অন্দরসজ্জা: বল তো আরশি

0
1068

মৈত্রী মজুমদার

‘বল তো আরশি তুমি মুখটি দেখে…’, মনে পড়ছে গানটা? শুধু এই গানটাই বা বলি কেন, বাংলা সাহিত্যে, গানে কবিতায় আরশি বা আয়না তো নানা রূপে ধরা পড়েছে। মনে পড়ে সেই গল্পটা যেখানে এক গৃহস্থ পরিবারের লোকেরা যাযাবরদের কাছে প্রথমবার আয়না দেখে নিজেদের প্রতিবিম্বকে অন্য মানুষ বলে ভেবেছিল? অথবা সেই যে রাজার সুয়োরানি, তুষারশুভ্রার সৎমা, যে মায়াদর্পণের কাছে বারবার জানতে চাইতো “এই পৃথিবীতে সবচেয়ে সুন্দরী কে?” এরকম কত যে কাহিনি আছে!

সত্যি আয়নার আবিষ্কার না হলে মানব সভ্যতার ইতিহাস যে ঠিক কোন খাতে বইতো, তা বলা মুশকিল। তবে আমাদের কাছে যখন আয়না আছে তখন আমরা বরং তার বিচিত্র ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করি।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা সাধারণ ভাবে আয়নাকে নিজের প্রতিবিম্ব দেখার কাজেই প্রধানত ব্যবহার করে থাকি। হ্যাঁ, সেটাই আয়নার মূল কাজ। আর সেই কাজটাকেই কাজে লাগিয়ে আরও বেশ কিছু অন্যভাবে আয়নাকে অন্দরসজ্জার কাজে লাগানো যেতে পারে।

আয়না প্রতিবিম্ব তৈরির সময় আলোর প্রতিফলন ঘটায়, তাই কোনো কম আলো থাকা জায়গা আয়নার সাহায্যে আলোকময় করে তোলা যায়। আবার প্রতিফলনের শর্ত মেনে আয়না কোনো ছোটো পরিসরকে বড়ো করে তুলে ধরতে সাহায্য করে। তাই অন্দরসজ্জার জন্য সেই পুরোনো গথিক, বা রোক ডিজাইন থেকে আলট্রা মডার্ন সব ক্ষেত্রেই আয়না একটি অপরিহার্য উপাদান।

আয়না যেহেতু আমরা মুখ দেখার জন্য ব্যবহার করি তাই বেডরুমে ড্রেসিংটেবিলের ওপর এই সর্বাধিক আয়না লাগানোর প্রচলন। কিন্তু এই বেডরুমেই আরও অন্যভাবে, যেমন ধরুন বেডের হেডবোর্ড হিসেবে আয়না ব্যবহার করা যেতে পারে।

আবার খাটের পিছনের দেওয়ালে বা অন্য কোন দেওয়ালে অনেকগুলো আয়না একত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে আরটিফ্যাক্টস হিসেবে। নানারকম ফ্রেমিং করে নিতে পারলে তো কথাই নেই। সাধারণ দেওয়াল একবারে অনন্য সাধারণ হয়ে উঠবে।

বাথরুমেও আমরা মুখ দেখার জন্য বেসিনের ওপর আয়না ব্যবহার করি। সেই আয়নাই যদি ফ্রেম থেকে সরিয়ে পুরো দেওয়ালে টাইলসের মত করে লাগানো যায়, তাহলে মুখ দেখার পাশাপাশি সেখানে আলোও বেশি মনে হবে আর জায়গাটি বড়োও দেখাবে। এক্কেবারে এক ঢিলে তিন পাখি।

এবার আসা যাক যেখানে আমরা আয়না লাগাই না,সেই সব জায়গার কথায়।

বসার ঘর। বসার ঘরে দেওয়ালে প্যানেলিং করে আয়না লাগাতে পারেন। আবার ফটো ফ্রেমের পাশাপাশি ফ্রেম করে বিভিন্ন সাইজের বা আকারের আয়না লাগাতে পারেন। সোফার পিছনের দেওয়ালে বা টিভির পাশের দেওয়ালে আয়না লাগাতে পারেন, যেখানে যে ভাবে আপনার ভাল লাগে।

ডাইনিং রুমে আয়না লাগানো কোনো কোনো দেশে খুব প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। সেখানকার লোকেরা মনে করেন খাবার সাজানো ডাইনিং টেবিলের প্রতিফলন বেশি বেশি হলে সমৃদ্ধি আসে। আপনি তা মানুন বা নাই মানুন, আপনার ডাইনিং স্পেসে আয়না লাগালে জায়গাটি যে বড়োসড়ো লাগবে তা নিশ্চিত।

খাবার বা বসার ঘরের কনসোল টেবিলের ওপরের দেওয়াল কিন্তু আয়না লাগানোর মোক্ষম জায়গা। সেখানে সাধারণ আয়নাই হোক বা কারুকার্য করা আয়না, সবই খুব ভাল দেখাবে।

আবার আয়না যে সব সময় আয়তাকার বা বৃত্তাকারই হতে হবে তারও মানে নেই। আপনার সৃজনশীলতা আর মননের মিশ্রণই আপনার অন্দরসজ্জায় প্রতিফলিত হওয়া উচিৎ। তাই সেটাই করুন যা আপনার ভাল লাগে।

বাড়ির প্রবেশ পথের বাইরে বা ভিতরে সুন্দর ফ্রেম করে আয়না লাগাতে পারেন। তাহলে বাড়িতে ঢুকতেই বেশ ভাল অনুভূতি হবে।

আবার বাড়ির ভেতর প্যাসেজের গায়ের দেওয়ালে বা সিঁড়ির ল্যান্ডিঙের দেওয়ালে আয়নার ব্যবহার খুবই আধুনিকতার ছোঁয়া এনে দিতে সক্ষম।

আসলে একটু আধটু মাথা ঘামালে অনেক অনেক ভাবেই আয়নার ব্যবহার করা যায়। যেমন ধরুন, এক কালে স্টিলের আলমারির ওপর আয়না লাগানো থাকতো। আপনি চাইলে আজকাল পুরো ওয়ারড্রবটাই আয়নায় মুড়ে দিতে পারেন। এক্ষেত্রে এক অদ্ভুত ইলিউশন তৈরি হবে।

তবে একটা কথা মনে রাখবেন, এমন কোনো জায়গায় আয়না লাগাবেন না যেখানে হঠাৎ নিজের প্রতিফলন দেখে আপনি নিজেই ঘাবড়ে যাবেন। বিশেষত রাতের অন্ধকারে।

আসলে মানুষের মন এক অদ্ভুত মায়াদর্পণ। যেখানে প্রতিনিয়ত সে তার নিজের ছায়া দেখে তবু কি তাকে ছুঁতে পারে ? সেই যে লালন বলেছিলেন……

‘আছে ঘরের কাছে আরশিনগর, সেথা পড়শি বসত করে/ আমি একদিনও না দেখিলাম তারে…’

(ছবি: ইন্টারনেটের মাধ্যমে)

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here