Imran-Khan
ইমরানের খানের বিভিন্ন বয়সের ছবি- ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
Arunava Gupta
অরুণাভ গুপ্ত

ক্যাপ্টেন ইমরান খান এ বার ক্যাপ্টেন পাকিস্তান হয়ে আর একটা নতুন ইনিংস খেলতে চলেছেন।

তিনি তখন চুটিয়ে ক্রিকেট খেলছেন, সংবাদপত্রের দৌলতে খুব কাছাকাছি যাওয়া ও ক্রিকেট নিয়ে কথা বলা কপালে জুটেছিল। সেই চৌকশ ক্রিকেটার ইমরানকেই ফিরে দেখা আতস কাচের নীচে ফেলে। সব নিয়ে কলম ধরলে একটা ঢাউস সিরিয়াল হয়ে যাবে। ইমরান ক্রিকেট-কাব্য ভাণ্ডারে অভিনব বৈশিষ্ট্যগুলি টুকটুক করে সাজাব। তাও সব নয় আবার কমও নয়, ওখান থেকেই একটা স্পষ্ট ধারণা রূপ নেবে এবং বোঝা যাবে ইমরান কেমিস্ট্রি। অফকোর্স তথ্য বা ঘটনা শুধু ক্রিকেট। বাকি ল্যাজা-মুড়ো মুড়িয়ে বাদ।

Imran-Khan

ইমরানের মায়ের ফ্যামিলিতে উঠতে-বসতে ক্রিকেট। কম সে কম আটজন ওই ফ্যামিলির প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট খেলতেন। এঁদের মধ্যে দু’জন তো পাকিস্তানের ক্যাপ্টেন ছিলেন। ইমরানের মা ও তাঁর দু-বোনের মিলেঝুলে তিন ছেলে মজিদ খান, জাভেদ বার্কি এবং ইমরান খান পাকিস্তানের ক্যাপ্টেন হয়েছেন। অথচ মাইন্ড ইট, কৈশোরে এবং তার পরেও বেশখানিকটা সময় ইমরান ওরফে ইম্মির মধ্যে ক্রিকেট ট্যালেন্টের নামগন্ধ ছিল না। তবু মায়ের চেষ্টায় খামতি ছিল না। ছেলের যখন সাত বছর বয়স তখন প্রায় জোর করে টানতে টানতে মা পাকিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট খেলা দেখাতে স্টেডিয়ামে নিয় যান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দৈত্যাকার হাড়হিম করা ফাস্ট বোলার ওয়েলেসলি হলের বলে ওপেনিং ব্যাটসম্যান ইজাজ বাটের নাক ফেটে চৌচির। দুধ-সাদা শার্ট রক্তে লাল। মাঠ ভর্তি দর্শক উত্তেজনায়-ক্ষোভে ফুঁসছে, মায়ের মুখ থমথমে। ইম্মির কোনো হেলদোল নেই। উল্টে ‘যা ঘটছে ঘটুক, আমার ভারী বয়েই গেছে’ মুখ করে গোটা দিন কাটিয়ে দিল। মা কপাল চাপড়েছেন, তাঁর এত দিনের আশা, শেষমেশ ভস্মে ঘি ঢালা হল!

লাহোরের বিখ্যাত জিমখানা ক্লাবের কেষ্টবিষ্টুরা সব মায়ের আত্মীয় এবং যে ক্লাবের সদস্যপদ পেতে গেলে অর্থ-প্রভাব দুই-ই চাই। কতজন ক্লাবের দোরগড়া পর্যন্ত এগোতে পারেনি শুধু এই দুইয়ের অভাবে। সেখানে ইমরান মজিদ খান আর জাভেদ বার্কির হাত ধরে ড্যাং ড্যাং করে ঢুকে পড়ল। আবার সাড়ে ষোলোতে পৌঁছে ইমরান প্রথমশ্রেণীর ক্রিকেটে লাহোরের হয়ে সারগোদার বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম ম্যাচ খলতে নামল। ইমরান পরিণত বয়সে স্মৃতিচারণ করার সময় এতটুকু লুকোছাপা না করে এই প্রতিবেদককে সাফ বলেছেন, “আমার এই সুযোগ পাওয়ার পিছনে ‘নেপোটিজম’ কাজ করেছে। যেহেতু নির্বাচকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে টিমের ক্যাপ্টেন পর্যন্ত আমার নিকটাত্মীয়। প্র্যাকটিকালি পারিবারিক দল”। পাঠক মাথায় রাখবেন ইমরানের এই স্বীকারোক্তি।

Imran-Khan

১৯৭১ পকিস্তানের ইংল্যান্ড সফরে ইমরান খান মাসতুতো দাদা জাভেদ বার্কির সৌজন্যে টিমে ঢুকলেন। আর একটা কারণ ছিল টিমে ফাস্ট বোলিংয়ের অভাব। আকাশ-কুসুম স্বপ্নে বিভোর ইমরান। সেঞ্চুরির পর সেঞ্চুরি করবেন, প্রতি ইনিংসে পাঁচটা করে উইকেট নেবেন- উফ কী আনন্দ। ইমরানের ফাস্ট বোলিংয়ের নমুনা পেশ করা যাক।

নেট প্র্যাক্টিস, পাটভাঙা পোশাক, নতুন জুতো পায়ে গলিয়ে নতুন বলে নেট করা স্টার্ট। ইমরান বল করলেন, বল হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সাঁ করে ছুটল পাশের নেটে, যেখানে অনুশীলন করছেন আফতাব গুল, বল তাঁর প্রায় নাক ছুঁয়ে বেরিয়ে গেল। আফতাব হতচকিত, নাকে হাত বুলিয়ে কাঁচা কাঁচা গালাগালির তুবড়ি ছোটান। অজস্রবার ক্ষমা চেয়ে ইমরান রেহাই পেলেন। পরের বলের জন্য ফের লম্বা দৌড়। বল ব্যাটসম্যানের কাছে পৌঁছাল না, সরাসরি আঘাত করল এক দর্শকের মাথায়। বেচারা মন দিয়ে প্র্যাকটিস দেখছিলেন, কল্পনাও করতে পারেননি বল তাঁকে ধাওয়া করবে। টিমের বাকি সদস্যদের সেবা-যত্নে অবস্থায় প্রলেপ পড়ে। ইমরান ফটাফট বল করছেন যতটা পারছেন জোরে। হঠাৎ খেয়াল হল কোনো নেটেই কোনো ব্যাটসম্যান নেই, সবাই চাচা আপন প্রাণ বাঁচা বলে যে যাঁর মতো শেল্টার নিয়েছেন। বোলিং নমুনা দেখে সরাসরি দু’টো ম্যাচ থেকে ছাঁটাই।

Imran-Khan

ইমরান বুঝলেন- কপাল পুড়েছে। কিন্তু ম্যান প্রপোজেস, গড ডিসপোজেস। আঘাতের কারণে সরফরাজ নওয়াজ ও সেলিম আলতাফ খেলতে না পারায় ইমরান টিমে ঢুকলেন।

এজবাস্টন টেস্টের প্রথম ওভারে ইমরানের ব্যাটসম্যান কলিন কাউড্রে। ইমরানের জন্মের আগে থেকে ক্রিকেট খেলছেন। প্রথম চারটে বল গোলার মতো ফুলটস। একটাও ব্যাটে-বলে হয়নি, সব ক’টা বাইরে ছিল। ক্যাপ্টেন ইন্তিখাব এগিয়ে এসে উৎসাহ দিয়ে বললেন, “ইনসুইং ভাঙবে অফস্টাম্পের বাইরে থেকে কোনো মতেই লেগস্টাম্পের বাইরে নয়”। উপদেশবাণী কানে নিয়ে ইমরান চললেন আক্রমণ চালাতে। উপদেশের ফল হাতেনাতে ফলল। বল প্রচণ্ড গতিতে লেগস্লিপে দাঁড়ানো আসিফ মামুদের হাতে সোজা গিয়ে ল্যান্ড করল। কপাল জোরে শেষ মুহূর্তে আন্দাজ করার দরুন পৈত্রিক প্রাণটা বেঁচেছে নয়তো সামান্য এ দিক-ও দিক হলে হাসপাতাল নিশ্চিত ছিল। ইন্তিখাব আলম আর প্রস্তাব দিতে সাহস পাননি। তবে বল করতে দেননি। প্রতিটা ক্রিকেটার হেঁকেডেকে বলেছেন, এটার দ্বারা কিস্যু হবে না। ট্যালেন্ট দূরের কথা মিনিমাম যোগ্যতা নেই।

ইমরানের কান্না পেলেও শপথ করেছেন, এঁদের যোগ্য জবাব দেবই দেব।

Imran-Khan

… এর পর উত্তরণের ইতিহাস। এ বার পাঠক নিশ্চয় উত্তর পেয়েছেন, ইমরান খান কী এবং কেন। এর মাপাকাঠিতে বিচার করলে দেখব, রাজনীতির নেট প্র্যাকটিসে এই নেটের বল ওই নেটে আছড়ে পড়বে, আঘাত করলেও করতে পারে, তবে অপেক্ষায় থাকলে এবং অবশ্যই ধৈর্য্য ধরে, দেখা যেতে পারে চৌকশ ক্রিকটার ইম্মি দেশ শাসনেও মুনশিয়ানার পরিচয় দিচ্ছেন। খারাপ-ভালোর বিচার মানুষ করবে। ইম্মি নিজেও হয়তো জানেন, এই ইনিংস বড়োই পিচ্ছিল, ক্রিজ কামড়ে পড়ে না থাকলে টেকা অসম্ভব। তাঁকে প্রতিটা বল শুঁকে খেলতে হবে- যেহেতু মাইলস টু গো।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here