Disappearance film
নন্দিতা আচার্য চক্রবর্তী

জমে উঠেছে উৎসব। আপাদমস্তক ভিড়ে ঠাসা নন্দনে  এ দিনের শেষ ফিল্মটি ছিল নরওয়ের ‘ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’। পরিচালক বউদেউইন কুলে। চরাচর বিস্তৃত সাদা বরফ। তুষারে মোড়া পর্বতমালা। লম্বা লম্বা পাহাড়ি গাছের শাখাপ্রশাখায় সাদা বরফের আলপনা। সেখানে বসবাস করেন এক বয়স্কা মহিলা। তিনি নামকরা পিয়ানোশিল্পী। তার ফোটো-জার্নালিস্ট মেয়ে রুস, বাৎসরিক ছুটিতে বাড়ি এসেছে। গল্প শুরু হয় মা ও মেয়ের কথোপকথনে। দ্বিধা, দ্বন্দ্ব এবং অদ্ভুত নিঃস্পৃহ এক মাতৃত্ব। গল্প এগোতে থাকে।

দর্শক হিপ্নোটাইজড, সিনেমার পর্দা জুড়ে থাকা অপূর্ব ল্যান্ডস্কেপে। পিয়ানোয় সুর তোলে রুসের তেরো বছরের স্টেপ ব্রাদার। কিশোর ছেলেটি সারা দিন বুঁদ হয়ে থাকে সুর ও শব্দের অনুসন্ধানে। তাদের বাড়ির সামনে দেখা যায় বিশাল আকৃতির কতগুলি কুকুরকে। বাড়ির পোষ্য তারা। সকলের আদরের। আবার এরাই তুষারাবৃত বিশাল সেই প্রান্তভূমিতে স্লেজ গাড়ি টেনে মা-মেয়েকে আউটিং-এ নিয়ে গিয়ে মুখোমুখি বসিয়ে দেয়। রুস তার ভাইয়ের সঙ্গে প্রায়ই  খুনসুটি আর খেলায় মেতে ওঠে। কখনও তারা বরফে ঢাকা পাহাড়ের গুহাতে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ে। সেখানে বরফের দেওয়ালকে  নানা ভাবে স্পর্শ করে কিশোরটি তার দিদিকে শোনায় অপূর্ব সুরমূর্ছনা।

শব্দের প্রতি তার এমনই অনুসন্ধিৎসা, যে সে তার মা, দিদি এবং নিজের হার্টবিট পর্যন্ত রেকর্ড করে এবং দিদিকে তা শোনায়। কখনও আবার ভাইবোনকে দেখা যায় তুষারমরুর বুক চিরে বেরোনো এক খণ্ড নীলচে-সবুজ বরফজলে ঝাঁপ দিয়ে হি হি করে কাঁপতে। শেষ দৃশ্য স্লেজে চেপে মা, মেয়েকে এগিয়ে দিতে চলেছে। বরফের কুচিতে মাখামাখি তাদের শীত-পোশাক। মা দাঁড়ানো, মেয়ে আধশোয়া। ঠিক যেন প্যারাম্বুলেটরে মেয়ে, আর মা তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। মেয়ে তো মায়ের থেকে শৈশবের এই স্নেহ-নৈকট্যই চেয়েছিল! দর্শক স্তব্ধ হয়ে দেখে দৃশ্য, সুর, মায়া! প্রকৃতি এবং সম্পর্কের অনাবিল এই নিষ্পাপ রূপটিকেই তো আমরা খুঁজে ফিরি জীবনভর! ছবি শেষ হওয়ার পরও ঘোর কাটে না!

