budget-wedding
আত্রেয়ী রায়

আজকাল মধ্যবিত্ত বাড়ির বিয়েতে কম করে হলেও ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়। তার উপর আবার লোক ঠকানোর গল্প আছে। অনেকে ভুজুংভাজুং দিয়ে সস্তার জিনিস বেশি দামে গছিয়ে দিতে চায়। এই সময়টায় যেহেতু বিয়ে নিয়ে একটা তোড়জোড় শুরু হয়, জেনে নিন ১০টি টিপস্, যাতে বিয়েটাও ভালোভাবে মিটবে, লোকে বাহবাও দেবে, আবার পকেটে বেশি টানও পড়বে না।

১.কাজের তালিকা

বিয়ের সব কাজ করার আগে একটি তালিকা তৈরি করে রাখুন। অবশ্যই বাড়ির সকলের উপস্থিতিতেই তৈরি করবেন তালিকাটি। এতে আপনি ভুলে গেলেও অন্য কেউ মনে করিয়ে দেবে।

২. বাজেট নির্ধারণ

ব্যাঙ্কের একটা আলাদা অ্যাকাউন্টে বিয়ের বাজেটের পুরো টাকা ট্রান্সফার করে দিন। আর সিদ্ধান্ত নিন ওই বাজেটের বাইরে চলবেন না, যতই প্রলোভন আসুক। বাজেট কত হবে, সেটাও ঠিক করে নিন আগে থেকে। এরপর আপনার সামর্থ্য অনুযায়ী সব খাতে খরচ করুন। দেখবেন তাতে খরচ অনেক কম হবে। তারপর যদি সেখান থেকে কিছু খরচ কমে যায় তাহলে তো একেবারে সোনায় সোহাগা।

আরও পড়ুন: বিয়ের আগে ত্বকের যত্ন কীভাবে নেবেন

৩. বিয়ের জায়গা

বিয়ে কোথায় হবে সেই জায়গাটি বেছে নেওয়াটাও একটা বড় ব্যাপার। যদি আপনার অনেক বড়ো বাড়ি থাকে তাহলে অন্য কোথাও বিয়ে বাড়ি ভাড়া না করে নিজের বাড়িকেই সুন্দরভাবে সাজিয়ে অনুষ্ঠান সেরে নিতে পারেন। আর নিজের বাড়ি না থাকলে সরকারি কমিউনিটি হল, ম্যারেজ হল, ব্যাংকোয়েট হলও আছে। আছে হোটেল, সরকারি সম্পত্তি, ক্লাব হাউজ়। এদের মধ্যে যেকোনও একটি আপনি বুক করতে পারেন বাজেটের কথা মাথায় রেখে। তবে হ্যাঁ, বেশি দূরত্বের মধ্যে বিয়ের ভেনিউ ঠিক করা উচিত নয়।  তাতে সময় ও খরচ দুই বাড়ে ।bipasa-wedding

৪. খাওয়া দাওয়া

লোককে ভালো খাওয়াতে হলে খাওয়াদাওয়ার সঙ্গে আপোস করলে চলবে না। বিয়েতে এমন অনেক নিমন্ত্রিতরা আসবেন, যাঁরা একবারই হয়তো আসবেন। বারবার তাঁদের সঙ্গে দেখা হবে না। সুতরাং, ভালো মেনু ও সুস্বাদু খাবার অত্যন্ত প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে চেনেন এমন ক্যাটারারকে দায়িত্ব দিতে পারেন। লোক যদি ৩০০-র কম হয়, নিজেরা বাজার করে ভালো কোনও রান্নার ঠাকুরের হাতেও দিয়ে দিতে পারেন দায়িত্বভার। অনেক কম খরচে মিটে যাবে। তবে ট্রেন্ড বলছে, বুফে ও ক্যাটারিংই শ্রেয়। বিভিন্ন ক্যাটারারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখন ভালো মানের মেনু করতে হলে অন্ততপক্ষে ৮০০ টাকার (মাথাপিছু) নিচে প্লেট হয় না। চেনাজানা ক্যাটারার হলে দরদাম করে ৬০০ থেকে ৭০০ পর্যন্ত খরচ নামতে পারে।  মেনু ঠিক করার সময় দেখবেন, যাতে অনেক পরিমাণ পদ না হয়। অল্প পদ রাখবেন, কিন্তু খাবারের মানের সঙ্গে সমঝোতা করবেন না।

লোক মুখে শোনা কথা, সবাই যে খাবারগুলি খেয়ে তৃপ্তি পায়, এমন খাবারই ভালো। বিয়ের দিনের আগে এবং পরে থাকে আইবুড়োভাতের অনুষ্ঠান ও বাসিবিয়ের অনুষ্ঠান। যে ক্যাটারারকে দায়িত্বভার দিচ্ছেন, তাদেরই এই বাকি দিনগুলিতেও দায়িত্ব দিয়ে দিন। সবমিলিয়ে একটা প্যাকেজ করে দিতে বলুন।

৫.বিয়ের কার্ড

হাতে কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রণ করতে চাইলে সোজা চলে যান কলেজ স্ট্রিটে। খুব বড়ো কার্ড করতেই হবে এমন কোনও কথা নেই। বেছে নিন রুচিশীল মাঝারি আকারের কার্ড। খরচ পড়বে ৫০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা (২০০টি)। এছাড়া, সবাইকে হাতে কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রণ করার চল এখন আর নেই। বাড়ির বড়োদের আর কর্মক্ষেত্র ছাড়া হাতে কার্ডের চল প্রায় শেষ। এটা ডিজিট্যাল যুগ। অনেক সাইট আছে, অ্যাপ আছে, যেখানে নিজে নিজেই ফোটো দিয়ে বানিয়ে নিতে পারবেন নিজের বিয়ের কার্ড। সেটাই হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিয়ে বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনদের। এই আইডিয়া পছন্দ না হলে বিয়ের কার্ডের ফোটো তুলেও পাঠিয়ে দিতে পারেন।

৬.গয়নাগাঁটি

প্রত্যেক বিয়েতে বাবা-মায়েরা মেয়ের জন্য এক্সক্লুসিভ একটি গয়না গড়ান। দেড়-দু’লাখ টাকার গল্প। এমনটা আপনি এড়িয়ে যেতে পারেন।  হালকা সোনার গয়নার সঙ্গে পড়তে পারেন কস্টিউম জুয়েলারি তবে হ্যাঁ, সোনা ও কস্টিউমের মধ্যে অনুপাতটা ঠিক থাকতে হবে। কস্টিউম যেন সোনার পরিপূরক হয়। চোখ ধাঁধানো না হয়। আর লক্ষ করলে দেখবেন, নামকরা স্বর্ণপ্রতিষ্ঠানও সোনার গয়নার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কস্টিউম জুয়েলারির ব্যবসা করছে।

৭. পোশাক ও অন্যান্য

অনেককেই বিয়েতে ৩০ হাজার, ৪০ হাজার টাকার বেনারসি পরতে দেখা যায়। এটা আসলে পয়সা নষ্ট। কেননা, আপনি কোনোদিনও অন্য কোথাও সেই বেনারসি পরতে পারবেন না। ফলত, ৫০০০ – ৭,০০০ টাকার বেনারসি কিনুন। বিয়ের আগে যদি সেল চলে তাহলে সেই সময় কিছু কিছু জামা কাপড় কিনে রাখতে পারেন। তাহলে দেখবেন জিনিস ভালোও হবে আর আপনার খরচও কমে যাবে। এছাড়া প্রণামীর শাড়ি কিনুন হোলসেল বাজার থেকে। বড়বাজারে চলে যান। সারি দিয়ে শাড়ির দোকান পেয়ে যাবেন। সব শাড়ি সেখান থেকেই কিনুন। ৩০,০০০/৪০,০০০ টাকা বাঁচাতে পারবেন আপনি। এছাড়া অতিরিক্ত শাড়ি-জামাকাপড় কিনবেন না। বিয়েতে উপহারস্বরূপ অনেককিছুই পেতে পারেন আপনি। আগে সেসব দেখে বুঝে নিন। প্রয়োজনীয় জিনিস বিয়ের পর কিনুন। ঠিক একইভাবে রান্নাঘরের জিনিসপত্র বা ঘরের অন্যান্য আসবাবপত্র আগে থেকে কিনবেন না।

