Connect with us

মকর-সংক্রান্তি

মকর সংক্রান্তিতে বানান চিতৈ পিঠে

চিতৈ

ওয়েবডেস্ক : মকর সংক্রান্তির সঙ্গে পিঠেপুলির একটি অদ্ভুত যোগ রয়েছে। এই দিন ঘরে ঘরে রকমারি পিঠেপুলি পায়েস রান্না করা হয়। খাওয়া ও খাওয়ানো হয়। তা ছাড়া এক কথায়, পৌষ পার্বণ মানেই বাঙালির রান্নাঘরে খাওয়াদাওয়ার জমজমাট আয়োজন। গুড়, দুধ, নারকেল, চালের গুঁড়ো – এইসব দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের পিঠে। গোকুল পিঠে, আস্কে পিঠে, দুধপুলি, পাটিসাপটা। তেমনই একটি পিঠে হল, চিতৈ পিঠে।

কী ভাবে বানানো যায় এই পিঠে?

উপকরণ

গোবিন্দভোগ চালের গুঁড়ো – ১ কাপ
বেকিং পাউডার – ১ চা চামচ নুন – ৩/৪ চা চামচ
তেল – ২ চা চামচ
জল – প্রয়োজন মতো

প্রণালী –

সব উপকরণ এক সঙ্গে ভালো করে মেশাতে হবে। ভালো করে মেশানো হয়ে গেলে পরিমাণ মতো জল দিয়ে ওই মিশ্রণটিকে ব্যাটার বানাতে হবে। মাঝারি ঘন হবে এই ব্যাটার। ব্যাটারটি তৈরি হয়ে গেলে ৩০ মিনিট ঢেকে রাখতে হবে। এর পর একটি বাটিতে আধ কাপ জল ও দুই টেবিল চামচ সাদা তেল দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। এই মিশ্রণটি তৈরি হয়ে গেলে, ব্যাটারের ঢাকা খুলে আরও খানিকটা জল মিশিয়ে একটু পাতলা ব্যাটার তৈরি করে নিতে হবে।

এই বার একটি ছোটো আপ্পাম মেকার উনানে বসাতে হবে। আপ্পাম মেকার না থাকলে বাজারে মাটির সরাও পাওয়া যায় চিতৈ পিঠে তৈরি করার জন্য। তাও ব্যবহার করা যায়। প্রতিটা গর্তে তেল ও জলের মিশ্রণ হালকা করে ব্রাশ করে নিতে হবে। প্রতিটা গর্তে পিঠের জন্য প্রস্তুত ওই ব্যাটার দিয়ে ঢাকা দিয়ে রাখতে হবে। এই সময় আঁচ মাঝারি করে দিতে হবে।

মাঝারি আঁচে চার বা পাঁচ মিনিট রান্না হতে দিতে হবে। এর পর সরু কাঠি বা চামচের পিছন দিক দিয়ে চাড় দিয়ে পিঠেগুলো তুলে নিতে হবে। এই ভাবেই তৈরি হয়ে গেল চিতৈ পিঠে। এই পিঠে খেতে হয় ঝোলা গুড় দিয়ে।

মকর-সংক্রান্তি

দেশের কোথায় কী নামে পরিচিত মকর সংক্রান্তি?

মকরসংক্রান্তি

ওয়েবডেস্ক : মকর সংক্রান্তি এমনই একটি উৎসব যা এক এক জায়গায় এক এক নামে পালিত হয়। ভারতবর্ষের বাইরে বিভিন্ন নামে এই সংক্রান্তি পালিত হয়। শুধু বিদেশেই যে ভিন্ন নামে একই উৎসব পালিত হয় তা কিন্তু নয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায়ও এই মকর সংক্রান্তি বিভিন্ন নামে পরিচিত। 

এ বার দেখে নেওয়া যাক দেশের কোথায় কী নামে পরিচিত মকর সংক্রান্তির এই উৎসব 

পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসব অনেক নামে পরিচিত। ‘পৌষ সংক্রান্তি’, ‘পৌষপার্বণ’ বা ‘নবান্ন’।

বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন জায়গায় এই উৎসব ‘খিচড়ি পরব’ নামে খ্যাত।

উত্তর ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে একই নামে পরিচিত এই উৎসব। পঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল, জম্মুতে এই উৎসব ‘লোহরি’ নামে চালু। আবার এই অঞ্চলে একে ‘মাঘী’ উৎসবও বলা হয়।

লোহরি

কাশ্মীরে এর নাম ‘শায়েন-ক্রাত’।

রাজস্থান ও গুজরাতে এই উৎসবের নাম রাখা হয়েছে ‘উত্তরায়ণ’।

মধ্যপ্রদেশে মকর সংক্রান্তিকে বলা হয় ‘সুকরাত’।

মহারাষ্ট্রে বলা হয় ‘তিলগুল’।

তামিলনাড়ুতে এই উৎসবের নাম ‘পোঙ্গল’।

পোঙ্গল

কর্ণাটকে একে বলা হয় ‘মকর সংক্রমনা’ বা ‘ইল্লু বিল্লা’।

অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কেরলে এই উৎসব পশ্চিমবঙ্গের নামেই পরিচিত। ‘মকর সংক্রান্তি’ নামেই পরিচিত।

বিহু

পূর্ব ভারতের অসমে এই উৎসবের পরিচিতি ‘ভোগালি বিহু’ নামে।

Continue Reading

মকর-সংক্রান্তি

‘ছোটোমকরে’ শুরু হয়েছিল টুসু পাতানো, সংক্রান্তিতে ভাসান

tusu idol

মৃণাল মাহাত

“আইসছে মকর দুদিন সবুর কর/তরহা মুড়ি চিড়া জোগাড় কর” – এই টুসু গানে মত্ত ছোটোনাগপুর মালভূমির তামাম কুড়মী জনপদ। শুরু হয়েছে সেই ‘ছোটোমকরে’ টুসু পাতানোর মাধ্যমে। চলবে পোষ সংক্রান্তির টুসু ভাসান পর্যন্ত। এক সংক্রান্তি থেকে আরেক সংক্রান্তির এই যে যাত্রাপথ তার মাঝখানে প্রতি বছর ভূমিষ্ঠ হয় হাজার হাজার টুসু গান। যে গানের বেশির ভাগই দু:খ, দারিদ্র্য, প্রেম-পিরীতের রসে রঞ্জিত। সাম্প্রতিক কালে এই টুসু গান ভূমিপুত্রদের কাছে বঞ্চনা বিদ্রোহের হাতিয়ারও।

সোমবার ছিল বাঁউড়ি। জঙ্গলমহলের প্রতিটি গ্রামে এ দিন সকাল থেকে চলেছে মহিলাদের ব্যস্ততা। ভোর থেকে শুরু হয়ে গিয়েছিল ঢেঁকিতে গুঁড়ি তৈরির কাজ। শালবনীর অনিমা মাহাত, মমতা মাহাতরা বলেন, এখনকার দিনে অধিকাংশ গুঁড়ি মেশিনে তৈরি হলেও, পরব-পার্বণে ঢেঁকিতে গুঁড়ি তৈরির মজাটাই আলাদা। জঙ্গলমহলের সংস্কৃতিতে ঢেঁকি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে রয়েছে বলে লোকসংস্কৃতিবিদদের অভিমত। তাঁদের বক্তব্য, আনন্দ, উদ্দীপনার দিক থেকে টুসু উৎসব কোনো অংশেই দুর্গাপূজার থেকে কম যায় না। লালগড়ের বিশিষ্ট কুড়মী সমাজকর্মী প্রাণবল্লভ মাহাত বলেন, যে সময় শারদীয়া দুর্গাপূজা হয়, সে সময় সারা ছোটোনাগপুর মালভূমি এলাকা জুড়ে অভাবের মাস। ধান রোপনের পর অধিকাংশ আদিবাসী পরিবারে অর্থের সংকুলান হয়। তাই দুর্গাপূজার সময় জঙ্গলমহল সে ভাবে মেতে উঠতে পারে না। কিন্তু, পোষসংক্রান্তির এই টুসু মেলায় প্রতিটি বাড়ি ধানে ভরে ওঠে। তাই পরিবারের প্রত্যেকের শরীরে ওঠে নতুন কাপড়।

