‘নাচের শেষে কোলে তুলে সারা হলটা ঘুরেছিলেন বচ্চন’, স্মৃতি-আক্রান্ত মিস শেফালি

0
491

পাপিয়া মিত্র:

(প্রথম পর্বের পর)

 

তখন স্বপ্নের নারী…

হোটেল-মালিক, পরিচালক, মঞ্চ-মালিকের কাছে তাঁর চাহিদা ছিল অন্য রকম। কারণ সেই মুহূর্তে বাঙালি মেয়ে একমাত্র আরতি ওরফে মিস শেফালি। কম বয়সের গ্ল্যামারকে কাজে লাগিয়ে হাজার হাজার টাকা লাভ করছে হোটেল কর্তৃপক্ষ। বাঙালিকন্যার শরীরের এমন লাবণ্য কোথায় পাবে? ফিরপোজ থেকে গ্র্যান্ডে। ষাটের দশকের মাঝামঝি, গ্র্যান্ড হোটেল হয়ে উঠল স্বপ্নপুরী। প্রিন্সেস হল, কলকাতার বড় বড় হোটেলগুলো শিল্পী শেফালিকে পাওয়ার জন্য পাগল। শহরের বহু নামীদামি মানুষের কাছে তিনি ছিলেন স্বপ্নের নারী। রাতের চেহারা বদলে দিয়েছিলেন সেই তারকা। ডিসেম্বরের শুরুতে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত। কখনও কখনও ট্রিঙ্কাসে শো করতে যেতে হত মালিক মিস্টার পুরির ডাকে। “ভিভিয়ান হ্যান্ডসান যেমন আমাকে টাচ করেননি, তেমনই আমাকে উন্মুক্ত করতেও পিছপা হননি। এতে ওঁর কমিশন চড়ত। আর আমার মনে হত আমাকে এমন নাচ দেখাতে হবে যাতে আমার আরও চাহিদা বাড়ে” ‑ সত্যিই তো, সংসারটা যে মাথায় নিয়ে পথে নেমেছিলেন। সকালে একটা টোস্ট, এক কাপ ব্ল্যাক কফি বা ফলের রস। সারা দিন প্র্যাক্টিস। দুপুরে স্যুপ আর সামান্য আহার। সাতশো থেকে তিন হাজার হয়ে দশ হাজার। হোটেলগুলোর চাহিদা তখন তুঙ্গে। মাইনে বাড়ে পনেরো হাজার। শরীর আর দেয় না। কলকাতার রাত যেমন প্রচুর টাকা দিয়েছে, তেমনই নিংড়ে নিয়েছে শেফালিকে।  

নৃত্য থেকে নাটক, তার পর চলচ্চিত্রেও…

ধীরে ধীরে নাচ কমিয়ে নাটকের পথ ধরে চলচ্চিত্রে আসা। সুচিত্রা সেন খুব সকালে রাসেল স্ট্রিটের সানফ্লাওয়ার বিউটি পার্লারে যেতেন। সেখানেই দেখা দু’জনের। এই শহর চিনিয়েছে বুড়োদা (তরুণকুমার), উত্তমদা, পাহাড়িদা, বিকাশদা, রবীন মজুমদার, সত্যজিৎ রায়, অমিতাভ বচনকে। বুড়োদাই প্রথম নাটকে এনেছিলেন। প্রথম নাটক ‘চৌরঙ্গী’। একের পর এক অভিনয় চলল ‘অশ্লীল’, ‘রঙ্গিনী্‌’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘সম্রাট ও সুন্দরী’তে। রঙ্গমঞ্চে অভিনয়কালীন সমাজে ‘বিষকন্যা’ নামে পরিচিতি বাড়ল। যে সমাজে ‘অচ্ছ্যুতকন্যা’ হয়ে শেফালি দাপিয়ে বেড়াতে লাগলেন, তাঁরই অভিনয় দেখার জন্য কত গৃহস্থ রাতের নাটকে মঞ্চের শেষের দিকে টিকিট কেটে বসত। শুধুমাত্র ‘মিস শেফালি’কে দেখার জন্য। তাঁকেই দেখার জন্য, তাঁর নাচ দেখার জন্য সুচিত্রা সেন এসেছিলেন ‘সারকারিনা’য়। ‘সম্রাট ও সুন্দরী’ দেখতে। সে দিন বটতলার থানা থেকে পুলিশ এনে ভিড় সামাল দিতে হয়েছিল।

তবে হোটেলের ক্রাউড আর থিয়েটারের দর্শক আলাদা। থিয়েটারে এসে সমাজের সংসারে ঢুকে পড়লেন শেফালি। আলোচনা চলল ঘরে ঘরে। এর পরে সেই ‘বিষকন্যা’র ডাক পড়ল সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘প্রতিদ্বন্দী’ ও ‘সীমাবদ্ধ’তে। ‘প্রণয়পাশা’য় শেফালি ও সুচিত্রা সেনের শেষ অভিনয়।

