দ্য থার্ড ওয়াইফ
মৌসুমি বিলকিস

অ্যাশ মেফেয়ার। নামটা এখনো তেমন পরিচিত নয়। তাঁর প্রথম ফিল্ম দ্য থার্ড ওয়াইফ দেখলেই কিন্তু বোঝা যায় তিনি বিশ্বের ফিল্ম পরিচালকদের তালিকায় পাকা আসন করে নিয়েছেন। ভীষণ কাব্যিক তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।

মেয়ে হওয়ার কারণেই মনে হয় পরিচালক মেয়েদের অনুভূতিগুলো তুলে ধরেছেন অনুচ্চকিত অথচ দৃঢ় ভঙ্গিতে।

উনিশ শতকের ভিয়েতনামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এক সামন্ত প্রভু হাং-এর তৃতীয় বধূ হয়ে আসে চোদ্দ বছরের বালিকা মে। ফিল্ম শুরুই হয় হাং এর বাড়িতে মে-র আগমন ও নানান রিচুয়ালের মধ্য দিয়ে। কিশোরী মে এখনো বোঝে না নারী হয়ে ওঠার রকমসকম। নাভির ওপর ডিমের কুসুম রেখে কুসুম ভক্ষণ করে হাং তার কুমারিত্ব ঘোচায়। আর রক্ত মাখা এক টুকরো কাপড় রিচুয়ালের নামে প্রকাশ্যে ঘোষণা করে সে কথা।

এক অদ্ভুত রিচুয়াল। যেন কিশোরীর ডিম ভেদ করে অনুপ্রবেশ করছে এক সামন্ত প্রভু।

হাং-এর দ্বিতীয় স্ত্রী তাকে ছেলে সন্তান উপহার দিতে পারেনি। সেই চিরাচরিত বিশ্বাস, বংশ পরম্পরা রক্ষায় চাই ছেলে সন্তান। বয়স্ক পরিচারিকা বিশ্বস্ত অভিভাবকের মতো যখন তাকে বুঝিয়ে দেয় ছেলে সন্তান না হলে গৃহকর্ত্রীর মর্যাদা মেলেনা পরিবারে। মে মুখোমুখি হয় কঠিন এক সত্যের। সে প্রার্থনা করে তার আগত সন্তান যেন পুত্র হয়ে জন্মায়।

এ বিশ্বাস এমনই যে হাং-এর ছোটো কন্যা যে এখনো ছোট্ট একটি মেয়ে সে বড়ো হয়ে পুরুষ হতে চায়। কেননা পুরুষ হলে একাধিক বউ থাকবে তার। নিছক এক বালিকার ইচ্ছা। কিন্তু মর্মান্তিক। কেননা সে এই বয়সেই বুঝে গেছে মেয়ে হয়ে মর্যাদা নেই কোনো।

ফিল্মে পুরুষ চরিত্ররা আসে খুব কম দৃশ্যে। পরিচালক মেয়েদের প্রাত্যহিকতার খুঁটিনাটি তুলে ধরেন অসম্ভব নিষ্ঠায়। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায়,একটা শ্বাস রুদ্ধকর পরিস্থিতিতে মেয়েরা নিজের অস্তিত্ব ও ইচ্ছা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে যায়। হাং-এর দ্বিতীয় স্ত্রী রাতের অন্ধকারে গোপনে মিলিত হয় তার প্রেমিকের সঙ্গে, যে প্রেমিক হাং-এর প্রথম স্ত্রীর সন্তান।

অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্যে কাহিনিতে ডানা মেলে মেয়েদের রুদ্ধ আবেগ, আত্মহত্যা, সমকাম, গোপন প্রণয়। গোটা ছবি জুড়ে টেনশনের পরিবেশ ধরে রাখতে সঙ্গত করে আবহ সঙ্গীত।

হ্যাং-এর তৃতীয় স্ত্রী মে জন্ম দেয় এক মেয়ে সন্তান। যথারীতি দেখা যায় আরও এক বালিকা একই রিচুয়ালের মধ্য দিয়ে পুরুষতন্ত্রের শিকার হচ্ছে।