টুসু আসলে কী? কে ছিলেন? এই প্রশ্ন নিয়ে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম জঙ্গলমহলের বেশ কিছু বিদগ্ধ মানুষের কাছে। টুসু উৎসব সম্পর্কে প্রচলিত নানা কিংবদন্তি এই উৎসবকে আরও মহিমান্বিত করেছে। টুসুকে কাশীপুরের রাজার কন্যা মনে করা হলেও এবং মকর সংক্রান্তির দিন মুসলমান নবাবের লালসার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নদীতে আত্মবিসর্জন এর কাহিনি প্রচলিত থাকলেও, জঙ্গলমহলের গবেষকরা কেউই এই কাহিনি মানতে চাননি।

busy artist

মূর্তি তৈরিতে ব্যস্ত শিল্পী। নিজস্ব চিত্র।

প্রাক্তন অধ্যাপক ড: অনাদিনাথ কড়ইয়ার বলেছেন, টুসু হল সম্পূর্ণ ভাবে কৃষিভিত্তিক উৎসব। কার্তিক মাস থেকে যে ধানকাটা শুরু হয় শেষ হয় অগ্রহায়ণের সংক্রান্তিতে। অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তি যা জঙ্গলমহলে ‘ছোটোমকর’ নামে পরিচত।ওই দিন প্রতিটি কুড়মী পরিবারের কর্তা জমি থেকে ধানের শেষ আঁটিটিকে পুজো করে মাথায় করে নিয়ে এসে বাড়িতে স্থাপন করেন।এই অনুষ্ঠানটিকে বলা হয় ‘ডেনী মাঁই’ আনা। অনাদিবাবুর মতে, এই ‘ডেনী মাই’ হল টুসু। এই সময় প্রতিটি বাড়ি যে হেতু ফসলে টুসটুস করে ওঠে অর্থাৎ ভরে ওঠে, ওই জন্য এটা টুসু নামে পরিচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অগ্রহায়ণ মাসের সংক্রান্তি থেকে পোষমাসের সংক্রান্তি পর্যন্ত প্রতি দিন টুসুকে পুজো করা হয় নৃত্যগীতের মাধ্যমে।

হাজারিবাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক ড.বিনয় মাহাত টুসুকে শস্যের পুনর্জন্মের উৎসব বলে বর্ণনা করেছেন। বর্ষার শুরুতে মাটিতে পোঁতা বীজ থেকে নতুন শস্যের জন্ম হয়। সারা বছর চাষবাসের পর পোষমাসের শেষে সেই শস্য পূর্ণতা লাভ করে মকর সংক্রান্তিতে। টুসু উৎসব তাই আদিম মানুষের মৃত শস্যের পুনর্জীবন কামনার একটি জীবনধর্মী, সৃষ্টিধর্মী অভিনব লোকউৎসব। অনেক গবেষকের মতে, ‘তুষ’ শব্দ থেকে টুসু শব্দের উৎপত্তি। বিনয়বাবু তাঁর ‘লোকায়ত ঝাড়খণ্ড’ গ্রন্থে বলেছেন, এই তুষ মৃত ধানের প্রতীক। আর জলাশয়ে টুসু বিসর্জনের অর্থ হল মৃত শস্যকে কবর দেওয়া। তবু টুসু ভাসান শোকোৎসব নয়। বরং মৃতের অবশ্যম্ভাবী পুনর্জন্মকে ত্বরান্বিত করার জন্য আনন্দোৎসব।

আরও পড়ুন মকর উৎসবের মূল সুর ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’

টুসুর সঙ্গে মূর্তি পূজার কোনো সম্পর্ক নেই। তবু অঞ্চলভেদে বাঁকুড়া, মেদিনীপুরের কিছু এলাকায় মুর্তিপুজো হচ্ছে। টুসু উৎসব এর প্রাণকেন্দ্র পুরুলিয়াতে কোনো ধরনের মূর্তি করা হয় না। টুসুর বাহন রূপে ‘চোড়ল’ ব্যাবহার করা হয় নৃত্যগীতে। পুরুলিয়ার বিশিষ্ট গবেষক চারিয়ান মাহাতের মতে, টুসু উৎসবে সূর্যদেবতাকে পুজো করা হয়। কুড়মালী শব্দ ‘টুই’ এর অর্থ সর্বোচ্চ, আর ‘সু’ এর অর্থ সূর্য। এই সময় সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু হওয়ায় সূর্য সর্বোচ্চ স্থানে থাকে। সূর্য যে হেতু সকল শক্তির উৎস, তাই সূর্যদেবতাকে পূজো করা হয় টুসুর মাধ্যমে।

‘টুসু’ সম্পর্কে যা-ই মতবাদ প্রচলিত থাকুক, টুসু বৃহত্তর ছোটোনাগপুর মালভূমি এলাকার জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। টুসু কুড়মী জনজাতির প্রধান উৎসব হলেও, এই এলাকায় বসবাসকারী সমস্ত জাতিগোষ্ঠী এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকেন। মকরসংক্রান্তিতে স্নানের পর ধনী, গরিব প্রত্যেকের শরীরে উঠবে নতুন পোশাক। ওই দিন পুরুষরা চলে যায় নিকটবর্তী ‘পরকুল’ মেলায়। মহিলারা নিকটবর্তী নদী বা পুকুরে চলে যান টুসু বিসর্জনে। বাস্তবিকই টুসু হয়ে উঠেছে জঙ্গলমহলের প্রাণের উৎসব।

Continue Reading

মকর-সংক্রান্তি

মকর উৎসবের মূল সুর ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’

bath in ganges

শম্ভু সেন

সাধুসন্ত, পুণ্যকামী মানুষজন ভিড় জমিয়েছেন গঙ্গাসাগরে। রাত পোহালেই মকর সংক্রান্তি। চলবে সাগরসঙ্গমে পুণ্যস্নানে। শুধু গঙ্গাসাগর কেন, কলকাতা, হরিদ্বার, প্রয়াগ, বারাণসী-সহ গঙ্গাতীরবর্তী সব শহরেই চলবে এই স্নান। লাখ লাখ মানুষ গঙ্গাস্নান করে পুণ্য অর্জন করবেন। মকর সংক্রান্তিতে নাকি ‘গঙ্গাস্নান’ করতে হয়, ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের এই বিধান। কিন্তু যেখানে গঙ্গা নেই, সেখানে? সেখানকার মানুষ কি এই পুণ্য থেকে বঞ্চিত থাকবেন? না, তাঁদেরও উপায় আছে। নিয়ম আছে, নিয়মের ব্যতিক্রমও আছে। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রেরই বিধান, গঙ্গা নেই তো কী! স্থানীয় যে কোনো নদী, খাল এমনকি জলাশয়কে গঙ্গা ভেবে নিয়ে ডুব দাও। পুণ্যার্জন হয়ে যাবে। তাই ডুব দে রে মন গঙ্গা বলে।

মকর সংক্রান্তি কী? সাধারণত ১৪ জানুয়ারি বা তার আশেপাশের কোনো একটি দিনে এই তিথি আসে। বঙ্গাব্দ অনুসারে পৌষ মাসের শেষ দিনটিতে মকর সংক্রান্তি পালিত হয়। রাশিচক্রের বিচারে সূর্য এই তিথিটিতে মকর রাশিতে প্রবেশ করে। আসলে এই দিনটির সঙ্গে আরও অনেক কিছু জড়িয়ে আছে। এই সময়েই ঘরে ঘরে নতুন ফসল ওঠে। এই সময় থেকেই সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু হয়। শীতের জড়তা কাটতে শুরু করে।

bhogali bihu celebration

ভোগালি বিহু উদযাপন।

দেশ জুড়ে নানা ভাবে নানা নামে মকর সংক্রান্তি উৎসব পালিত হয়। আরাধনা করা হয় কোথাও লক্ষ্মীর, কোথাও বা সূর্যের, কোথাও বা পূজিত হন সরস্বতী। কিন্তু পূজা বা প্রসাদের উপকরণ মূলত এক – নতুন ফসল। আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসব পৌষ সংক্রান্তি, পৌষপার্বণ বা নবান্ন। তামিলনাড়ুতে এই উৎসব ‘পোঙ্গল’ নামে পরিচিত। কর্নাটকে একে ‘মকর সংক্রমনা’ বা ‘ইল্লু বিল্লা’ বলা হয়। অন্ধ্রে আর কেরলে এই উৎসব মকর সংক্রান্তি নামেই পরিচিত। রাজস্থান ও গুজরাতে এই উৎসবের নাম ‘উত্তরায়ণ’, মহারাষ্ট্রে ‘তিলগুল’, মধ্যপ্রদেশে সুকরাত, কাশ্মীরে শায়েন-ক্রাত। উত্তর ভারতের পঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল, জম্মুতে এই উৎসব ‘লোহরি’ নামে চালু। ‘মাঘী’ উৎসবও বলা হয়। বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন জায়গায় এই উৎসব ‘খিচড়ি পরব’। পূর্ব ভারতের অসমে এই উৎসবের পরিচিতি ‘ভোগালি বিহু’ নামে।

বাঙালির কাছে এই উৎসব মূলত নতুন ফসলের। গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে ওঠে নতুন ধান, নতুন অন্ন। তাই এই উৎসব বাঙালির কাছে ‘নবান্ন’। পৌষ সংক্রান্তি শস্যোৎসব। খেতের পাকা ধান প্রথম ঘরে ওঠা উপলক্ষে পালিত হয় এই উৎসব। পাকা ধানের শিষ এনে নির্দিষ্ট কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। দু’-তিনটি খড় এক সঙ্গে লম্বা করে পাকিয়ে তার সঙ্গে ধানের শিষ, মুলোর ফুল, সরষে ফুল, আমপাতা ইত্যাদি বেঁধে ‘আউনি বাউনি’ তৈরি করা হয়। এই ‘আউনি বাউনি’ ধানের গোলা, খড়ের চাল, ঢেঁকি, বাক্স-প্যাঁটরায় গুঁজে দেওয়া হয়।

patisapta

বাংলার পাটিসাপটা।

বাংলায় পৌষপার্বণের প্রধান অঙ্গ হল পিঠে খাওয়া। এই সময়ে নতুন ধানের পাশাপাশি বাংলার গ্রামে গ্রামে খেজুর গাছে রস আসে, তৈরি হয় নতুন গুড়, খেজুর গুড়। তাই নতুন চালের গুঁড়ো, নতুন গুড়, নারকেল আর দুধ দিয়ে তৈরি করা হয় নানা ধরনের পিঠে। তাই পৌষপার্বণের আরেক নাম পিঠেপার্বণ।

অসমেও এই সময়টা নতুন ধানের। তাই ‘ভোগালি বিহু’তে যেমন আছে উপবাস, তেমনই আছে ভোজ, অবশ্যই যার প্রধান অঙ্গ নতুন ধান।

বাংলাদেশে, বিশেষ করে ঢাকায়, পৌষ সংক্রান্তির দিন পালিত হয় সাকরাইন উৎসব। এ দিন শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুড়ি ওড়ানো হয়। অবশ্য দুই বাংলার বহু জায়গাতেই পৌষ সংক্রান্তির দিন ঘুড়ি ওড়ানোর রেওয়াজ আছে।

kite festival

ঘুড়ি উৎসব।

ঘুড়ি ওড়ানো কিন্তু গুজরাতে মকর উৎসবের একটা প্রধান অঙ্গ। এখানে এই উৎসবের নাম ‘উত্তরায়ণ’। এই উৎসবের ব্যাপক ধুম। এই উৎসব আদতে সূর্যদেবের আরাধনা। মানুষ ঘুড়িকে প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করে সূর্যদেবতার কাছে নিজেদের আকুতি পৌঁছে দেয়। গুজরাতে ‘উত্তরায়ণ’ উপলক্ষে দু’দিন ছুটি থাকে। রাজ্যের বিভিন্ন শহরে আন্তর্জাতিক ঘুড়ি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

