পাপিয়া মিত্র

দোতলার হলঘর, সামনে লম্বা বারান্দা। ঘরের ভেতরে এক পাশে নিচু তক্তপোষ, সাদা চাদর পাতা। তার ওপরে বসে এক ঋষি। সামনে ছোটো একটি ডেস্ক, সেখানে ছড়িয়ে কিছু কাগজ, হরেক ধরনের রঙ পেনসিল। এক মনে তিনি কী যেন লিখে চলেছেন আর অস্ফুটে কিছু বলছেন। ঘরে আরও জনা আটেক মানুষ, কোণে অনুপম এক অরগ্যান। রথী ঠাকুরের ইঙ্গিতে অরগ্যানটিতে বসলেন ১৭ বছরের যুবক।

সেই ঋষিকবির সামনে শুরু হল কবির বাণী নিজের সুরে গাওয়া। কবি চোখ বুজে রয়েছেন, ঠোঁট দু’টি সামান্য নড়ছে। ভীত কন্ঠে গান চলছে, নোনাজলে কপাল গাল ভেসে যাচ্ছে। এত জল তবু গলা শুকিয়ে কাঠ। কবি আরও বেশি ধ্যানমগ্ন। এই বার ঘর ফাঁকা, রয়েছেন মাত্র রথীন্দ্রনাথ ও বতীন্দ্রনাথ। গান শেষে উঠে দাঁড়ানোর শক্তি রইল না। কোনো ক্রমে পাশের দরজা দিয়ে সোজা নীচে নেমে দ্বারকানাথ ঠাকুরের গলি বেয়ে চিৎপুর পার হয়ে সোজা নিজের ঘরে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পরা ওই ছায়া’ কবিতাটিতে সুর দেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। গানটি ব্যবহার করলেন ‘মুক্তি’ ছবিতে। এবং কবিকে প্রথম দিন এই গানটি শোনানোর সেই ঘটনা তো তত দিনে ইতিহাস। তাই গান ও ‘মুক্তি’র (তখনও অবশ্য এই নামকরণ হয়নি) চিত্রনাট্য নিয়ে পঙ্কজকুমার আবার গেলেন কবির কাছে। চিত্রনাট্য শোনার পরে কবি বললেন, “পঙ্কজ তোমাদের ছবির শুরুতেই দ্বার মুক্ত। তোমাদের কাহিনীর মূল চরিত্রটি যেন কীসের থেকে মুক্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে।” এ সব শুনে পরিচালক প্রমথেশ বড়ুয়া ছবিটিতে কবির মুখের শব্দ নিয়ে নামকরণ করলেন ‘মুক্তি’। এবং তাতে থাকল কবির পছন্দের ‘সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে’ গানটিও। ১৯৩৭-এ মুক্তিপ্রাপ্ত ওই ছায়াচিত্রে পঙ্কজ চারটি রবীন্দ্রসংগীত ব্যবহার করলেন — ‘দিনের শেষে’, ‘আমি কান পেতে রই’, ‘সবার রঙে রঙ মেশাতে হবে’ ও ‘তার বিদায় বেলার মালাখানি’। প্রথম দু’টি গান নিজে ও পরের দু’টি ছবির নায়িকা কাননদেবী গাইলেন।

এ প্রসঙ্গে সংগীতশিক্ষক পঙ্কজকুমার মল্লিক সম্পর্কে কাননদেবী সুন্দর একটি কথা বলেছেন, “রবীন্দ্রসংগীত আমি আগেও গেয়েছি, কিন্তু তা ছিল রেল লাইনের ওপর দিয়ে সন্তর্পণে হাঁটা। সহজ ভাবে কী ভাবে প্রাণ ঢেলে গাইতে হয় তা পঙ্কজবাবুর কাছে শিখলাম।”

রবীন্দ্রনাথের গানের ঐশ্বর্য ও ভঙ্গির সঙ্গে সাধারণ বাঙালির প্রাথমিক পরিচয় যাঁর হাত ধরে তিনি পঙ্কজকুমার মল্লিক। সাল নয়, মাস-দিনের নৈকট্যে কবির থেকে মাত্র দু’দিনের ছোটো মনে করতেন নিজেকে এবং সেই সুলভ আত্মীয়তাবোধে নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে করতেন। এ হেন বালকসুলভ জাতকটি পড়লেন ১১৩-য়। জন্ম ১০ মে, ১৯০৫-এ। উত্তর কলকাতার মানিকতলার কাছে চালতাবাগান অঞ্চলে। পিতা মণিমোহন মল্লিক ও মা মনমোহিনী মল্লিক।

গায়ক, সুরকার, অভিনেতা ও শিক্ষক – এই চার সমন্বয়ের মানুষটির ছোটোবেলা থেকেই হারমোনিয়ামের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল। সেটি তাঁর মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর মেজোজামাইবাবু। পাড়ার কাছেই থাকতেন ছোটোকাকার বন্ধু শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষ। তখন প্রথম মহাযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। অন্যত্র চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য বাড়ির চাবি মা মনমোহিনীদেবীর কাছে রেখে গিয়েছিলেন শৈলেনবাবু। এক দিন হারমোনিয়ামের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে ঘুরতে মনে পড়ে যায় শৈলেনকাকার কথা। মুশকিল আসান হয়ে এগিয়ে আসেন পিসিমা। বন্ধ ঘরে, অজ্ঞ আঙুলের নিরন্তর ছোঁয়ায় হারমোনিয়ামে সুর উঠল। ১৯২২। রবীন্দ্রনাথের গান শেখার উৎস পঙ্কজকুমার  খুঁজে পেলেন সেই বন্ধ ঘরে।

দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে প্রথম শেখা রবীন্দ্রসংগীত ‘হেরি অহরহ তোমারি বিরহ ভুবনে ভুবনে রাজে হে’। রবিঠাকুরের গান কী ভাবে আয়ত্ত করতে হয় সেটি শিখেছিলেন ওই দিনুঠাকুরের কাছে। ক্ষেত্রমোহন সঙ্গীত বিদ্যালয় থেকে তাঁর সঙ্গীত শিক্ষা শুরু, সেখানে শিখলেন ধ্রুপদ ও রাগসঙ্গীত। ভেসে যাওয়া সুরের মতো তাঁর অবগাহন রবিসুরে। প্রথম রেকর্ড বের হল ভিয়ালোফোন কোম্পানি থেকে ১৯২৬-এ। রেকর্ডের এক দিকে ছিল বাণীকুমারের লেখা ‘নেমেছে আজ নবীন বাদল’ আর অন্য পিঠে সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের ‘আমারে ভালোবেসে’। গান দু’টির সুর দিয়েছিলেন পঙ্কজকুমার নিজে। তাঁর গীত রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডের ব্যাপ্তি ১৯২৯ থেকে ১৯৬১। তাঁর প্রথম রেকর্ড ‘প্রলয় নাচন নাচলে যখন’ ও শেষ রেকর্ড ‘হে মোর দেবতা’, ‘যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি’, ‘বাহির পথে বিবাগী হিয়া’ ও ‘বাহিরে ভুল হানবে যখন’।

তবে এই সুরের মূর্ছনা ছড়িয়ে দেওয়ার আগে সলতে পাকানোর কাজটি বড়ো মজার। সেপ্টেম্বরের সন্ধ্যা, কলকাতা ভাসছে। বালক কবির আনন্দ হতে পারে অঘোর মাস্টারমশাই পড়াতে আসতে পারবেন না ভেবে। কিন্তু মালকোঁচা-মারা ধুতি-শার্ট পরে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের মোড়ের কাছাকাছি এসে আর এগোতে পারলেন না পঙ্কজকুমার। জায়গা নিলেন এক ডাক্তারখানার বারান্দায়। অবিরাম বরষনে গান ধরলেন ‘এমন দিনে তাঁরে বলা যায়’। বেরিয়ে এলেন ডাক্তার রামস্বামী আয়েঙ্গার। নিজের ঘরে বসিয়ে আরও দু’টি গান শুনে বলে উঠেছিলেন, “ডু ইউ লাইক টু ব্রডকাস্ট?”

বড়ো ঘরটিতে সারি সারি মাদুর পাতা, একটি মাইক ও নানা বাদ্যযন্ত্র। সে দিন পঙ্কজ মল্লিকের গান ‘এমন দিনে তাঁরে বলা যায়’ ও ‘একদা তুমি প্রিয়ে’ দু’টি সম্প্রচারিত হয়েছিল, দিনটা ছিল ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯২৭। এবং ওই দিন থেকে বেতারকেন্দ্রের সঙ্গে নাড়া বাঁধা হয়ে গেল। যুক্ত ছিলেন ১৯৭৫ পর্যন্ত। বেশ কিছু দিন পর থেকে শুরু হয়ে গেল ‘সংগীত শিক্ষার আসর’, পরিচালনায় পঙ্কজকুমার মল্লিক। কলকাতা বেতারকেন্দ্র তখন ছ’মাসের শিশু। দেখভালের দায়িত্বে আছেন নৃপেন মজুমদার, সংগীতে রাইচাঁদ বড়াল, পঙ্কজকুমার মল্লিক। বার্তা বিভাগে রাজেন সেন, ‘গল্পদাদুর আসর’ পরিচালনা করেন যোগেন বসু। কয়েক দিন পরে গীতিকার বাণীকুমার ও বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র যোগ দিলেন। এর পরে বেতারের পক্ষ থেকে ১৯৩২-এ এক ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হল ‘মহিষাসুরমর্দিনী’, যার সুরস্রষ্ঠা হিসেবে যতদিন বাঙালি থাকবে ততদিন পঙ্কজ মল্লিকের নাম এক সঙ্গে উচ্চারিত হবে।

তবে শুধু গান নিয়েই জীবন কাটাননি পঙ্কজ। গানে গাওয়ার পাশাপাশি সংগীত পরিচালনা ও অভিনয় করেছেন। ১৯৪৪-এ কে এল সায়গলের সঙ্গে জুটি বেঁধে তৈরি করলেন ‘মেরি বহেন’ সিনেমার অবিস্মরণীয় গান। ১৯৩১-এ ‘চোরাকাঁটা’ ও ‘চাষার মেয়ে’, এই দু’টি নির্বাক চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন। ছবি দু’টি ছিল নিউ থিয়েটার্সের। অন্য দিকে সংগীত পরিচালক হিসেবে তাঁর প্রথম ছবি ‘দেনাপাওনা’। প্রথম প্লেব্যাক করেন ‘ভাগ্যচক্র’ ও এর হিন্দি ‘ধূপছাঁও’ ছবিতে। বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে মোট ৬৫ ছবিতে তিনি সংগীত পরিচালনা করেন। হিন্দি ও বাংলা মিলিয়ে বেশ কয়েকটি ছায়াছবিতে অভিনয় করেছেন। নায়ক পঙ্কজের সঙ্গে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন শ্রীমতি পান্না, ভারতীদেবী, মলিনাদেবী প্রমুখ। বিখ্যাত নানা পরিচালকের ছবিতে অভিনয় ও সুরারোপও করেছেন।

তবে এ সব কিছু ছাড়িয়ে তাঁর ছিল স্ত্রী অন্নপূর্ণা ও কন্যা অরূণলেখাকে নিয়ে সংসার। শিল্পী জীবনের পাশাপাশি তিনি যৌথ সংসারের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছিলেন। পঙ্কজকুমারের পুরস্কারপ্রাপ্তি সারস্বত মহামণ্ডলের ‘সুরসাগর’ (১৯৩২), ‘ডাক্তার’ ছবির সুবাদে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে বিএফজেএ (১৯৪২), সংগীত রত্নাকর (১৯৬৪), পদ্মশ্রী (১৯৭০) ও দাদাসাহেব ফালকে (১৯৭৩)।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here