মে বাচ্চা কোলে নিয়ে বসে থাকে। সঙ্গী অশ্রু।

বার্ডস অফ প্যাসেজ

ক্রিস্টিনা গাল্লেগো ও কিরো গুয়েররা, পরিচালকদ্বয় বার্ডস অফ প্যাসেজ ফিল্মের প্রযোজকও।

ফিল্মটিকে বলা যায় এক মহাকাব্য।

কলম্বিয়ার ড্রাগ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এক বিশেষ জনগোষ্ঠীর (ওয়াইয়ু) মানুষদের মধ্যে ক্ষমতার রেষারেষি শুরু হয়। ড্রাগের ব্যবসায় অধিক লাভ, কালো টাকা, ক্ষমতার লড়াই শেষ করে দিতে থাকে সরল মুল্যবোধ ও প্রাচীন বিশ্বাস। যে উরশুলার পরিবারের যৌথ সম্পত্তি ছিল কিছু ছাগল আর কিছু নেকলেস যা তাদের কাছে বিশেষভাবে মূল্যবান সেই উরশুলাই ড্রাগ ব্যবসার মোহে পড়ে হয়ে ওঠে ড্রাগ ব্যবসার গড মাদার।

ফিল্মের প্রথমে তার মেয়ে জায়দা-র যুগল জীবনে প্রবেশের আগে এক বিশেষ রিচুয়ালের পোশাকে সেজে, মুখময় আঁকিবুঁকি নিয়ে ছেলে সঙ্গীর সাথে নাচতে থাকে। যে রিচুয়ালের নাম ওন্না। সেখানে উপস্থিত যুবক রাফায়াত জায়দার সঙ্গে যুগল জীবনের প্রত্যাশায় নাচে অংশ নেয়। কিন্তু সে ওয়াইয়ু জনগোষ্ঠীর সদস্য নয়। তাই উরশুলা আপত্তি করে নিজেদের প্রথার সপক্ষে। কিন্তু বেশ মোটা যৌতুকের বিনিময়ে রাফায়াতের সঙ্গে বিয়ে হতে পারে জায়দার, সর্বসম্মতিক্রমে ঠিক হয়। সেই যৌতুক যোগাড় করতে গিয়ে ঘটনাচক্রে রাফায়াত ড্রাগ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। কমিউনিস্ট নিধনে আসা মার্কিনিরা তাঁদের সেই সুযোগ করে দেয়। ধ্বনিত হয় ‘পুঁজিবাদ দীর্ঘজীবী হোক’।

এখানেই তার ও উরশুলার পতনের শুরু।

যদিও রাফায়াত প্রাণপণে চেষ্টা করে নৈতিক মূল্যবোধ ধরে রাখার। কিন্তু আমূল ব্যর্থ হয়। উরশুলা, তার নিজের বড়ো ছেলে যে গোষ্ঠীর নিয়মকানুন ও প্রাচীন বিশ্বাসে একেবারে আস্থাহীন; যে অসম্ভব অবিবেচক, যে গভীর অনুভূতিগুলোকেও কিনতে চায় অর্থের বিনিময়ে। তার একরোখা স্বভাবও নিজের, জনগোষ্ঠীর ও রাফায়াতের সর্বনাশ ডেকে আনে।

ফিল্মের শেষে সাদা চাদরে মোড়া তার মৃতদেহ দু’হাতে জড়িয়ে হেঁটে যায় উরশুলা।

গাব্রিয়েল গারসিয়া মারকেজের গল্প উপন্যাসের অনেক ঘটনা, রিচুয়াল, মুহূর্ত আমাদের বিস্ময় জাগায়, নিয়ে যায় অচেনা এক জীবনের অন্দরে। এই ফিল্মও সেরকমই কিছু বিস্ময়কর মুহূর্তের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের।

আমরা দেখি সেই অভূতপূর্ব ধর্মীয় আচার যেখানে মৃতের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীতে কবর থেকে সংগ্রহ করা হয় তার হাড়গোড়। শুকিয়ে যাওয়া চামড়া ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে। মুখের ভেতর পানীয় নিয়ে তা মুখ থেকে ছিটিয়ে ছিটিয়ে পবিত্র করা হয় হাড়গোড় বা যে হাড়গোড় ছুঁয়েছে তাকে। অ্যালকোহল ব্যবহার হয় গঙ্গাজলের মতো। দর্শক বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকেন পর্দার দিকে।

মারকেজের গল্পে এরেন্দিরার ঠাকুমা পূর্ব পুরুষদের হাড়গোড় বয়ে নিয়ে বেড়াতো।

এরেন্দিরা ঠাকুমার শরীরে বাঁধা সোনা সংগ্রহ করে মুক্তির আশায় নতুন জীবনের সন্ধানে পাড়ি দেয়। এই ফিল্মেও রাফায়াত- জায়দার মেয়ে, উরশুলার নাতনি কিশোরী ইন্দিরা সঞ্চিত অর্থের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দেয়। অবশ্য উরশুলাই তাকে এই ব্যাগ দিয়েছিল।

সেই অর্থ দিয়েই সে কেনে কয়েকটি ছাগল।ওয়াইয়ু জনগোষ্ঠীর প্রাচীন বিশ্বাস সম্বল করেই যেন সে এগিয়ে চলে। ওয়াইয়ুদের কাছে প্রথম যখন রাফায়াত আসে তখন কয়েকটি ছাগল তাদের বিশেষ সম্পদ বলে গণ্য হত। ছবির শুরুতে মেষপালন ছিল পরিবারের প্রধান জীবিকা, মাঝে নারকো-ব্যবসার বিকৃত পুঁজি তাঁদের প্লেন চালানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিল। ছবির শেষে তাঁরা ফিরে যেতে বাধ্য় হয় মেষপালনেই।

লাতিন আমেরিকার জনজীবন মারকেজ ও এই ফিল্মেরও প্রধান অবলম্বন। তাই এরেন্দিরা ও ইন্দিরার নামের ধ্বনিগত মিল থেকেই যায়।

কিশোরী হয়ে ওঠে আগত ভবিষ্যতের প্রতীক।

স্ট্রিপড

অ্যারন শানি-র স্ট্রিপড ফিল্মের কাহিনি এক লেখিকা, চিত্রকর এবং ফিল্ম মেকার অ্যালিসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। প্রথম তথ্যচিত্র করতে গিয়ে অ্যালিসের আলাপ হয় জিভ-এর সঙ্গে যে অসম্ভব প্রতিভা নিয়ে গায়তে পারে বাজাতে পারে ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিক মিউজিক। কিন্তু সে মিউজিশিয়ান হতে চায় না। যোগ দিতে চায় সেনাবাহিনীতে। সেই সূত্রেই অ্যালিস তার সাক্ষাৎকার নিতে চায় তথ্যচিত্রের জন্য। এই সংযোগটাই অ্যালিসের জীবনে ট্যাজেডি ডেকে আনে। শুধু অ্যালিসই নয়, সারা শহরে অজ্ঞাত পরিচয় এক রেপিস্ট দাপিয়ে বেড়াতে থাকে যার নাগাল পায় না কেউ। কারণ ধর্ষক কড়া ওষুধ প্রয়োগ করে কয়েক দিনের জন্য বেহুঁশ করে রাখে মেয়েদের। যুবতী থেকে প্রৌঢ়া কেউই নিস্তার পায় না।

আমাদের খুব চেনা ঘটনা।

দর্শক জানতে পারে লাজুক, প্রতিভাবান কিশোরটি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর অপরাধ করে বেড়াচ্ছে।

ধর্ষিত হওয়া মেয়েদের জন্য পরিচয় গোপন রেখে নিখরচায় স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা হয়।

কিশোর জিভ-এর দৃশ্য আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম থেকেই অনুমান করে নেওয়া যায় ফিল্মের কাহিনি।

অ্যালিসের প্রতি সমস্ত সহানুভূতি সত্বেও ফিল্মটি সাধারণ থ্রিলার হিসেবেই গণ্য হবে।

*** মিত্রা সিনেমার শেষতম শো ব্ল্যাক মেক্সিকান না দেখিয়ে দেখানো হয় বার্ডস অফ প্যাসেজ।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here