prasenjitপ্রসেনজিৎ চক্রবর্তী

ধারেদেনায় জর্জরিত আমার বাবা নিয়মিত লটারির টিকিট কাটতেন। বাড়িতে অশান্তি হত খুব মায়ের সঙ্গে। কখনো কিছু পেয়েছেন বলে শুনিনি। শুধু বলতেন, অনেক বছর আগে নাকি একবার পেয়েছিলেন। মা’র ধারণা ছিল, মাঝেমধ্যে কিছু পায় নিশ্চয়, বাড়িতে জানায় না। নইলে নেশা এতটা গেড়ে বসার কোনো কারণ নেই। সেই সব দিন অতীত হয়েছে অনেক আগেই। বাবা এখন ৭৪। মায়ের মৃত্যুসংবাদ চার বছরের বাসি হয়ে গিয়েছে। তবু এই সেদিনও হঠাৎ বড়ো রাস্তার মোড়ে বাবাকে দেখি লটারির টিকিট কাটছেন। কীসের আশায়, জানি না। সংসার তো চালাতে হয় না অনেক দিনই। তেমন দায়িত্বও নেই। অবশ্য জমানো টাকাও নেই। অকারণ টাকা নষ্টের জন্য রাস্তার মধ্যেই মেজাজ হারিয়ে বকলাম খুব।

দিনেলের অবশ্য একটা কারণ ছিল। দেশে ব্যয় সংকোচন চলছে। জনগণ গভীর সংকটে। তার বউ ইতালিতে চলে গিয়েছে। টাকা নেই বলে নিয়ে আসতে পারছে না। ভয়, সে দেশে অন্য এক যুবকের সঙ্গে থেকে না যায়। সে ভারী হ্যান্ডসাম। চিন্তায় রাজধানী বুখারেস্ট থেকে বহু দূরে এক ছোটো শহরের বারে বসে মদ খায় সে। সঙ্গী বন্ধু সিলে ও পম্পিলিউ। সিলে লটারির টিকিট কাটে নিয়মিত। কারণ, টাকা ব্যাঙ্কে রাখলে তা নাকি ইহুদিদের হাতে চলে যাবে। পম্পিলিউ খানিক স্বাভাবিক। আড্ডা আর মদ খাওয়া চলতে চলতেই দিনেলকে লটারির টিকিট কাটতে জোর করে রাজি করায় সিলে। দিনেলের পয়সা নেই তো কী, টাকা সেই দেবে। তার নেহাৎ কপাল খারাপ, তাই দিনেলই কাটুক। কিছু পয়সা কম পড়াতে পম্পিলিউ সাহায্য করে। তার অবশ্য এ সবে মতি নেই। ঘটনা গড়ায়। দুই ছিনতাইবাজ লুঠ করে দিনেলের ব্যাগ। লটারির ফল বেরোলে দেখা যায়, নম্বর মিলেছে তিন বন্ধুর। ৬ লক্ষ ইউরো। কিন্তু টিকিট পাওয়া যায় না। দিনেলের মনে হয়, ওই ছিনতাই হওয়া ব্যাগেই ছিল টিকিটটা। ব্যস খোঁজ শুরু।

তারপর মাতিয়ে দিয়েছেন রোমানিয়ার পরিচালক পল নেগোয়েসকু, তাঁর টু লটারি টিকিটস ছবিতে।  সে দেশের এক বিখ্যাত লেখকের ছোটো গল্পের পুনর্নির্মাণ করেছেন তিনি। কিন্তু ভারী আধুনিক। যে বহুতল থেকে ব্যাগটি ছিনতাই হয়েছিল, সেখানকার দোরে দোরে ঘুরতে থাকে তিন বন্ধু। দেখা মেলে ড্রাগ ব্যবসায়ী, বেশ্যা, কল্পনাপ্রবণ শিশু, এমনকি একেবারে ছাপ মারা দুনম্বরি জ্যোতিষীরও। হালের রোমানিয়া-সমাজ যেন। আর সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে করতে বিপর্যস্ত তিন বন্ধু দেশের আজকের অবস্থার জন্য দোষারোপ করে সিকি শতক আগে শেষ হয়ে যাওয়া কমিউনিস্ট জমানাকে।

তারপর যাত্রা শুরু বুখারেস্টের দিকে। রাজধানীতে পৌঁছে খুঁজেও পায় ছিনতাইবাজদের, ব্যাগটাও। টিকিট মেলে না। গাড়ির তেল খরচ বৃথাই যায় তিন বেকারের। তারপর খবরে প্রকাশ পায়, এক সরকারি অফিসার টিকিট দেখিয়ে ওই লটারিটি জিতেছেন।

kff-22-logo

সিলে মদ খাওয়া আর লটারি কাটা ছেড়ে চাকরি জোটায়। থাকে না পম্পিলিউ-ও। একা দিনেল নিজেই আবার টিকিট কাটে একটি। ফ্রিজের গায়ে আটকে রাখে অত্যন্ত যত্নে। বউ ফিরে আসে তার। খুশি খুশি দাম্পত্যে একটাই বাধা। অর্থ। খবর আসে এবারের লটারিতে দ্বিতীয় পুরস্কার জিতেছে দিনেলের টিকিট। কিন্তু সেটি ফ্রিজে এমন ভাবে সাঁটা, খোলা ভারী মুশকিল। স্বামী-স্ত্রী ও বন্ধুরা মিলে চলতে থাকে চেষ্টা। ছবি শেষ হয়ে যায়।

কমেডিকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সত্যিই যেন শিখিয়ে দিয়েছেন নেগোয়েসকু। দুর্নীতি, দারিদ্র, সম্ভাবনা ও সুখের যে আশ্চর্য মাখনের ছুরি তিনি নির্মাণ করলেন, তার রেশ থেকে যাবে অনেক দিন। এ বছরের কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব থেকে মণিমাণিক্য অর্জন হয়েছে বেশ কিছু। কিন্তু তার মধ্যে প্রাইজ জেতা কোনো লটারির টিকিট নেই। যা নেগোয়েসকু আমায় দিয়েছেন।

বাবাকে কি গল্পটা বলতে পারব কোনোদিন ? বলতে পারব কি তোমায় নায়ক বানিয়েও সিনেমা হয়, এই পৃথিবীতে। গল্প তো একটু পাল্টাবেই। সিনেমা আফটার অল।

খবরের সব আপডেট পড়ুন খবর অনলাইনে। লাইক করুন আমাদের ফেসবুক পেজ। সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল

বিজ্ঞাপন