অমিতাভ বচ্চনের ডাকে…

গ্র্যান্ড ছ’মাসের জন্য ভাড়া নেওয়া হয়েছিল ‘দো আনজনে’ শ্যুটিং-এর জন্য। শেফালির তৎকালীন বস সতীশকুমার বচ্চনসাহেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন শেফালিকে ‘কলকাতার কুইন’ বলে। অমিতাভ বচ্চন তাঁর জন্মদিনে নেমন্তন্ন করলেন মিস শেফালিকে। সেখানেই জয়া বচ্চনের সঙ্গে দেখা। ওখান থেকে একটি নাচের ওফার আসে। যেখানে শেফালি নাচবে কিন্তু অমিতাভ চিন্তা করবে রেখা নাচ্ছে। নাচের শেষে শেফালিকে কোলে তুলে সারা হলটা ঘুরেছিলেন বচ্চন ‑ এটাও এই শহর তাঁকে দিয়েছিল। এ সব খবর সেই সমাজ হয়তো মনে রাখে না।

প্রেম এসেছিল…

জীবনে প্রেম এসেছিল নীরবে। উদ্দাম উত্তেজনাময় জীবনে ভালোবাসার ছলনাই বেশি ছিল। তাই সত্যিকারের ভালোবাসা বুঝতে বুঝতে অনেকটাই দেরি হয়ে গিয়েছে। ফিরপোজে থাকাকালীন এক বার মুম্বইয়ের এক হোটেলে পাঠানো হয়েছিল শেফালিকে নাচের জন্য। আমেরিকা থেকে এসেছিলেন রবিন রুটল্যান্ড নামের এক গায়ক। হোটেলের মালিকের বিশেষ বন্ধু ছিলেন। খুব ভালো হিন্দি বলতে পারতেন। “প্রথম দিন নাচের সময়, মিউজিক শুরু হয়ে গিয়েছে, এমন সময় দেখি আমার সিকোয়েন্সগুলো জড়িয়ে গিয়েছে। রবিন তাড়াতাড়ি খুলে দেয়। নাচের পরে আমি ওকে থ্যাঙ্কস জানাতে আসি। সেই প্রথম ভালোলাগার একটা নেশা আমার মধ্যে অনুভব করতে শুরু করলাম” — হাঁপিয়ে উঠছিলেন কথাগুলো বলতে বলতে আজকের শেফালি। “প্র্যাক্টিসের পরে সারা দিন কী করে সময় কাটাই, সব জানার পরে এক দিন সিনেমা দেখতে যাওয়ার কথা বলে। সিনেমাহলে গিয়ে দেখি খুব কম লোক, ওপরের এক কোনায় দু’টি সিট। সেই প্রথম আমার কাঁধ স্পর্শ করে ও। রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে কোমর জড়িয়ে হাঁটা, বিদেশি আদবকায়দা সব শেখাতে শুরু করল। আমার তখন খুব কম বয়স। বাড়বাড়ন্ত চেহারা, কিন্তু ভয়ও পিছু ছাড়ে না”। মুম্বই থেকে লখনউ হয়ে কাঠমান্ডুতে যখন রবিন থাকতেন, তখন ঘন ঘন যেতেন কলকাতার কুইন। সেখানে ‘কাছে যাওয়া’ বলতে যা বোঝায়, সেই ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল দু’জনের মধ্যে। রবিন আমেরিকায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন সন্তান নিয়ে সংসার করুক শেফালি। অতীতের ভয়ংকর দিনগুলোর কথা মনে রেখে আর ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে প্রতিশ্রুতির ছবি চোখে ফুটে ওঠায়, সেখান থেকে পিছুটান দিয়েছিলেন শেফালি। চিঠির আদানপ্রদান ছিল, পরে তা আর স্থায়ী হয়নি। আজ এমন একদিনও যায় না যে রবিনকে তাঁর মনে পড়ে না।

স্মৃতিভারে…

মনে পড়ে যায় মা যে বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন সেখান থেকে চেয়ে আনা ছোট্টো ভাইয়ের জন্য দুধের কথা। তাতে অনেক জল মেশাতেন যাতে বারবার খাওয়ানো যায়। সেই ভাইয়ের সংসার আছে। কয়েক বছর হল তিনি প্রয়াত। মনে পড়ে যায় সকলে পেটের জ্বালা নিয়ে ছটফটানির কথা। আহিরীটোলার ঘাটের কাছে দাঁড়িয়ে পাড়ার বাড়িতে ভালো ভালো রান্নার গন্ধের কথা মনে পড়ে যায়। দু’চোখ আজও জলে ভরে যায়। সেই সব আতঙ্কের রাতও মনে পড়ে।

শক্তিময়ী নারী মা-বাবা-ভাইয়ের সংসারকে দেখে কাটিয়ে দিল নিজের জীবন। আজ এক চিলতে ফ্ল্যাটে কেবল সকালের রোদ এসে খবর নেয় শেফালি ভালো আছ তো? (শেষ)

আরও পড়ুন: ‘এক বার পাওয়ার জন্য বহু বিখ্যাত মানুষ তখন পাগল’, অকপট মিস শেফালি

এক ক্লিকে মনের মানুষ,খবর অনলাইন পাত্রপাত্রীর খোঁজ

মতামত দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here