Babri Masjid
nilanjan dutta
নীলাঞ্জন দত্ত

বর্ষপূর্তি কথাটাকে নিয়ে তাঁর ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে এক শব্দের খেলা খেলেছিলেন সত্যজিৎ রায় – ‘ভরসাফুর্তি’ – “ভরসা পেয়ে গেছে তো, তাই ফুর্তি”। কিন্তু আজ ২৫ বছর ধরে ৬ ডিসেম্বর এমন এক ঘটনার বর্ষপূর্তি পালন করতে হয় আমাদের, যার স্মৃতি কোনো ভরসা তো দেয়ই না, ভয়টাই বাড়িয়ে চলে শুধু।

ভয় আমাদের চারপাশটা হঠাৎ কেমন অচেনা হয়ে যাওয়ার, ভয় এক অন্ধকার অতীতের কোনো উন্মাদ বৈজ্ঞানিকের অনৈতিক গবেষণার পাপে পুনরায় প্রাণ পাওয়া জুরাসিক পার্কের ডাইনোসরদের মতো আবার পৃথিবীর দখল নিতে ফিরে আসার, ভয় বহু দিনের পরিচিত মানুষের হাসি-হাসি মুখের আদলটা আমাদের চোখের সামনে পাথরের গদা হাতে গুহামানবের চোয়ালের মতো শক্ত হয়ে যেতে দেখার।

পাঁচশো বছর আগে কে কার ভগবানের ঘর ভেঙে নিজের ঈশ্বরের আস্তানা তৈরি করেছিল অথবা করেনি, আমার কী এসে যায় তাতে? আবার ২৫ বছর আগে সেই দূর অতীতের দুরাচারের জবাব দিতে কারা লাখো লোক জুটিয়ে শাবল আর ডিনামাইটের অপূর্ব কনসার্ট তুলে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল সেই সৎ-ভাইদের উপাসনালয়, তাতেই বা কী যায় আসে আমার সন্তানের, যে সে বছর সবে পৃথিবীর আলো দেখেছে?

আসলে সবারই যায় আসে। আমি তো দেখেছি সেই ধ্বংসের দিনে সরজু নদীর তীরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিতাকাঠ থেকে লকলকে আগুন কেমন করে আমার নিজের শহরটাকে ছুঁয়েছিল। হঠাৎ ছ্যাঁকা লেগে আমরা চমকে উঠেছিলাম – আরে, এটা কলকাতা না! এখানেও দাঙ্গা হয়! অথচ তারও বেশ কিছু দিন আগে এই শহরেই যখন আমাদের অতি-চেনা বিভিন্ন সেবাশ্রম আর আশ্রমে এক ‘রামশিলা’ নাম্নী ইষ্টকোপাসনার অদৃষ্টপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা ঘটছিল, তখন আমাদের মনে হয়নি, এ কোনো ভবিষ্যৎ বহ্নুৎসবের চকমকি পাথর নয়তো!

ভয় তো আমি আগেই পেয়েছিলাম, ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বর যখন অযোধ্যায় রাম মন্দিরের ‘শিলান্যাস’ দেখতে গিয়ে কলকাতা আর শহরতলি থেকে আসা বাঙালি ‘করসেবক’দের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, যারা সেই সব পূজিত ইঁট অত দূর বয়ে নিয়ে গিয়েছিল কোনো এক ‘ঐতিহাসিক’ বদলার প্রস্তুতির কাজে হাত লাগাতে। আরও ভয় পেয়েছিলাম তখনও অটুট বাবরি মসজিদ ঘিরে ‘শান্তিরক্ষার্থে’ বিপুল সংখ্যায় মোতায়েন উত্তরপ্রদেশ প্রভিনশিয়াল আর্মড কনস্ট্যাবিউলারি বা পিএসি-র ‘জওয়ান’দের যখন সেই ‘শিলান্যাস’-এর বিচিত্র অনুষ্ঠান শেষে সরকারি উর্দি গায় দিয়ে, কাঁধে আমাদের ট্যাক্সের পয়সায় কেনা ভীষণদর্শন স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র আর বুলেটের মালা ঝুলিয়ে, কপালে রক্তচন্দনের টিকা আর গলায় গাঁদাফুলের মালা পরে এক অদ্ভুত উল্লাসে রামজির জয় গাইতে গাইতে বুটপরা পায়ের আওয়াজ তুলে নাচতে দেখছিলাম। আমার তখনকার কাগজে পাঠানো রিপোর্টে লিখেওছিলাম সেই ভয়ের কথা।

