পাপিয়া মিত্র:

আমরা সবাই প্রতিভারে করে পণ্য/ ভাবালু আত্মকরুণায় আছি মগ্ন,/ আমাদের পাপের নিজের জীবনে জীর্ণ/ করলে, যামিনী রায়।/ …পুঁথি ফেলে তুমি তাকালে আপন গোপন মর্মতলে,/ ফিরে গেলে তুমি মাটিতে, আকাশে, জলে।/ স্বপ্ন লালসে অলস আমরা তোমার পুণ্যবলে/ ধন্য যামিনী রায়। –- বুদ্ধদেব বসু।

টানা চোখের গ্রামীণ মনীষা তিনি। শতাব্দী ঊর্ধ্ব বিশ্বচিত্রকলার ইতিহাসে পরিচিত এক লোকচিত্রশিল্পী তিনি। গ্রাম্য নয়, গ্রাম-অনুগত এক আবহমান সারল্য চেতনা যাঁর, তিনি যামিনী রায়। যে সময়ে তিনি শিল্পচর্চায় ব্রতী হয়েছিলেন তখন পরাধীন ভারতে এক দিকে ইউরোপীয় আকাদেমিক শৈলী ও অন্য দিকে দেশীয় পুরাণ ও মহাকাব্যিক ‘মিথ’-এর প্রবাহমান ধারা। সেই দু’টি ধারায় নিজেকে ভাসিয়ে না দিয়ে যামিনী রায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন দৈনন্দিন গ্রামদর্শনে। বাঁকুড়া জেলার বেলেতোড় গ্রামের মুক্তমন কিশোর অকাতরে প্রত্যক্ষ করেছিলেন পটুয়াপাড়ার হাতের কাজ, আলপনার নকশা আর গেরস্থালির কাঁথার বুনন। আর রঙ? হিসেবে ভুল করেননি যামিনীবাবু। প্রকৃতির অজস্র উপাদানকে কাজে লাগিয়েছিলেন রঙের উৎস হিসেবে।

মায়ের কোলে গণেশ, কলস কাঁখে মেয়েরা, কেষ্টঠাকুর আর গোপিনীরা, মাছলোভী বিড়াল, গরুবাছুর, ছেলে কোলে মা — সরল মনের সহজ ছবি উজ্জ্বল হয়ে উঠত নানা রঙের উপস্থিতিতে। তবে যামিনী রায়ের চিত্রচর্চার শুরুটা ছিল বিদেশি টানেই। উনিশ শতকের ইউরোপীয় ছবির আদলে প্রকৃতি, শহর, ইম্প্রেশনিস্ট, পোস্ট ইম্প্রেশনিস্টদের মতো করে অলিগলি, বাড়ি, আকাশ, নদী-নৌকা — অঙ্কনশৈলীটাই বিলিতি মুডের। ১৯২১ থেকে ১৯২৪-এর মধ্যকার সময়ে তিনি নতুন এক নিরীক্ষার জন্য সাঁওতাল নাচকে বিষয় আকারে বেছে নেন। তার আঁকার পদ্ধতি ছিল বেঙ্গল স্কুল ও প্রচলিত পাশ্চাত্য ধারার বিরুদ্ধে এক নতুন প্রতিক্রিয়া। তাঁর এই টান-বদলে তিনটি বিষয় স্থান পায়। প্রথমত, গ্রামজীবনের সরলতাকে তুলে ধরা, দ্বিতীয়ত, সমাজের বিস্তৃত অংশের মধ্যে চিত্রকলাকে প্রবেশ করানো, তৃতীয়ত, ভারতীয় চিত্রকলাকে নিজস্ব পরিচিতি দেওয়া। তাই সাঁওতাল সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রাথমিক ভাবে পরীক্ষা চালান। নিজস্ব সংস্কৃতি থেকেই আঁকিঝুকির বিষয়বস্তু ও শিল্পরীতি খোঁজা উচিত — এ উপলব্ধি যামিনী রায়ের মধ্যে কাজ করে। পরে ধীরে ধীরে কালীঘাটের পট দ্বারা প্রভাবিত হন। পটুয়াদের মতো তিনি মেটে রঙের ছবি আঁকতেন। তিনি নিজেকে পটশিল্পী হিসেবে পরিচয় দিতেন।

আজ মঙ্গলবার তাঁর ১৩০তম জন্মবার্ষিকী। ১১ এপ্রিল, ১৮৮৭। বেলিয়াতোড় (আদর করে লোকে বলে বেলেতোড়) গ্রামের এক জমিদার পরিবারে জন্ম যামিনী রায়ের। ভারতে আধুনিক চিত্রকলার অগ্রপথিক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রিয় শিষ্য ছিলেন তিনি। তাঁর বাবার নাম রামতরণ রায়। যামিনী রায়ের শৈশব-কৈশোর কাটে বাঁকুড়ার গ্রামে। মাটির মূর্তির জন্য বাঁকুড়ারও খ্যাতি আছে। শিশু যামিনী নিজের গ্রামের মূর্তিশিল্পীদের কাজ মন দিয়ে দেখতেন। স্কুলের পড়া শেষে ১৯০৩ সালে কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে প্রচলিত ধ্রুপদী অঙ্কনরীতি ও তৈলচিত্রে শিক্ষালাভ করেন। ১৯০৮ সালে ফাইন আর্টে ডিপ্লোমা লাভ করেন। পড়াশোনা চলে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত। ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন মেধাবী। ছাত্রাবস্থাতেই তার আঁকা ছবি ক্লাসে বাঁধিয়ে টাঙিয়ে রাখা হত।

একটিই ছবি দেখি, রঙের রেখার দুর্নিবার একটি বিস্তার/মুগ্ধ হয়ে দেখি এই কয়দিন, অথচ যামিনীদার/প্রত্যহের আসনের এ শুধু একটি নির্মাণ একটি প্রকাশ/হাজার হাজার রূপধ্যানের মালার একটি পলক/যেখানে অন্তত গোটা দেশ আর কাল, একখানি আবির্ভাব/ — ১৯৫৯-এর ২১ জুন কবি বিষ্ণু দে ‘তাই তো তোমাকে চাই’ কবিতায় শিল্পী যামিনী রায়কে এঁকেছেন এমনই শব্দচয়নে। আপাত সরল চলনের ছবিতে যে গভীর কালচেতনা ও দেশজ-ভূগোলের প্রত্নখনন লুকিয়ে আছে, তা এই ক’টি পঙক্তিতে প্রকাশিত।

তিরিশের দশকের শেষে নন্দলাল বসু কলাভবনের এক সভায় রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে মুখে মুখে আলোচনা করছিলেন। সেই সময় এমন করেই আলোচনা মুখে মুখে ফিরত। একজন আধুনিক শিল্পী হিসেবে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা বিষয়ে লিখিত ভাবে প্রথম প্রতিবেদন রেখেছিলেন বোধকরি যামিনী রায়। এই লেখা বুদ্ধদেব বসু-সম্পাদিত ‘কবিতা পত্রিকা’র রবীন্দ্র সংখ্যায় (আষাঢ়, ১৩৪৮) প্রকাশিত হয়। কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথের ছবি’ শীর্ষক যামিনী রায়ের রচনাটি পড়ে ‘বড় আনন্দ’ পেয়েছিলেন স্বয়ং কবি, চিঠি লিখে যামিনীকে জানিয়েছিলেন সে-কথা। ২৫ মে, ১৯৪১ তারিখের সেই চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “তোমাদের মতো গুণীর সাক্ষ্য আমার পক্ষে পরম আশ্বাসের বিষয়।… আমার স্বদেশের লোকেরা আমার চিত্রশিল্পকে যে ক্ষীণভাবে প্রশংসার আভাস দিয়ে থাকেন আমি সেজন্য তাদের দোষ দিই নে। আমি জানি চিত্র দর্শনের যে-অভিজ্ঞতা থাকলে নিজের বিচারশক্তিকে কর্তৃত্বের সঙ্গে প্রচার করা যায়, আমাদের দেশে তার কোনো ভূমিকাই হয়নি। সুতরাং চিত্রসৃষ্টির গূঢ় তাৎপর্য বুঝতে পারে না বলেই মুরুব্বিয়ানা করে সমালোচকের আসন বিনা বিতর্কে অধিকার করে বসে। সেজন্য এদেশে আমাদের রচনা অনেক দিন পর্যন্ত অপরিচিত থাকবে। আমাদের পরিচয় জনতার বাইরে, তোমাদের নিভৃত অন্তরের মধ্যে। আমার সৌভাগ্য, বিদায় নেবার পূর্বেই নানা সংশয় এবং অবজ্ঞার ভিতরে আমি সেই স্বীকৃতি লাভ করে যেতে পারলুম, এর চেয়ে পুরস্কার এই আবৃতদৃষ্টির দেশে আর কিছু হতে পারে না।”

পদ্মভূষণপ্রাপ্ত (১৯৫৪) শিল্পী ১৯৫৬ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি-লিট ডিগ্রি লাভ করেন। রাধাকৃষ্ণ, নারী, সাঁওতাল মা ও ছেলে কিংবা নৃত্যরতা নারী, কৃষ্ণ ও গোপিনী, চাষির মুখ, পূজারিণী মেয়ে, কীর্তন, বাউল, যিশুখ্রিস্ট সহ নানা লোকাচার ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত বিষয় নিয়ে ছবি এঁকেছেন। সেই সব ছবি এঁকেছেন যেখানে মাটি আর নাড়ির যোগ আছে। যামিনী রায়ের ছবি আদ্যন্ত ভারতীয় কৃষিনির্ভর সংস্কৃতির শিকড় থেকে উঠে এসেছে। সেখানে যন্ত্রজীবনের কোলাহল নেই। নগরজীবনের জটিলতা নেই, আছে মাটির গন্ধ, অপার শান্তি, বিমল আনন্দ। তিনি ছিলেন এই শহরের গ্রামের প্রতিনিধি।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here