শক্তি চৌধুরী:

এক জন লেখক যখন কোনো একটি বিশেষ দিন বা উৎসবকে কেন্দ্র করে কিছু লিখবে স্থির করে তখন তার প্রথম লক্ষ্য থাকে ওই বিশেষ দিন বা উৎসবের আঙ্গিকটা আগে বর্ণনা করা। আর ঠিক এই জায়গায় আমি মহা ফ্যাসাদে পড়েছি। ইন্টারনেট ও বেশ কিছু বই নিয়ে ইতিহাস খোঁড়াখুঁড়ি করতে গিয়ে দেখি, কী সর্বনাশ! ওই পৈতেধারী হিন্দু ব্রাহ্মণদের দোকানে দোকানে দাপাদাপির মূলে তো এক মুসলিম সম্রাট। আমি জানি আপনি মনে মনে কী বলছেন — “আঃ, এর মধ্যে আবার ধর্ম নিয়ে টানাটানি কেন, মশাই?” ঠিক তাই, আমিও এটাই বলতে চাইছি। ইতিহাস বলছে, এই দিনটির সঙ্গে ধর্মের কোনো রকম যোগাযোগ নেই। ধর্ম নাক গলিয়েছে তার নিজের স্বার্থে। যাক হেঁয়ালি রেখে বরং ইতিহাসটাই একটু ছোটো করে বলে নিই। ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার হোক আগে।

মূল হিন্দু সংস্কৃতির যে দিনপঞ্জি নির্ধারিত হত সূর্যের অবস্থানের উপর নির্ভর করে। সে হিসাবে বহু শতক আগেই ১২ মাস আলাদা আলাদা করে নিয়ে বছর ভাগ করা হত। হিন্দু সৌরবছরের প্রথম দিন অসম, বঙ্গ, কেরল, মণিপুর, নেপাল, ওড়িশা, পঞ্জাব, তামিলনাডু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হত। পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হত। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। আর ঠিক এইখানেই তৈরি হল সমস্যা। সমস্যা অর্থাৎ প্রশাসনিক সমস্যা।

ভারতে তখন মোগল শাসনব্যবস্থা চালু। আর মুসলিম দিনপঞ্জি ঠিক হত হিজরি পদ্ধতি মেনে। এই পদ্ধতি মূলত চাঁদের অবস্থানভিত্তিক, যার সঙ্গে আমাদের গ্রেগরি বা হিন্দু পদ্ধতির অনেকটাই ফারাক। দেখা গেল কৃষকদের খাজনা দেওয়ার সময় তাদের ঘরে ফসল নেই। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হত। তাই সম্রাট আকবর সিদ্ধান্ত নেন, একটা সম্পূর্ণ নতুন দিনপঞ্জি তৈরি করার যা প্রজাদের এই নিত্য সমস্যা থেকে কিছুটা রেহাই দেবে। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতুল্লাহ শিরাজি সৌর-সন এবং আরবি-হিজরি সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

আরও পড়ুন: পয়লা বৈশাখ ও বাঙালি

অতএব আধুনিক ১ বৈশাখ পুরোপুরি একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যা সত্যি সত্যি জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যেই গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু এই দিনটির পালনের ইতিহাসের দিকে নজর দিলে দেখা যায় খাজনা জমা করার পরের দিন ভূস্বামীরা স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করতেন। ক্রমে ক্রমে এটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। পরে ব্যবসায়ীরাও এই বিশেষ দিনটিতে তাদের ধারের খাতা বন্ধ করে নতুন করে খাতা শুরু করেন এবং সব পুরোনো দেনা-পাওনা মিটিয়ে নেন। তাই এটি প্রায় বাংলা আর্থিক বছরের সমাপ্তি সূচিত করে। তবে এখন অবধি যা যা নিয়ে আলোচনা করলাম সবই মূলত সমাজে আর্থিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত মানুষদের কথা।

১ বৈশাখ উদযাপনের ইতিহাস কিন্তু শুধুই শহুরে শিক্ষিত বা আর্থিক ভাবে শক্তিশালী মানুষের মধ্যেই সীমিত নয়। ঐতিহাসিক ভাবে এটি সর্বজনীন। বাংলা নববর্ষ ও চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে পুব বাংলার (অধুনা বাংলাদেশ) তিন পার্বত্য জেলায় (রাঙামাটি, বান্দরবন ও খাগড়াছড়ি) উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। বৈসাবি হল পাহাড়িদের সব চেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরারা বৈসুক বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা ‘বৈসাবি’ নামেই পরিচিত। বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু এই নামগুলির আদ্যক্ষর নিয়ে বৈসাবি শব্দের উৎপত্তি। বছরের শেষ দু’দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন, এই তিন দিন মিলেই মূলত  বর্ষবরণ উৎসব ‘বিজু’ পালিত হয়। পুরোনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ উপলক্ষে পাহাড়িরা তিন দিনব্যাপী এই বর্ষবরণ উৎসব সেই আদিকাল থেকে পালন করে আসছেন। এ উৎসব উপলক্ষে পাহাড়িদের বিভিন্ন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আদিবাসী মেলার আয়োজন করা হয়।

পাঠক এ বার বুঝুন কেন আমি এই লেখার একেবারে প্রথমেই বলেছিলাম এই উৎসবকে কোনো একটা নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতে বিবেচনা করতে যাওয়া খুব বিভ্রান্তিকর। এ বাংলার এক প্রাণের উৎসব যেখানে চৈত্র সেল আছে, মায়ের ঘর ঝাড়ার স্মৃতি আছে, সোনার দোকানের সামনে হাল খাতার লম্বা লাইন আছে, নন্দনে রবীন্দ্রসঙ্গীত আছে আবার সেই দূর আদিবাসী গ্রামে কিছু মানুষের উৎসব আছে। তাই এ আমাদের এক আনন্দ উৎসব। যার কোনো নির্দিষ্ট বিভাগ নেই, সংজ্ঞাও নেই। 

মন্তব্য করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here