তার পর তিন বছরে অন্ধকার শুধু গাঢ়তর হয়েছিল। না আমাদের রাজ্যে, না সারা দেশে এমন কিছু করা গিয়েছিল যাতে আমার মত ভীতু মানুষরা একটু ভরসা পায়। আর অনিবার্য ভাবেই ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২-এর রাতটা কাটতে না কাটতে কলকাতা চলে গিয়েছিল কোথাও ‘ভালুক’ আর কোথাও ‘গদাই’দের দখলে। মেটিয়াবুরুজে হিন্দুদের বাঁচাতে পারেননি কোনো শালপ্রাংশু মহাভুজ ধনুর্ধর দুর্বাদলশ্যাম, বেলেঘাটার ধোবিয়াতালাও আর কিলখানার ‘উদ্বাস্তু শিবিরে’ প্রাণভয়ে গাদাগাদি করে জড়ো হওয়া ঘরপোড়াদের আর্ত আজান কার কানে পৌঁছেছিল জানি না। ষাটের দশকের পর থেকে যে শহর ‘দাঙ্গা’ শব্দটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল, দেড় দশকের বাম শাসনে যার নিশ্চিন্ত প্রত্যয় জন্মেছিল ‘এখানে সাম্প্রদায়িকতা নেই’, তার সভ্যতায় সমস্ত আস্থা চৌচির হয়ে যেতে আরম্ভ করেছিল।

আরও পড়ুন : বাবরি ধ্বংসের ২৫ বছরে অযোধ্যা ফিরে দেখা

তার মধ্যে আবার এক রাতে অফিসের গাড়ি নিয়ে বন্ডেল গেটের ওপারে সহকর্মীকে বাড়ি পৌঁছোতে গিয়ে আরও শিক্ষা হল। পুলিশের বিশাল ব্যারিকেড, কিছুতেই আমাদের গেট পার হতে দেবে না, আমাদেরই নাকি নিরাপত্তার জন্য, কারণ – “আরে মশাই, ও দিকে ওরা সব দল বেঁধে বড়ো বড়ো সোর্ড নিয়ে কাটতে বেরিয়েছে।” কারা বেরিয়েছে, কাদের কাটতে, প্রশ্ন করতে অফিসার এমন ভাবে তাকালেন যার মানে “ওই যে, সন্ধের পর যাদের নাম করতে নেই” অথবা “এটাও বোঝেন না, এমন বুদ্ধি নিয়ে সাংবাদিকতা করেন কী করে”, যা খুশি হতে পারে। কিন্তু আমরা তো যাবই, আর বিশেষ করে এ কথা শোনার পর তো যেতেই হয়। শেষ পর্যন্ত ছাড় মিলল – “যান, তবে কিছু হলে আমাদের বলবেন না কিন্তু”, এই শর্তে। গেলাম, সহকর্মীকে ছেড়ে ওখান দিয়েই ফিরেও এলাম, কাকপক্ষীকেও কোথাও দেখতে পেলাম না।

বিরানব্বই-এর সেই কলকাতার দাঙ্গায় জায়গায় জায়গায় পুলিশকেই গুজব ছড়াতে, মিথ্যে ভয় দেখিয়ে মানুষকে ঘরছাড়া করতে (পরে কিছু কিছু জমি তখনকার উঠতি প্রোমোটারদের ভোগে লেগেছিল), এমনকি গুণ্ডাদের সঙ্গে মিলে হামলা চালাতেও দেখা গিয়েছে, এমন অনেক অভিযোগ এসেছে। আমরাও কিছু কিছু লিখেছি, নাগরিক মঞ্চ আর এপিডিআর-এর রিপোর্টেও বলা হয়েছে। সরকারি তরফে কোনো তদন্ত বা পদক্ষেপের কথা জানা যায় না।

যারা আজও কেবল বর্ষপূর্তির দিনে সংহতি আর সম্প্রীতিতে আস্থা নিবেদন করে ভরসা পান, ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর তাদের চরম চেতাবনি দিয়ে গিয়েছে। পঁচিশ বছরেও যাদের চৈতন্য হয়নি, তাদের সরে দাঁড়ানোই ভালো। বরং এই পঁচিশ বছর ধরে যারা পৃথিবীতে এল, তারাই তাদের মতো করে বেছে নিক তাদের উত্তরাধিকার – হিংস্রতার না সভ্যতার।

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here