blind school cricket tournament

নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: স্ট্রেট ড্রাইভটা মেরেই ছুটেছিলেন ব্যাটসম্যান প্রসেনজিৎ আদক। ফিল্ডারের হাত ঘুরে উইকেটকিপারের হাতে বল ফেরত আসার আগেই নন স্ট্রাইকিং এণ্ডে ব্যাট ছুঁইয়ে দ্বিতীয় রান নিয়ে ফিরে এলেন ক্রিজে। ততক্ষণে মাঠের বাইরে থেকে ছুটে এসেছেন সহ খেলোয়াড়রা। এতক্ষণের দমবন্ধ করা টেনশন কাটিয়ে সকলের চোখেই তখন আনন্দাশ্রু। শেষ বলে দরকার ছিল দু’ রানের। প্রসেনজিতের অর্ধ শতরানের হাত ধরে কলকাতার লাইট হাউস স্কুল ফর দ্য ব্লাইন্ডকে হারিয়ে আন্তঃজেলা ব্লাইন্ড স্কুল ক্রিকেট জিতে নিল নবদ্বীপের এপিসি ব্লাইন্ড স্কুল।

দক্ষিণ আফ্রিকায় যখন কোহলি ব্রিগেড লড়ছে হার বাঁচানোর লড়াই, তখন সুদূর কৃষ্ণনগরে অন্য লড়াইয়ে নেমেছিল একঝাঁক দৃষ্টিহীন পড়ুয়া। শুধু একটি প্রতিযোগিতায় জয়লাভ নয়, আসলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হারিয়ে দেওয়ার লড়াই ছিল। সেই লড়াইয়ে সমানভাবে জিতে গেল রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে অংশ নিতে আসা একাধিক ব্লাইন্ড স্কুলের পড়ুয়ারা। রবিবার থেকে মঙ্গলবার যার সাক্ষী থাকল কৃষ্ণনগর।

এই দৃষ্টিহীন পড়ুয়াদের উৎসাহ দিতে ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছিল নদিয়া জেলা প্রশাসন। কৃষ্ণনগরের সদর মহকুমা শাসক ইউনিস রিসিন ইসমাইল বলেন ,”আমাদের উদ্দেশ্য ছিল এই দৃষ্টিহীন পড়ুয়াদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি। তা করতে পেরেছি।” রবিবার থেকে কৃষ্ণনগরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল আন্তঃজেলা ব্লাইন্ড স্কুল ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। কৃষ্ণনগরের দ্বিজেন্দ্রলাল রায় জেলা স্টেডিয়াম এবং রামকৃষ্ণ পাঠাগারের মাঠে খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হল। মঙ্গলবার ছিল ফাইনাল জেলা স্টেডিয়ামে। ১২টি জেলার ১৬টি ব্লাইন্ড স্কুল এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।

নামে ১৬টি আলাদা দল, তবে আক্ষরিক অর্থেই একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, যেন নিজেদের শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে হারানোর লড়াই ছিল এই পড়ুয়াদের। সাদা রঙের ঝুনঝুনি দেওয়া বল, রঙিন পোশাক, আধুনিক ক্রিকেটের যাবতীয় মশলা ছিল মজুদ। নিজেদের চোখে গোটা পৃথিবীর রঙ তাদের কাছে অন্ধকার। কিন্তু সেখানেই এই প্রতিযোগিতায় দিব্যেন্দু, প্রসেনজিৎ, শংকররা নিখুঁত স্কোয়ার কাট আর কভার ড্রাইভে সবুজ ঘাসে রঙ ছড়ালেন। প্রতিবন্ধকতার যাবতীয় বাউন্সার উড়িয়ে দিলেন সাহসী হুক শটে।

বাকি খেলা ১০ ওভারের হলেও ফাইনাল ছিল ১৫ ওভারের। প্রথমে ব্যাট করে কলকাতার লাইট হাউস স্কুল ফর দ্য ব্লাইন্ড করে বিনা উইকেটে ১৮১ রান। ১০৮ রান করেন তাদের শঙ্কর মাহাতো। পরে ব্যাট করে নবদ্বীপের এপিসি ব্লাইন্ড স্কুল তিন উইকেট হারিয়ে করে ১৮২। যার জন্য অবশ্য শেষ বল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অর্ধ শতরান করেন প্রসেনজিৎ আদক এবং দিব্যেন্দু মাহাতো। ফাইনালের সময়ে উপস্থিত ছিলেন প্রশাসনিক কর্তারা। ফাইনালে রীতিমতো হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছে দুই দল। টেনশন নিয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে দর্শকদের। লড়াইয়ে দৃষ্টিহীন পড়ুয়াদের জয় হয়েছে বলেই মেনে নিচ্ছেন সকলেই।

খেলার পর এই পড়ুয়াদের কথায়, “আসলে আমরা সবাই জিতেছি। সবাই ভালো খেলেছি। আমরাও যে ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি সেটা তো জানানো গেল।” এটাই বোধহয় এই প্রতিযোগিতার সব থেকে বড়ো সার্থকতা। পিছিয়ে থাকলেন না মেয়েরাও। ফাইনালের পর দুই ওভারের একটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেললেন নবদ্বীপের এপিসি ব্লাইন্ড স্কুল এবং হেলেন কেলার স্মৃতি বিদ্যামন্দিরের দৃষ্টিহীন ছাত্রীরা। সেই খেলাতেও জয় পেল নবদ্বীপের স্কুল।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন