ayodhya
saibal biswas
শৈবাল বিশ্বাস

কেটে গিয়েছে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দুএক বছর। তার পর থেকে কাজেকর্মে কয়েক বার অযোধ্য‌া যেতে হয়েছে। বাবরি মসজিদ নিয়ে তখন আর কোনো গুঞ্জন নেই। বরং গোটা অযোধ্য‌া জুড়েই তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে। এক ফাঁকে ঘটেছে শিলাদান, করসেবা, গোধরাকাণ্ড। অযোধ্য‌ার ওপর দিয়ে বহু ঝড় বয়ে গিয়েছে। সেই নিয়ে তোলপাড় হয়েছে গোটা দেশের রাজনীতি। সে সব প্রসঙ্গ আজ থাক। গত প্রায় ২২২৩ বছরের অযোধ্য‌া দর্শনের স্মৃতি থেকে আজ বরং তুলে ধরা যাক কয়েকটা টুকরো ছবি।

ram janmabhoomi nyas
রাম জন্মভূমি ন্যাসের কর্মশালা।

করসেবকপুরম : রামায়ণের পুনর্নির্মাণ

রামজন্মভূমি তথা হনুমানগড়ির রাস্তা ছাড়িয়ে কিছু দূর এগিয়ে ডান হাতে ঘুরে গেলে একটা অপরিসর গলি পড়ে। সেই গলির মুখ থেকে একের পর এক আখড়া আর মন্দির। আঁকাবাঁকা পথে কিছু দূর গেলে ডান হাতে রামজন্মভূমি ন্য‌াসের মন্দির আর অফিস। সেটা ছাড়িয়ে আরও একটু এগিয়ে গেলে ঘেরা জায়গায় একটা বিশাল মাঠ। মাঠে প্রবেশের মুখে এক বিরাট হোর্ডিং – করসেবকপুরম। এই জায়গাটি নির্মাণ করেছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। গোটা দেশের সংঘ পরিবারের লোকজন এবং রামমন্দির দর্শনার্থীরা দলে দলে এই করসেবকপুরমেই আশ্রয় নেয়। মাঠে ঢুকেই চোখে পড়বে ঝাঁ চকচকে বাড়ি। সেই বাড়িতেই পরিষদের দফতর এবং রামায়ণ মিউজিয়াম। রামায়ণ মিউজিয়ামের মুখ্য‌ দ্রষ্টব্য‌ অবশ্য‌ই রামমন্দিরের সুবিশাল নকশা। ভবিষ্য‌তে কেমন তাকলাগানো মন্দির হতে চলেছে তার সবটাই দ্রষ্টব্য‌ হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে। তার সঙ্গে রয়েছে রামায়ণ সংগ্রহশালা। ছোটো ছোটো পুতুলের মাধ্য‌মে রামায়ণের গল্প সেখানে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। সব চেয়ে জোর দিয়ে দেখানো হয়েছে রাবণবধ দৃশ্য‌। কিন্তু কোথাও পরবর্তী রাম অর্থাৎ রামের রাজ্য‌াভিষেক, সীতার পাতালপ্রবেশ চোখে পড়বে না। চোখে পড়বে না বালিসু্গ্রীব বিতর্কে রামের ভূমিকা, লক্ষ্মণ কর্তৃক ইন্দ্রজিত বধের বৃত্তান্ত। শুধু বীরগাঁথার রামই সেখানে মুখ্য‌। তুলসীদাসের ভক্তিমান রাম সেখানে অনুপস্থিত। এই বীর রামের পুনর্নির্মাণের ওপর নির্ভর করেই তৈরি হচ্ছে রামজন্মভূমি আন্দোলনের নতুন মতাদর্শগত ভিত্তি। অসংখ্য‌ করসেবক ফিরে গিয়ে শোনাচ্ছেন যোদ্ধা রামের গল্প।

nirmohi akhara
নির্মোহী আখাড়া।

নির্মোহী আখড়া

বাবরি মসজিদের পাশে রামমন্দির গড়তে চেয়ে প্রথম মামলাটি করে কিন্তু নির্মোহী আখড়া। রামজন্মভূমিবাবরি মসজিদ ঢোকার রাস্তার অর্থাৎ হনুমানগড়ির একেবারে মুখেই নির্মোহী আখড়ার মন্দির। এই আখড়া পেরিয়ে গেলে তবেই সীতা রসুই পড়বে যেখান থেকে বিতর্কিত রাম জন্মভূমির জমির শুরু। ১৭২০ সালে এই নির্মোহী আখড়ার সূত্রপাত। রাম চবুতরায় রামমন্দির গড়তে চেয়ে এঁরাই ১৮৮৫ সালে প্রথম মামলা করেছিলেন। যুক্তি ছিল, রামের জন্মভূমিতে রামের বিগ্রহ পালন করার জন্য‌ তারাই প্রথম ছোটো একটি মন্দির স্থাপন করেছিলেন। সেই মন্দিরটিকেই তাঁরা বড়ো করতে চান। এ হেন নির্মোহী আখড়া কিন্তু বরাবরই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বিরোধী। তার বড়ো কারণ হল, নির্মোহী আখড়া বাবরি মসজিদ ভেঙে মন্দির গড়তে চায়নি। তারা মন্দির করতে চেয়েছে পাশের জমিতে। কিন্তু বিশ্ব হিন্দু পরিষদ তথা রামজন্মভূমি ন্য‌াস মন্দির গড়তে চায় বাবরি মসজিদের গর্ভগৃহ বলে পরিচিত যে স্থানে রামলালার বিগ্রহ বসানো আছে, ঠিক সেখানটাতেই।

বারবার দেখা হয়েছে নির্মোহী আখড়ার তৎকালীন প্রধান মোহন্ত ভাস্কর দাসের সঙ্গে। প্রায়শই সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের রাজনীতির কড়া নিন্দা করতেন। শুধু তা-ই নয়, মন্দির নিয়ে রাজনীতি করারও তিনি ছিলেন ঘোরতর বিরোধী। নির্মোহী আখড়ার অন্য‌ সাধুরাও সুযোগ পেলেই রামজন্মভূমি ন্য‌াস প্রধান তথা দিগম্বর আখড়ার মোহন্ত রামচন্দ্র দাসপরমহংসের বিরুদ্ধে এক গাদা ক্ষোভ উগরে দিতেন।

ramchandra das paramhansa
রামচন্দ্র দাস পরমহংস।

রামচন্দ্র দাস পরমহংস

তিনি যে কী জানেন না, আর কাকে চেনেন না তা তাঁর সঙ্গে একান্তে কথা বলে কখনোই ধরতে পারিনি। তিনিই ছিলেন রামজন্মভূমি ন্য‌াসের মুখ। তাঁকে সামনে রেখেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অশোক সিঙ্ঘল, প্রবীণ তোগাড়িয়ারা মন্দির গড়ার কাজে ঝাঁপিয়েছিলেন। এক দিন ভাঙা বাংলায় জিজ্ঞাসা করলেন, “কলকাতার ছেলে, মাকলা চেনো? উত্তরপাড়া?” আলাপ জমল। জানলাম তাঁর আসল নাম চন্দ্রেশ্বর তিওয়ারি। জন্ম বিহারে কিন্তু বড়ো হয়েছেন কাশীতে। তার পর পশ্চিমবঙ্গে এসে উত্তরপাড়ায় একটা হনুমান মন্দিরের পূজারী হন। বেশ কিছু দিন ছিলেন। পরে অযোধ্য‌ায় এসে দিগম্বর আখড়ায় জায়গা করে নেন। রামচন্দ্র দাস বিখ্য‌াত হয়েছিলেন স্বাধীনতার ঠিক পরে পরেই ১৯৪৯ সালে। সেই সময় তিনি বাবরি মসজিদের গম্বুজে উঠে রামশীলা বসিয়ে দিয়ে এসেছিলেন বলে জানা যায়।

এ হেন ডাকাবুকো লোককেও একদিন দেখলাম অশোক সিঙ্ঘল প্রবল বকা দিলেন। মোদ্দা কথায় যা বললাম তা হল, মশাই কোটি কোটি টাকা এনে দিচ্ছি আপনাকে অফিসমন্দির চালানোর জন্য‌, আর আপনি চন্দ্রশেখর, নারায়ণ দত্ত তিওয়ারির সঙ্গে মন্দির নিয়ে কথা বলছেন। আপনার সাহস তো কম নয়? চুপ করে শুনলেন রামচন্দ্র দাস। আমরা রীতিমতো বুরবাক।

রামমন্দির তিনি বানাবেনই। এ নিয়ে আমাদের মতো চ্য‌াংড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে যতই তর্ক হোক না কেন, প্রসাদ না দিয়ে কোনো দিন ছাড়তেন না। দুপুরে খাওয়া না হলে বরাদ্দ ছিল ঘিয়ে ভাজা পুরী, তরকারি আর হালুয়া। আর সব সময় পাওয়া যেত ডাল পকোড়া আর চা। নিজের হাতে সে সব তুলে দিতেন। তিনি গত হয়েছেন। তাঁর জায়গায় এখন মোহন্ত হয়েছেন সুবেশ দাস। জানি না পরিষদ নেতাদের চাপ সামলে কী ভাবে চলেন।

hanuman gadi
হনুমান গড়ি।

হনুমান গড়ি

বিতর্কিত রামজন্মভূমি যাওয়ার রাস্তার নামটিই হল হনুমানগড়ি। এই রাস্তায় একের পর এক আখড়ার ছড়াছড়ি। রাস্তায় ঢোকার মুখে ছিল একটি অপরিসর বাজার। সেখানে রামচন্দ্র রীতিমতো বাজারের পণ্য‌ের মতো বিকোচ্ছে। কী চাই? শ্রীরাম ছাপ দেওয়া টি শার্ট? পাবেন। শ্রীরাম চিহ্ন আঁকা ত্রিশূল, অসংখ্য‌ ছবির বই, বাঁধানো রামসীতালক্ষণের ছবি, রামমন্দিরের পাথরে খোদাই রেপ্লিকা, স্বাধ্বী ঋতম্ভরা, আডবাণী, উমা ভারতীদের ছবি দেওয়া ক্য‌ালেন্ডার, রামমন্দিরের গুণকীর্তন সংবলিত ক্য‌াসেট। অ্য‌ানিমেশন ভিডিওর সিডি। সব মিলিয়ে জমাটি রাম ব্য‌বসা। দরাদরির শুরু হবে, এমন একটা জায়গা থেকে আপনি হয়তো পিছিয়ে এলেন। কিন্তু নিইয়ে ছাড়বে এবং সেটা আপনার দামে। পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে চাকি বেলুন, পেতলের বাসন, বালতি থেকে শুরু করে যাবতীয় ঘরোয়া জিনিসপত্র। রীতিমতো মেলা বসেছে গোটা চত্বর জুড়ে। সেটা এক আধদিনের মেলা নয়, সম্বৎসরের মেলা। আর সেই মেলায় ভাগ নিতে সংগঠিত অসংগঠিতভাবে প্রচুর মানুষ আসছেন সারা বছর। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সংগঠিত ট্য‌ুরেও প্রচুর লোকজন আসেন। তাঁরাও কিন্তু খোলা বাজার থেকে টুকটাক জিনিস কেনেন। ফৈজাবাদের দীর্ঘদিনের এক বামপন্থী কর্মী বললেন, খুচরো ব্য‌বসা করতে না দিলে করসেবকপুরম উঠে যাবে। স্থানীয় লোকজনই তাড়া করে রামসেবকদের সরযু পার করে দিয়ে আসবেন।

আপাতত অযোধ্য‌া কাহিনি এখানেই থাক। আরও গুরুত্বপূর্ণ খণ্ডচিত্র কিছু শোনাব। তবে ধাপে ধাপে।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here