তামিলনাড়ুর পোঙ্গল উৎসবেও সূর্যের আরাধনা করা হয়। কৃষিকাজে শক্তি সরবরাহ করেন সূর্যদেব। তাই তাঁর আরাধনা। চার দিনের উৎসব। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে কখনও ১৩ জানুয়ারি থেকে ১৬ জানুয়ারি কখনও বা ১৪ থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এই উৎসব চলে। আসলে তামিল মাস মারগাঝির শেষ দিন থেকে পরের মাস থাই-এর তৃতীয় দিন, এই চার দিন ধরে চলে উৎসব। তামিল ক্যালেন্ডারের দশম মাস ‘থাই’। আর ‘পোঙ্গল’ মানে উৎসব। অবশ্য ‘পোঙ্গল’ শব্দের যথাযথ অর্থ হল ‘প্রাচুর্য’ বা ‘উপচে পড়া’। ‘পোঙ্গল’ একটি খাওয়ার পদও — চাল, মুগ ডাল, দুধ, ছোটো এলাচ, কিশমিশ, তালের গুড় দিয়ে তৈরি মিষ্টি পদ। সুসজ্জিত রঙিন মাটির পাত্রে সূর্যালোকে খোলা উঠোনে ‘পোঙ্গল’ তৈরি করে সূর্যকে নিবেদন করে ওই দিন খাওয়া হয়।

চারদিনব্যাপী উৎসবের প্রথম দিনকে বলা হয় ‘ভোগী’। পঞ্জাবের ‘লোহরি’ বা অসমের ‘ভোগালি বিহুর’ মতোই ওই দিন ভোরে কাঠকুটো জড়ো করে আগুন জ্বালিয়ে সেই আগুনে পুরোনো বাতিল জিনিসপত্র আহুতি দেওয়া হয়। জীর্ণ পুরোনোকে বিসর্জন দিয়ে নতুনকে আহ্বান। বাড়ি রঙ করা হয়, সাজানো হয়। অন্ধ্রেও এই দিন ওই উৎসব পালন করা হয়, নাম ‘ভোগী পাল্লু’।

দ্বিতীয় দিন পালিত হয় মূল উৎসব ‘থাই পোঙ্গল’। ওই দিন একটি পাত্রে দুধ ফোটানো হয়। দুধ যখন উথলে ওঠে তখন তাতে নতুন চাল ও অন্যান্য সামগ্রী দেওয়া হয়। সবাই তখন শাঁখ বাজিয়ে ‘পোঙ্গালো পোঙ্গল’ বলে চিৎকার করে ওঠে। সবাই বলে ওঠে ‘থাই পিরান্ধাল ভাড়ি পিরাক্কুম’ (থাই মাসের সূচনায় নতুন সুযোগসুবিধার পথ প্রশস্ত হোক)। এ বার বড়া, মুরুক্কু আর পায়সমের সঙ্গে সেই ‘পোঙ্গল’ পদ বিতরণ করা হয়। কলাপাতা আর আম্রপল্লব দিয়ে ঘরদোর সাজানো হয়। কোলম তথা আলপনা আঁকা হয় প্রতিটি বাড়িতে।

pongal

পোঙ্গল।

তৃতীয় দিন পালিত হয় ‘মাতু পোঙ্গল’। এই দিনে স্নান করে ঘরের গবাদি পশুদের মালা পরানো হয়। শিং আঁকা হয়, মাথায় সিঁদুর, তেল, কুমকুম পরানো হয়। খাওয়ানো হয় পোঙ্গল, তালের গুড়, মধু আর কলা। সন্ধ্যায় গণেশের পূজা করা হয়। এই দিনেই রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী ‘জাল্লিক্কাট্টু’ তথা ষাঁড়-মানুষে লড়াই হয়।

