: রাজীব বসু

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here