saibal-biswas

কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে নেই মৃণাল সেন। ছবি : রাজীব বসু 

শৈবাল বিশ্বাস: বড়ো আগ্রহ নিয়ে কলকাতা চলচ্চিত্রোৎসব কমিটির প্রধান গৌতম ঘোষ মৃণাল সেনের বেলতলার বাড়িতে গিয়েছিলেন অনুমতি আদায় করতে। সেই অনুমতি পেয়েওছিলেন। তবে সব কিছু যাতে ঠিকঠাক থাকে সেই জন্য‌ বিদেশে মৃণালবাবুর পুত্র কুণালের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। এ পর্যন্ত সবই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু বাদ সাধল নবান্ন।

নন্দনে কলকাতা চলচ্চিত্রোৎসব কমিটির লোকজনের মুখে কুলুপ। কিন্তু নির্ভরযোগ্য‌ সূত্রের খবর, নবান্নের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত মৃণাল সেনের পূর্বাপর তথা রেট্রোস্পেকটিভ বাতিল করতে বাধ্য‌ হল তারা। কারণটা অত্য‌ন্ত সহজবোধ্য‌। ২০১১ সালে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে জড়িত যে তিন জন প্রথিতযশা সরকারের দ্বারে যাননি বা যাওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেননি তাঁরা হলেন মৃণাল সেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্য‌ায় ও তরুণ মজুমদার। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরই তরুণ মজুমদার নন্দনের চেয়ারম্য‌ান থেকে পদত্য‌াগ করেন। সরকারের কোনো অনুষ্ঠানে তরুণবাবুকে পাওয়া যায়নি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্য‌ায় কলকাতা চলচ্চিত্রোৎসবের কমিটিতে ছিলেন তবে সম্প্রতি তাঁকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সৌমিত্রবাবু অবশ্য‌ জানিয়েছেন, এ ধরনের কমিটিতে যে নতুন সরকারের আমলে তাঁর ঠাঁই হয়েছিল সেটাই মনে নেই। কারণ কমিটির কোনো মিটিঙে তাঁকে ডাকা হয়নি। কোনো মিটিং আদৌ হয়েছে কিনা তাঁর জানা নেই।

কমিটি থেকে বাদ দেওয়া এক জিনিস আর মৃণাল সেনের মতো ব্য‌ক্তির পূর্বাপর বাদ দেওয়া আরেক। গৌতম ঘোষরা গোটা বিষয়টি নিয়ে অনেক দূর অবধি এগিয়ে গিয়েছিলেন। পুনে ন্য‌াশনাল ফিল্ম আর্কাইভের সঙ্গে যোগাযোগ করে মৃণাল সেনের বেশ কিছু পুরোনো ছবি আনার ব্য‌বস্থাও করা হয়েছিল। শেষ মুহূর্তে সে সব বাতিল করতে হয়। পুত্র কুণাল ও স্ত্রী গীতা সেনের সঙ্গে কথা বলে মৃণালবাবুর একটা সংক্ষিপ্ত ইন্টারভিউ তোলারও ব্য‌বস্থা করা হয়। বাতিল করতে হয়েছে সেটাও।

mrinal
৯৩ বছর বয়সে পৌঁছে মৃণাল সেনের আর নতুন করে পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু একে ওকে তাঁকে ‘শ্রী’ বিলিয়ে বেড়ানো সরকার তাঁকে অসম্মানিত করবে সেটা অনেকের কাছেই অনাকাঙ্ক্ষিত। চলচ্চিত্রোৎসব কমিটিতে এমন অনেকে আছেন যাঁদের কাছে মৃণাল সেন গুরুর সম্মান পান। রঞ্জিত মল্লিক, অঞ্জন দত্তরা তাঁরই হাতে তৈরি। তাঁরা থাকতে এ ধরনের অসম্মান তাঁর ভাগ্য‌ে জুটবে এটা অনেকেই মেনে নিতে পারেননি।

কিন্তু মৃণাল সেনের প্রতি এই সরকারের এত অনীহা কেন? এ কথা ঠিকই যে নিয়ম করে তাঁর জন্মদিনে দেখা করতে যান বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ৮০ বছর বয়সে তিনি বামফ্রন্টের মনোনয়নে রাজ্য‌সভার সদস্য‌ হয়েছিলেন। এই দুটি কারণে নবান্ন তাঁর ওপর তেমন প্রীত নয়। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না, নন্দীগ্রামে গুলি চালনার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় বুদ্ধবাবুদের বিপরীতে মুখ খুলেছিলেন মৃণাল। শুধু তা-ই নয় সত্য‌জিৎ রায় প্রয়াত হওয়ার পর তাঁকে নন্দনের চেয়ারম্য‌ান হওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। সিপিএম বা সিপিআইয়ের সঙ্গে কোনো কালেই তাঁর সরাসরি যোগাযোগ ছিল না। বরং তিনি ও প্রখ্য‌াত আলোকশিল্পী তাপস সেন এসইউসিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে রটে যায়। রাজনীতিগত ভাবে মৃণাল সেন নিজেকে ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে রাখলেও নবান্নর রাগ যায়নি। জানা গিয়েছে, ২০১১-তেই নাকি মৃণাল সেনকে সম্মানিত করার ইচ্ছা ছিল নবান্নর। কিন্তু মৃণালবাবু কোনও সম্মান নিতে রাজি হননি। সে যাই হোক পূর্বাপর বা রেট্রোস্পেকটিভ করার ব্য‌াপারে তাঁর কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু পুরোনো কথা মাথায় রেখে নবান্ন তাঁকে বাতিলের তালিকায় ফেলে দিল।

তরুণ মজুমদার অবশ্য‌ ঘোষিত ভাবেই বামফ্রন্টের সমর্থক। সে কারণে তিনি সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠান সযত্নে এড়িয়ে যান। কিন্তু বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বা উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর মতো অন্য‌ ধারার চলচ্চিত্রের ধারকরা এখনও এই সরকারের কাছে যোগ্য‌ সম্মান পাননি। বরং ঋতুপর্ণ ঘোষ, অঞ্জন দত্ত, সৃজিত মুখোপাধ্য‌ায়, কৌশিক গঙ্গোপাধ্য‌ায়ের মতো মিডল সিনেমার লোকজনই সরকারের কাছে প্রাধান্য‌ পেয়ে এসেছেন। সে যা-ই হোক, কোনো কিছুর সঙ্গেই মৃণাল সেনের অসম্মানের তুলনা করা যায় না। এই অসম্মানটুকু গৌতম ঘোষের মতো তাঁর প্রিয়পাত্র থাকা সত্ত্বেও কেন সহ্য‌ করতে হল এই প্রশ্নই অনুরাগীদের কুরে কুরে খাচ্ছে।

dailyhunt

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন