থ্রি ফেসেস: জাফর পানাহি
মৌসুমি বিলকিস

কত কত মানুষের স্বপ্ন অঙ্কুরিত হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। আর তা যদি হয় কোনো কিশোরীর স্বপ্ন, যে কিশোরী এক তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক এবং শহর থেকে বহু দূরের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করে, তাহলে স্বপ্নের কথা উচ্চারণ করাটাও যেন অপরাধ। তার জীবন যেন বহমান ধারার বাইরে বইতে না পারে। পরিবার, সমাজ, ধর্ম তার জীবনের গতি ঠিক করে দেয়।

থ্রি ফেসেস ফিল্মে পরিচালক জাফর পানাহি এক কিশোরীর স্বপ্নের শরিক। প্রত্যন্ত গ্রামের কিশোরী মারজিয়েহ্‌ তেহরানের স্কুলে ভর্তি হয়ে অভিনয় শিখতে চায়, অভিনেত্রী হতে চায়। কিন্তু তার মারমুখি বাবা ও ভাই তার এই স্বপ্নে কোনোভাবেই ইন্ধন দিতে রাজি নয়। মারজিয়েহ্‌ নিজের আত্মহত্যার নকল ভিডিও মোবাইলে তুলে পাঠিয়ে দেয় জনপ্রিয় অভিনেত্রী মিসেস জাফারির মোবাইলে এবং লুকিয়ে থাকে বান্ধবীর বাড়ি। মিসেস জাফারি পরিচালক পানাহিকে সঙ্গে নিয়ে নিজের শুটিং বাতিল করে পাড়ি দেন মারজিয়েহ্‌-র উদ্দেশে। দেখা যায় মারজিয়েহ্‌-র গ্রামে মিসেস জাফারি জনপ্রিয় মুখ। ফলত তাঁকে গ্রামের মানুষরা চিনে ফেলে, অটোগ্রাফ নেয়।

রাস্তায় যেতে যেতে তাদের নানারকম অভিজ্ঞতা হয়। যে সব অভিজ্ঞতা জন জীবনের মিথ, বিশ্বাস, আতিথেয়তা ও এক ধরনের মৃদু কৌতুকে ভরপুর।

সব মিলিয়ে একটা রোড মুভির মতোই ঘটনা এগিয়ে চলে। হ্যারিকেন নিয়ে মৃত্যু প্রতীক্ষায় কবরে বসে থাকা বৃদ্ধা, গ্রামের গাভীদের গর্ভ সঞ্চার করা ষাঁড়ের মালিক, বেশি বয়সে বাবা হওয়া বৃদ্ধর পাশাপাশি মারজিয়েহ্‌-র রগচটা বাবা, মারজিয়েহ্‌-র বান্ধবী যার বাড়িতে সে আশ্রয় নিয়েছে, গ্রামের একদা শিল্পী মহিলা যার জীবন এখন দুঃখে ভরপুর আর যেকথা গ্রামের চায়ের দোকানে বসে এক বৃদ্ধ রসিয়ে রসিয়ে পানাহিকে বলেন, পুরুষ পরিচালকদের ব্যবহারে ক্ষুব্ধ অভিনেত্রী যাকে কখনো ফিল্মে দেখা যায় না, যার কথা শোনা যায় মিসেস জাফারির মুখে সবাই উজ্জ্বল হয়ে থাকে কাহিনিতে।

শেষমেশ মিসেস জাফারি মারজিয়েহ্‌-র স্বপ্ন পূরণে সহায়ক হতে পারেন। পানাহির চরিত্রে পরিচালক নিজেই অভিনয় করেন।

গল্পের পরতে পরতে ইরানের পিতৃতন্ত্রের ধরন উন্মোচন হয়।

জাফর পানাহির ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু তিনি এগিয়ে যেতেই বিশ্বাসী। তাঁর চতুর্থ  ফিল্ম থ্রি ফেসেস তাই নিষেধাজ্ঞার গালে সজোর চপেটাঘাত।

কোল্ড ওয়ার: পাবলো পাওলিকোস্কি

প্রথমেই বলে রাখা ভালো পরিচালক পাবেল পাওলিকোস্কি কোল্ড ওয়ার উৎসর্গ করেছেন তাঁর মা বাবাকে।তাই মা বাবার নামেই ফিল্মের প্রোটাগনিস্ট দ্বয়ের নাম, ভিকতর ও জুলা।

এই ফিল্মের কাহিনি ১৯৪৯-এর পোল্যান্ড থেকে শুরু হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে ইওরোপের কয়েকটা দেশে।

ভিকতর ও ইরেনা পোল্যান্ডের নিজস্ব গান বাঁচিয়ে রাখতে অডিশন নেওয়া শুরু করে। এখানেই গান গায়তে আসে কিশোরী জুলা। ভিকতর ও জুলার সম্পর্কের সেই শুরু। তারপর চলে টানাপোড়েন। জুলা রাষ্ট্রের নির্দেশে ভিকতরের ওপর নজরদারি করে। ভিকতর নিজের দেশেই ঢুকতে পারে না। তার অপরাধ সে কমিউনিস্ট। জেলে যেতে হয় তাকে।

জুলার সঙ্গে ভিকতরের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েও আবার ফিরে ফিরে আসে। কখনো প্যারিসে, কখনো ইতালিতে, কখনো জেলের ভেতর দেখা হয় তাদের। তার সঙ্গে দেখা হলেই জুলা পুরোনো সম্পর্ক ছেড়ে বার বার ভিকতরের কাছেই ফিরে আসে। পাশাপাশি চলতে থাকে তার গানের শো। ইতালিতে পৌঁছে তার গানের অ্যালবামও বেরোয়। কিন্তু সে ছুঁড়ে ফেলে দেয় সেই অ্যালবাম। কেননা এক বিখ্যাত ইতালীয় কবির করা তার গানের অনুবাদ এবং তার সঙ্গে ভিকতরের সম্পর্ক তার না পসন্দ। মূলত তার চেষ্টাতেই ভিকতর জেল থেকে ছাড়া পায়। আবার তার কাছেই মুক্তি খোঁজে জুলা, ভিকতরের একটা বেদনাদায়ক চড় ভুলে গিয়েই।

প্রায় বছর পনেরো ধরে এ গল্পের বিস্তার চলতে থাকে। সাদাকালো ছবি কাহিনির সময় পর্বটিকে যেন আরো মোক্ষম করে তোলে। আর পোলিশ ভাষায় ‘ইন্টারন্যাশন্যাল’-সহ একাধিক ভাষার গান, ফোক ডান্স কাহিনিকে একটা দারুণ গতি দেয়।

মুদম্মদ: দ্য মেসেঞ্জার অফ গড:মজিদ মজিদি

মাজিদ মাজিদির মুহাম্মদ: দ্য মেসেঞ্জার অফ গড তাঁর ঘরানার কাহিনিচিত্র নয়। বলা যায় প্রফেটের জীবন নিয়ে অন্যান্য গড়পড়তা ফিল্মের মতোই এটাও একটা ভক্তিমূলক কাহিনিচিত্র। মুসলিম ধর্মের ট্র্যাডিশন মেনে পরিচালক একবারের জন্যও মুহাম্মদের মুখ দেখালেন না। অডিও ভিসুয়ালে অ্যাকশন রিঅ্যাকশন না দেখালে দর্শকের প্রবল অস্বস্তি থেকে যায়। আর এখানে প্রধান চরিত্রের মুখই দেখা গেল না।

ইরানে প্রফেটদের জীবনী বিষয়ক অসাধারণ সব ফিল্ম হয়েছে। দেখলেই বোঝা যায় সেসব ফিল্মের রিসার্চ থেকে স্ক্রিপ্ট থেকে বাজেট কোনো কিছুতেই কমতি রাখা হয়নি।কিন্তু তাঁর সবগুলোই ভক্তিতে গদগদ।

শুধু অসাধারণ সিনেমাটোগ্রাফি আর কিছু মনে রাখার মতো অলৌকিক দৃশ্য থাকলেই দর্শক বাহবা দেবেন এমনটি হল না। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছিল দর্শকদের হতাশা। তাই মাজিদির কলকাতার ভক্তরা মোটেও প্রীত হলেন না।

তবে এ আর রহমানের সঙ্গীত মনে রাখার মতো।

ফিল্মের শুরুতে পরিচালকের সঙ্গে দর্শকদের আলাপ করিয়ে দেওয়ার জন্য মঞ্চে কেউ ছিলেন না। মাজিদ মাজিদি ও তাঁর অনুবাদক মঞ্চে উঠলেন। ফিল্ম খারাপ লাগলেও মাজিদি ভক্তরা বিষয়টায় নিজের শহরের অসম্মান বলে সমালোচনা করছিলেন শোনা গেল।

অ্যাশ ইজ দ্য পিওরেস্ট হোয়াইট: জিয়া ঝ্যাংকে

চিনা পরিচালক জিয়া জ্যাঙ্গকের অ্যাশ ইজ পিওরেস্ট হোয়াইট এক মেয়ের বঞ্চনার গল্প। মেয়েটি এক গ্যাংস্টারকে ভালোবেসে নিজের জীবন সমর্পণ করে অথচ সেই গ্যাংস্টার নিজের দুঃসময় থেকে বাঁচতে বা অসাধু ব্যবসা চালু রাখতে মেয়েটিকে ব্যবহার করে।

ফিল্ম দেখতে দেখতে কখনো কখনো মনে হচ্ছিল আমাদের দেশের মূল ধারার ফিল্ম দেখছি। বিশেষ করে অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর চিত্রায়ন ও আবহের ব্যবহার এক্কেবারে পাতি। গল্পের কিছু কিছু জায়গা ভীষণ স্লো আর অহেতুক কিছু কিছু উপঘটনায় ভারাক্রান্ত।ফিল্মটি এত দীর্ঘ না হলেও ক্ষতি হত না।

এবারে শহরের বিভিন্ন প্রান্তের ষোলটি প্রেক্ষাগৃহে ফিল্ম দেখানো হচ্ছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক ফিল্মের অনেকগুলোই ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রদর্শিত হচ্ছে। খুব ভালো হত দিনের শেষ ফিল্মের পর উৎসব উপলক্ষে শহরের সব প্রান্তের সঙ্গে সস্তার যোগাযোগ ব্যবস্থা যদি সচল থাকতো।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here