শেষ দিনে ‘কানুম পোঙ্গল’। এটা অনেকটা বাঙালির বিজয়ার মতো। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হয়, শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, উপহার বিনিময় হয়, খাওয়াদাওয়া হয়।

অন্ধ্রে এই দিনটি পালিত হয় ‘মুক্কুনুমা’ নামে। এ দিন গোধনের পূজা করা হয়। আমিষভোজীরা এই দিনটি সাড়ম্বরে পালন করে। কারণ মকর উৎসবের প্রথম তিনটি দিন নিরামিষ দিবস, তাই শেষ দিনে আমিষ খাওয়ার রেওয়াজ।

এই শীতেই ওঠে তিলের ফসল। আর আখের গুড়ও মেলে প্রচুর। তাই ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মকর সংক্রান্তিতে তিলের নাড়ু খাওয়া রেওয়াজ। গুড় দিয়ে তৈরি এই নাড়ু বিলি করাও হয় এই উৎসবে। মহারাষ্ট্রে তো তাই এই উৎসবের নাম ‘তিলগুল’। বাড়িতে অতিথিদের তিলের নাড়ু দিয়ে বলা হয় ‘তিলগুল ঘায়া, গোড় গোড় বলা’ (তিলনাড়ু খাও, আর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলো’)।

nabanna

নবান্ন।

তবে মজার কথা হল, পশ্চিমবঙ্গ এবং কেরলে তিল বা আখ, কোনোটাই বিশেষ হয় না। এখানে হয় নারকেল। তাই উৎসবে-পার্বণে নারকেল নাড়ু খাওয়ার রেওয়াজ এই দুই রাজ্যে, মকরের উৎসবেও তার ব্যতিক্রম হয় না। হাজার যোজন দূরত্বে থাকা আর্দ্র জলবায়ুর দুই রাজ্যের মধ্যে কেমন মিল খাদ্যাভ্যাসে ! গোটা উত্তর ভারতে এই সময় তিল, গুড়, দুধের মিষ্টির সঙ্গে চাল, ডাল আর সবজি দিয়ে খিচুড়ি খাওয়া হয়। তাই সেখানে মকর উৎসব হল ‘খিচড়ি পরব’। এই সংক্রান্তিতে উৎসব পালন করে ভারতের জনজাতিরা। পশ্চিমবঙ্গের সাঁওতাল আদিবাসী অধ্যুষিত পুরুলিয়া-বাঁকুড়া-বীরভূম-পশ্চিম বর্ধমান-পশ্চিম মেদিনীপুরে পালিত হয় ‘টুসু উৎসব’।

ভারতের সীমান্ত ছাড়িয়ে অন্যত্রও মকর সংক্রান্তি পালিত হয়। হিমালয়ের কোলে নেপালে পালিত হয় ‘মাঘে’। এক সময় ভারতীয় সংস্কৃতির বিস্তার ঘটেছিল পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে। সেই ঐতিহ্যের ধারা আজও বহমান। তাই মকর সংক্রান্তিতে তাইল্যান্ডে পালিত হয় ‘সোংক্রান’, কাম্বোডিয়ায় ‘মোহা সোংক্রান’, মায়ানমারে ‘থিংইয়ান’ আর লাওসে উদযাপিত হয় ‘পি মা লো’ উৎসব। এ ছাড়াও যে সব দেশে ভারতীয়রা চালান হয়েছেন বা সাগরপাড়ি দিয়েছেন, যে সব দেশে ভারতীয়রা সংখ্যায় বেশ বড়ো গোষ্ঠী, সেখানেই পালিত হয় এই মকর সংক্রান্তির উৎসব।

ভারত বহুত্ববাদী দেশ। ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ই যে এ দেশের মূল মন্ত্র, মকরের উৎসবেই তার প্রমাণ ও প্রকাশ।

 