আরও পড়ুন: সামনে বিয়ে? শাড়ি বাছাইয়ের সময় মনে রাখবেন যে সব বিষয়

৮.সাজসজ্জা

বিয়ের আগে ডায়েট ও রূপচর্চা শুরু করে দেন অনেকে। এবং সেটা করাই উচিত। বিয়ের দিন আপনি যখন আকর্ষণের কেন্দ্রে, তখন আগে থেকে প্রস্তুতি মাস্ট। কিন্তু পার্লার ও মেকআপ একটা বিরাট ব্যাপার। বিয়ের দু’দিন আগে পার্লারে গিয়েয় ফেশিয়াল, ওয়্যাক্সিং, থ্রেডিং, পেডিকিওর ও ম্যানিকিওর করিয়ে আসুন। অন্তত ৪,০০০ টাকা খরচ হবে। আর রইল পড়ে মেকআপ। প্রোফেশনাল কাউকে বললে, ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা নিয়ে নেবে সে। বরং তার কোনও ছাত্র/ছাত্রীকে বুক করতে পারেন। ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা চার্জ পড়বে। যেহেতু সে জুনিয়র, অনেক যত্ন নিয়ে আপনাকে সাজাবে। আপনার সঙ্গে মা ও বাড়ির বাকি মহিলাদের সাজে ফিনিশিং টাচ দিয়ে দেবে। বুকিং না পেলে পার্লারেও চলে যেতে পারেন। সেখানেও খরচ পড়বে ৬,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা।

bengali-weeding-food

৯. ক্যামেরা ও লাইটিং

অনেকের কাছে ডিজিট্যাল ক্যামেরা থাকে। কারোর কারোর আবার ডিজিট্যাল এডিটিংয়ের কোর্সও করা থাকে। চেনাজানা বন্ধুবান্ধবের মধ্যে এমন ব্যক্তি পেয়ে যাবেন, যার মধ্যে এই গুণ আছে। তাকে বলুন উপহার নয়, ফোটোগ্র্যাফিটা যেন সে করে দেয়। সেই আত্মীয় বা বন্ধু রাজি হলেও হয়ে যেতে পারে। না হলে যোগাযোগ করুন ক্যাটারিং ভদ্রলোকের সঙ্গে। তিনিই ক্যামেরাম্যানের জোগাড় করে দেবেন আপনাকে। তার দৌলতে লাইটিংয়ের ব্যবস্থাও সেরে ফেলতে পারেন। প্যাকেজের মধ্যেই মিটে যেতে পারে বিষয়টা।

১০. সবাইকে বিয়ের কাজে সাহায্য করতে দিন

আত্মীয়দের সকলকেই বিয়ের কাজে নিযুক্ত করুন। তাদের উপযুক্ত আপ্যায়নের অর্থ কিন্তু তাদের বিয়ের যে কোনও কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা নয়। তাই তাদের কাজের ভার দিতে দিন দেখবেন এতে অনেকটা খরচ কমে যাবে এবং কাজও হয়ে যাবে খুব তাড়াতাড়ি।

খরচ কমাতে হবে বলে অন্যের ওপর কখনোই চাপ সৃষ্টি করবেন না। এতে কাজ বিগড়ে যেতে পারে। তাই খুব ঠান্ডা মাথায় সকলের সঙ্গে কথা বলে তারপরেই সিদ্ধান্ত নিন। যিনি বিয়ে করছেন তার মত নেওয়াটা কিন্তু সব থেকে জরুরি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here