অন্য দিকে শেহনাজকে দেখি স্কাইপে শরীরী প্রেম করতে। কার সঙ্গে! প্রেমিক? না, এ তার নিজেরই স্বামী। দর্শককে ধাক্কা দিয়ে পরিচালক নিয়ে আসে আর এক ছবি।

এ বার আসি তুরস্কের ছবি, ‘ক্লেয়ার অবস্কিওর’-এর কথায়। একশো পাঁচ মিনিটের এ ফিল্মটির ডিরেক্টর ইয়েসিম উস্তালু। অসামান্য একটি ছবি। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে দুই নারী। শেহনাজ এবং এল্মাস। রয়েছে দু’টি সোসাইটি। উচ্চশিক্ষিত, বাইরের জগতে  কর্মরত তরুণী ডক্টর শেহনাজ এবং কিশোরী এল্মাস। এক দিকে উচ্চবিত্ত সমাজের ডেকরেটেড  ঘরবাড়ি, অন্য দিকে ট্র্যাডিশনাল টার্কি পরিবারের সাদামাটা ফ্ল্যাটবাড়ি। সেখানে আমরা এল্মাসকে দেখি ঘরের কাজ করতে, মোটাসোটা এক ডায়াবেটিক বুড়ির পরিচর্যা করতে। উপস্থিত এক মধ্যবয়স্ক পুরুষও দৃষ্টিগোচর হয়। এ কি কিশোরীটির বাবা? এ দিকে বুড়িকে মা বলে ডাকছে এল্মাস, বয়স্ক পুরুষটিও মা বলছে। সম্পর্কের ধাঁধায় পড়ে যায় দর্শক। অন্য দিকে শেহনাজকে দেখি স্কাইপে শরীরী প্রেম করতে। কার সঙ্গে! প্রেমিক? না, এ তার নিজেরই স্বামী। দর্শককে ধাক্কা দিয়ে পরিচালক নিয়ে আসে আর এক ছবি। বয়স্ক পুরুষটির বিছানায় এল্মাস! দর্শক কাঠ হয়ে দেখে এক প্রাণান্তকর সঙ্গম। এল্মাস ভয় এবং প্রবল যন্ত্রণায় কাঁপতে থাকে।

কিশোরী এল্মাসের একমাত্র বিনোদন ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে লুকিয়ে দ্রুত  সিগারেট টানা এবং পাশের ফ্ল্যাটের তরুণী মেয়েদের আড্ডাহুল্লোড় চুপি দিয়ে দেখা। এক প্রবল ঝড়ের রাতে বিদঘুটে নিষ্ঠুর স্বামী-সঙ্গের পর সে টলমলে পায়ে সন্তর্পণে  তার একমাত্র স্বাধীন জায়গা, সেই ব্যালকনিতে আশ্রয় নেয়। পরদিন অর্ধমৃত অবস্থায় সেখান থেকে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। হসপিটালে তার সাইক্রিয়াটিক ট্রিটমেন্ট করতে আসে ডক্টর শেহনাজ। ধীরে ধীরে এল্মাস নিজেকে উন্মুক্ত করে ডাক্তারের কাছে। যদিও সে কাজ সহজ ছিল না। ধৈর্য ও মমতার সঙ্গে শেহনাজ ধীরে ধীরে কাছে আসে এল্মাসের। দুই নারী কোথায় যেন এক হয়ে যায় জীবনের জটিলতায়। শেহনাজ  ভালোবাসাহীন যৌনসম্পর্কে ক্লান্ত। সে আচমকা এক দিন তার সুদর্শন এক ডাক্তার কলিগের সঙ্গে, আনন্দময় এক চরম শারীরিক সম্পর্ক করে ফেলে।

এল্মাস, যার অবস্থান দেখি ভৃত্য এবং যৌনদাসীর মতো, যে কিনা তার স্বামীকে চূড়ান্ত ঘেন্না করে… তবু মহিলা ডাক্তারের কাছেও সে তার দাম্পত্য যৌনতার কথা বলতে চায় না। পাপ হওয়ার ভয়ে! অন্য দিকে শিক্ষিত আধুনিক শেহনাজ কেমন গুটিয়ে যায় হঠাৎ হয়ে যাওয়া সেই লাভ মেকিং-এর জন্য।

সম্পর্ক, ভালোবাসা, অবদমিত যৌনতা এবং নারীর অবদমন… ঘটনার পরতে পরতে অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে প্রস্ফুটিত হয়েছে। এ ফিল্ম যেন অতি বিখ্যাত কোনো চিত্রকরের আঁকা ছবি। ফিল্মের দেহ ও প্রাণ, যুগপৎ আবিষ্ট করে রাখবে দর্শককে… বহু দিন!

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here