Continue Reading
Advertisement
দেশ10 mins ago

‘করোনা ছড়াতে পারেন পর্যটকরা,’ সোমবার খুলছে না তাজমহল

দেশ7 hours ago

কোভিড থেকে সুস্থ হলেন এক শতায়ু দিল্লিবাসী, যিনি স্প্যানিশ ফ্লু-এর সাক্ষী

earthquake
দেশ11 hours ago

কেঁপেই চলেছে দেশের মাটি, এ বার ফের কচ্ছে, মিজোরামে

রাজ্য12 hours ago

রাজ্যে এক দিনে আক্রান্তের সংখ্যায় নতুন রেকর্ড! তবে সক্রিয় রোগীর চেয়ে অনেক এগিয়ে সুস্থ হওয়ার সংখ্যা

দেশ13 hours ago

গাজিয়াবাদের কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ, মৃত ৭

দেশ13 hours ago

২০২১-এর আগে নয় করোনা ভ্যাকসিন? প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেও সময়সীমা মুছে দিল বিজ্ঞানমন্ত্রক!

দেশ15 hours ago

কোভিড-১৯: ২১টি রাজ্যে সুস্থতার হার জাতীয় হারের তুলনায় বেশি

বিনোদন15 hours ago

করোনা আবহে কী ভাবে হল ‘বিবাহ বার্ষিকী’র শুটিং? দেখে নিন অভিনেত্রী দর্শনা বণিকের এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার

দেশ22 hours ago

কোভিড আপডেট: নতুন করে আক্রান্ত ২৪৮৫০, সুস্থ ৯৩৮১

কলকাতা2 days ago

কলকাতায় অতিসংক্রমিত ১৬টি অঞ্চলকে পুরোপুরি সিল করে দেওয়ার প্রস্তুতি

দেশ3 days ago

দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যায় নতুন রেকর্ড, সুস্থতাতেও রেকর্ড

দেশ3 days ago

‘সবার টিকা লাগবে না, আর পাঁচটা রোগের মতোই চলে যাবে করোনা’, আশ্বাস অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানীর

wfh
ঘরদোর3 days ago

ওয়ার্ক ফ্রম হোম করছেন? কাজের গুণমান বাড়াতে এই পরামর্শ মেনে চলুন

fat
শরীরস্বাস্থ্য3 days ago

কোমরের পেছনের মেদ কমান এই ব্যায়ামগুলির সাহায্যে

thunderstorm
রাজ্য3 days ago

কলকাতা-সহ গোটা দক্ষিণবঙ্গে সন্ধ্যার মধ্যে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা

রাজ্য2 days ago

করোনা-আক্রান্তের সংখ্যায় কলকাতাকে পেছনে ফেলে দিল হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু

কেনাকাটা

কেনাকাটা16 hours ago

হ্যান্ড স্যানিটাইজারে ৩১ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিচ্ছে অ্যামাজন

অনলাইনে খুচরো বিক্রেতা অ্যামাজন ক্রেতার চাহিদার কথা মাথায় রেখে ঢেলে সাজিয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সম্ভার।

DIY DIY
কেনাকাটা5 days ago

সময় কাটছে না? ঘরে বসে এই সমস্ত সামগ্রী দিয়ে করুন ডিআইওয়াই আইটেম

খবর অনলাইন ডেস্ক :  এক ঘেয়ে সময় কাটছে না? ঘরে বসে করতে পারেন ডিআইওয়াই অর্থাৎ ডু ইট ইওরসেলফ। বাড়িতে পড়ে...

smartphone smartphone
কেনাকাটা1 week ago

লকডাউনের মধ্যে ফোন খারাপ? রইল ৫ হাজারের মধ্যে স্মার্টফোনের হদিশ

খবরঅনলাইন ডেস্ক : করোনা সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে ঘরে বসে যতটা কাজ সারা যায় ততটাই ভালো। তাই মোবাইল ফোন খারাপ...

কেনাকাটা1 week ago

১০টি ওয়াশেবল মাস্ক দেখে নিন

খবর অনলাইন ডেস্ক : বাইরে বেরোচ্ছেন। মাস্ক অবশ্যই ব্যবহার করুন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের হাত থেকে বাঁচতে তিন স্তর বিশিষ্ট মাস্ক...

নজরে