hunger strike by medical college students
dr. dipankar ghosh
দীপঙ্কর ঘোষ

প্রায় ঐতিহাসিক সময়ে যখন আমি একটা হোল্ডঅল (এই জিনিসটা পুরোনো দিনের লোকেরা জানবেন, লেপ তোষক নেওয়ার ব‍্যাগ বিশেষ) আর একটা তোরঙ্গ নিয়ে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের অফিসঘরের সামনে এসে রিকশা থেকে নামলাম তখন দুপুর। আলমবাবু এবং অফিসের অনেকেই জানালেন হোস্টেলে রুম নেই। মন খারাপ নিয়ে হোস্টেল ক‍্যান্টিনে জলডাল আলুসেদ্ধ আর সিলভার কার্প মাছের ঝোল (পরে দিব‍্য অভ‍্যেস হয়ে গেল এবং ভালোও লেগে গেল) খেয়ে ফের অফিসে গিয়েছি, একজন লম্বা দাড়িওয়ালা দাদা (অসিতদা) নিজ দায়িত্বে আমাকে ওর ঘরে নিয়ে গেল। না ভাই, র‍্যাগিং কী জিনিস কোনো দিন বুঝিনি। ছাত্র রাজনীতিতেও আমি আর অসিতদা দুই মেরুতে ছিলাম।

এ বার বর্তমান কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের অগ্নিগর্ভ অবস্থার দিকে তাকানো যাক। মেডিক্যাল কলেজের নিয়ম হচ্ছে দূরের পড়ুয়াদের আগে হোস্টেল দিতে হবে, কাছের পড়ুয়াদের পরে। অথবা যে দূরের পড়ুয়ার মেডিক্যাল কলেজের কাছে আত্মীয় থাকে তার দাবি পরে। বহু দূর গ্রামের গরিব ঘরের পড়ুয়ারা মেসে থেকে বা পেয়িংগেস্ট হয়ে পড়াশোনা করে।

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ একটি এগারোতলা ছাত্রনিবাস তৈরি করেছে। এবং তার দায়িত্ব পেয়েছেন সদ‍্য পাশ করা এক ডাক্তার নেতা। তিনি রাজ্যের শাসকদলের সদস্য। যদিও এই যোগ্যতা নিয়ে হোস্টেল সুপার হ‌ওয়া যায় না। এ বার মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডাক্তার উচ্ছ্বল ভদ্র ঘোষণা করলেন, ওই বহুতল বাড়িতে কেবলমাত্র প্রথম বর্ষের ছাত্ররা থাকবে, বাকি সব ঘর যদি ফাঁকা থাকে তবে তাই থাকবে। এর কারণ হিসাবে অধ‍্যক্ষ ডাঃ ভদ্র তুলে ধরেন মেডিক্যাল কাউন্সিলের একটি নিয়ম। সেই নিয়মে বলা হয়েছে, নতুন ছাত্রদের সঙ্গে পুরোনো ছাত্ররা একসঙ্গে থাকবে না তাতে র‍্যাগিং হ‌ওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আসলে মেডিক্যাল কাউন্সিল এক‌ই ব্লকে দুই বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের না রাখতে বলেছে, এক‌ই হোস্টেলে রাখা যাবে না এ কথা বলেনি। তা হলে তো প্রতিটি বর্ষের জন্য আলাদা আলাদা হোস্টেল বিল্ডিং তৈরি করতে হয়।

আর সব থেকে বড় কথা মেডিক্যাল কলেজে র‍্যাগিং? মেডিক্যাল কলেজের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত এ রকম ঘটনার কথা শোনা যায়নি।

ছাত্ররা প্রথমে স্বচ্ছ ও অরাজনৈতিক হোস্টেল কাউন্সেলিং দাবি করে। তারা ব‍্যর্থ হয়। কারণ অধ‍্যক্ষ এই প্রস্তাবে রাজি হননি। তার পর ছাত্ররা অরাজনৈতিক হোস্টেল কাউন্সেলিং-এর দাবিতে মেডিক্যাল কলেজের কমন রুমে ব্যাগ-বিছানা-বালিশ নিয়ে অবস্থান শুরু করে। ৮০ ঘণ্টা ধরে ছাত্রদের অবস্থান চলার পরেও অধ‍্যক্ষ ডাঃ ভদ্র গোটা ব্যাপারটি নিয়ে উদাসীন থাকেন। এর পর ছাত্ররা অধ‍্যক্ষের ঘরের সামনে অবস্থান শুরু করে এবং আশ্চর্যজনক ভাবে যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সির পথে না গিয়ে অধ‍্যক্ষ রাতের অন্ধকারে পুলিশ ডেকে ‘ছাত্রছাত্রীদের’ ছত্রভঙ্গ করে বার করে দিলেন। এবং পুলিশি সহায়তায় নিজে বাড়ি চলে গেলেন।

এ বার ছাত্ররা অহিংস পথে গিয়ে অনশনে বসল। অল্পবয়সি পড়ুয়াদের বাড়িতে অভিভাবকদের ফোন করে ভয় দেখানো হলেও তাঁদের মনোভাব প্রশংসাযোগ্য। তাঁরা কেউ তাঁদের সন্তানদের আন্দোলন থেকে পিছিয়ে আসতে বলেননি। অনিকেত, অয়ন, অর্পণ, সুমিত এবং তাদের বন্ধুদের অনশন দু’শো ঘন্টা পেরিয়ে গেল। প্রত‍্যেকের রক্তচাপ কমে যাচ্ছে, শুগার কমে যাচ্ছে, আলসার থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমাদেরও হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি তরুণ প্রাণগুলো নায্য দাবি আদায় করতে গিয়ে শেষের দিকে। কলেজ কর্তৃপক্ষ মিটিং করছে, কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। প্রিন্সিপাল ডাক্তার উচ্ছ্বল ভদ্রকে হয়তো অপসারিত হতে হবে। ইএনটি প্রধান হয়তো অধ‍্যক্ষপদ গ্রহণ করবেন। তাতে হয়তো অচলাবস্থা কিছুটা কাটবে। কিন্তু কবে? কর্তৃপক্ষ কবে পড়ুয়াদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে তরুণদের আমরণ অনশন থেকে সরিয়ে আনবেন? বড়ো দেরি হয়ে যাচ্ছে যে!

(লেখক এক জন সাধারণ চিকিৎসক)

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য দিন !
আপনার নাম লিখুন